মাওবাদী বিদ্রোহের ম্যাজিক সমাধান নেই- ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বিকারোক্তি

  • ৮ মে ২০১৭
মাওবাদী এলাকায় পুলিশের টহল ছবির কপিরাইট DESHAKALYAN CHOWDHURY
Image caption মাওবাদী এলাকায় পুলিশের টহল (ফাইল ফটো)

ভারতে মাওবাদী বিদ্রোহীদের মোকাবিলার পথ খুঁজতে সরকারের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, এই সঙ্কটের কোনও চটজলদি সমাধান সম্ভব নয়, সর্বাত্মক উন্নয়ন আর আগ্রাসী নীতি বজায় রেখেই মাওবাদীদের কাবু করা সম্ভব।

ভারতে যে রাজ্যগুলোতে মাওবাদীদের দাপট বেশি, সেগুলোর মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশ-প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকেই তিনি সোমবার এ মন্তব্য করেন।

মাওবাদীদের সঙ্গে শান্তি-আলোচনার কথা যে সরকার আদৌ ভাবছে না, সেটাও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

দুসপ্তাহ আগে ছত্তিশগড়ের সুকমায় মাওবাদীদের হামলায় ২৫জন সিআরপিএফ জওয়ান নিহত হওয়ার পরই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তড়িঘড়ি আজকের এই বৈঠক ডেকেছিল।

সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং স্পষ্ট করে দেন মাওবাদীদের দমনে সরকারি কৌশলে বিরাট কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।

তিনি বলেন, "সিলভার বুলেট দিয়ে এই সমস্যা মিটবে না - অর্থাৎ ঝটিতি কোনও জাদুবলে এর সমাধান মিলবে না, আর এর কোনও শর্টকাটও নেই। স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করেই আমাদের এগোতে হবে।"

ইংরেজিতে সমাধান শব্দের এস, এ, এম ইত্যাদি সবগুলো বর্ণের জন্য স্মার্ট লিডারশিপ, অ্যাগ্রেসিভ স্ট্র্যাটেজি, মোটিভেশন এজাতীয় নানা শব্দ ব্যবহার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, এই সমাধান শব্দেই লুকিয়ে আছে মাওবাদীদের জবাব।

আরও পড়ুন: নির্বাচনের পালে হাওয়া, নেই আগাম ভোটের ইঙ্গিত

কিভাবে সনাক্ত করবেন ফেসবুকের ভুয়া খবর

ছবির কপিরাইট NARINDER NANU
Image caption মাওবাদী বিদ্রোহ দমনের সহজ সমাধান নেই - স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং

তবে কলকাতায় কনফ্লিক্ট স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সমীর কুমার দাস মনে করছেন, সামরিক পথই মাওবাদী দমনের একমাত্র পথ হতে পারে না।

তিনি বলছিলেন, "একটা দিক দিয়ে রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে দেখলে রাষ্ট্র সব সময়েই একে সামরিক পথেই মোকাবিলা করতে চাইবে, কিন্তু মাওবাদী সমস্যা আসলে হল অনুন্নয়নের সমস্যা - এবং অপশাসনের, যেটাকে বলতে পারি গভর্ন্যান্স ডেফিসিট।"

"টাকা খরচ এক জিনিস, আর উন্নয়নের সুফল এলাকার মানুষের হাতে পৌঁছনো, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন আর এক জিনিস। এ দুয়ের মধ্যে একটা অসামঞ্জস্য রয়েই গেছে, যেটা আমরা অ্যাড্রেস করতে পারিনি", বলছিলেন অধ্যাপক দাস।

তিনি আরও মনে করেন, যখনই হিংসা কমে গেছে - এবং পরিসংখ্যানগত দিক থেকে সেটা সত্যিও - তখনই সরকার ভেবেছে এর সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যার মূলোৎপাটন করতে না-পারায় মাওবাদী হিংসা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে।

ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জি কে পিল্লাই এদিন বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, নকশাল অধ্যুষিত এলাকায় মূল সমস্যা হল যোগাযোগের অভাব - অদূর ভবিষ্যতে তিনটি নির্মীয়মান ব্রিজের কাজ শেষ হলে এলাকার ছবিটা বদলাতে বাধ্য।

"আর দু-এক বছরের মধ্যে ইন্দ্রাবতী নদীর ওপর একটি ব্রিজ, মোটু ব্রিজ আর ওড়িশার দিকে আর একটা ব্রিজের কাজ শেষ হলেই বিস্তীর্ণ একটা অঞ্চল তথাকথিত সভ্যতার মধ্যে চলে আসবে।"

"আমি হোম সেক্রেটারি থাকার সময়ে এমন এলাকাতেও গেছি, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে, জিজ্ঞেস করার পর উত্তর পেয়েছি লেনিন বা স্টালিন। কারণ মাওবাদীরা তাদের সেরকমই বুঝিয়েছে, আর স্বাধীনতার সত্তর বছরেও সেখানে পা পড়েনি কোনও সরকারি কর্মকর্তার", বলছিলেন তিনি।

আরও বেশি সংখ্যায় সেনা মোতায়েন বা সেতু-সড়কের নির্মাণ সেই ছবি কতটা পাল্টাতে পারবে তা দেখার বিষয়, তবে অ্যাক্টিভিস্ট ও গবেষক নন্দিনী সুন্দরের মতে সঙ্কট সমাধানের জন্য শান্তি-আলোচনার কোনও বিকল্প নেই।

তার কথায়, "ভারতীয় রাষ্ট্রের খুব পুরনো সমস্যা হল তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসই করে না। অথচ সারা দুনিয়ায় এর কত উদাহরণ আছে - এমন কী কলম্বিয়াতে সফল শান্তি আলোচনার পর গত বছর সে দেশের প্রেসিডেন্ট যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল এ দেশেও তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিন্তু সরকার যে আদৌ উৎসাহী নয়!"

মাওবাদীদের সঙ্গে না-হোক, অন্তত ওই সব এলাকার গ্রামবাসীদের সঙ্গে বসে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর - খুন-ধর্ষণ-ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলোর প্রতিকার করা হোক সেই দাবিই জানাচ্ছেন মিস সুন্দরের মতো আরও অনেকে।

কিন্তু মাওবাদী বিদ্রোহীদের দমনে সরকারের নীতি এখনও হল আরও জোরদার অভিযান এবং ব্যাপকতর উন্নয়ন, আর সেই উন্নয়নটাও সরকারের মতো করেই।

সম্পর্কিত বিষয়