witness sikh bus drivers
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

ব্রিটিশ শিখরা যেভাবে পাগড়ি রক্ষার আন্দোলন করেছিলেন

উনিশশো উনসত্তর সালের এপ্রিল মাসে। এই মাসেই উত্তর ইংল্যান্ডের একটি শহর উলভারহ্যাম্পটনের শিখ ধর্মাবলম্বী বাস ড্রাইভাররা তাদের মাথার পাগড়ি পরে বাস চালানোর অধিকার অর্জন করেন। আর এই অধিকার পাওয়ার জন্য তাদের লড়তে হয়েছিল দুই বছর।

আভতার সিং আজাদ ভারত থেকে ব্রিটেনে আসেন ১৯৬১ সালে। সে সময় তার বয়স ছিল ২১ বছর। সেই সময়ে ইউকে-তে প্রায় এক লক্ষ ৩০ হাজার শিখ বাস করতেন। উনিশশো পঞ্চাশ আর ১৯৬০-এর দশকে ভারত থেকে যে বিপুল সংখ্যক শিখ ব্রিটেনে আসেন তাদের বেশিরভাগই চলে যান দেশের উত্তর আর মধ্যাঞ্চলে। ব্র্যাডফোর্ড, লিডস এবং বার্মিংহামের কাপড়ের কলগুলোতে তারা চাকরি করতেন।

ব্রিটেনে কাজ করতে হলে তার দীর্ঘ চুল কেটে ফেলতে হবে এবং দাড়ি কামিয়ে ফেলতে হবে, এটা আভতার সিং প্রায় মেনেই নিয়েছিলেন। সেই দিনটির কথা স্মরণ করে তিনি বলছিলেন, নাপিতের দোকানে গিয়ে যেদিন তিনি পাগড়ি খুলে ফেলেন এবং চুল ছেঁটে ফেলেন সেদিন খুবই খারাপ লেগেছিল। সেই সময় চুল না ছাঁটলে বা দাড়ি না কামালে কেউ চাকরি দিতো না।

"সে সময় বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি ছিল গুডইয়ার টায়ার কোম্পানি। সেখানে চাকরি করতে হলে আমাকে আমার চুল-দাড়ি কামিয়ে ফেলতো হয়েছিল," তিনি বলছিলেন, "আমরা ইউকে-তে এসেছিলাম একটা সুন্দর জীবনের আশায়। কিন্তু চাকরি না থাকলে সেই জীবন আমরা কিভাবে পেতাম?"

গুডইয়ার টায়ার ফ্যাক্টরিতে কয়েক বছর কাজ করার পর আভতার সিং আজাদ চাকরি নেন উলভারহ্যাম্পটন শহরের একটি বাস কোম্পানিতে। সেখানে তিনি মাথার চুল এবং দাড়ি কামিয়ে ফেলেন। সেই সময়ে বাসের ড্রাইভার কিংবা কন্ডাকটর হিসেবে কাজ করতেন খুব অল্প সংখ্যক শিখ। যারা ছিলেন তারা প্রায়শই বর্ণবাদী নিগ্রহের শিকার হতেন।

ছবির কপিরাইট রয়টার্স
Image caption পরে পুলিশ বিভাগসহ অন্যান্য পেশাতেও শিখরা পাগড়ি ব্যবহারের অনুমতি পান।

"আমরা যেখানেই যেতাম লোকে আমাদের গালাগালি করতো। পানশালায় গেলে আমাদের বলা হতো তোমাকে এক গ্লাসের বেশি মদ দেব না। এক গ্লাস খেয়ে পাব থেকে বেরিয়ে যাও।"

"আমার মনে হয় শিখদের পাগড়ির জন্য তাদের আলাদা করে চেনা যেত। এবং পাগড়ি-দাড়িওয়ালা শিখদের মানুষ ভালভাবে গ্রহণ করতে পারতো না।"

আভতার সিং আজাদ বলছিলেন, বাসের মধ্যে বসে তরুণরা তাদের গালাগালি করতো। একটি ঘটনা তার মনে আছে যেখানে বার্মিংহাম শহরে বাস চালানোর সময় একবার তার দিকে থুথু ছোঁড়া হয়। কিন্তু সেদিন তাকে চুপ করে থাকতে হয়েছিল। কিছু একটা করলেই তাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হতো। সে সময় বেশিরভাগ বাস-ড্রাইভারই ছিল শ্বেতাঙ্গ।

ধর্মীয় অনুশাসন মতো পাগড়ি পরতে না পারা কিংবা দাড়ি রাখতে না পারার বিষয়টি নিয়ে মি. আজাদ এবং অন্যান্য শিখ ড্রাইভাররা বাস কোম্পানির সাথে কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাদের বলা হয়েছিল উলভারহ্যাম্পটন ট্রান্সপোর্ট কমিটির নীতি হচ্ছে সব কর্মচারীকে দাড়ি কামাতে হবে।

আভতার সিং আজাদ জানান, বাস গ্যারেজের সুপারিন্টেনডেন্ট ছিলেন মি. বার্টল। তিনি বলেছিলেন, এটাই হচ্ছে কর্পোরেশনের নীতি। সব কর্মচারীকে শেভ করতে হবে। কোন কর্মচারী মাথায় পাগড়ি পরতে পরবে না। কিংবা দাড়ি রাখতে পারবে না। এই নীতি বদলাতে হলে কর্পোরেশনের আইন বদলাতে হবে।

এরপর শিখ বাস ড্রাইভার এবং কন্ডাকটররা সিদ্ধান্ত নিলেন এই নীতি বদলাতে হবে এবং তার জন্য আন্দোলন করতে হবে। ১৯৬৭ সালের গ্রীষ্মকালে আভতার সিং-এর একজন সহকর্মী তারসেম সিং সাঁধু অসুস্থকালীন ছুটি শেষ করে কাজে যোগ দিলেন। কিন্তু দেখা গেল তার মুখে দাড়ি এবং মাথায় পাগড়ি। আভতার সিং আজাদ এবং সহকর্মীরা এই ঘটনাটিকে একটি পরীক্ষা হিসেবে ধরে নিলেন।

"আমরা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে পাগড়ি পরার অধিকার নিয়ে আমরা আন্দোলন করবো। সুতরাং আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম এটা দেখার জন্য যে দাড়ি-পাগড়ি নিয়ে তারসেম সিং সাঁধু কাজে যোগ দেয়ার পর তার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কী করে।"

ঐ ঘটনায় তারসেম সিং সাঁধুকে বরখাস্ত করা হলে তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে হৈচৈ পড়ে যায়।

ছবির কপিরাইট পিএ
Image caption পশ্চিম লন্ডনের একটি শিখ গুরুদুয়ারায় ব্রিটেনের রানি এবং প্রিন্স ফিলিপ

আভতার সিং আজাদ বলছেন, "এরপরই আমরা শুরু করলাম আমাদের আন্দোলন। সে সময় আমাদের ইউনিয়ন বলেছিল, যদি বেশিরভাগ সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেয় তাহলে ইউনিয়ন আমাদের পাশে থাকবে এবং সাহায্য-সহযোগিতা করবে। সমর্থন না দিলে তারা কিছু করতে পারবে না।"

"বহু চেষ্টা করে আমরা ইউনিয়নের ভোটে জিতেছিলাম। মুসলমান এবং জ্যামাইকানরা সে সময় আমাদের অনেক সাহায্য করেছিলেন। এমনকি হিন্দুরা, যারা পাগড়িতে বিশ্বাস করতো না, তারাও আমাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।"

অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে শিখ বাস ড্রাইভাররা পরিবহন খাতের ইউনিয়নগুলিতে জয়লাভ করেন। এরপর তারা উলভারহ্যাম্পটন বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। পরের কয়েকমাস ধরে আন্দোলনটি বেশ গতি অর্জন করে। মিছিল মিটিং-এর আয়োজন করা হয়। এমনকি ভারতের রাজধানী দিল্লিতেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে এই ইস্যুতে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভটির আয়োজন করা হয়। সেদিন চার হাজারেরও বেশি মানুষ নীরবে উলভারহ্যাম্পটন শহরের ভেতর সড়ক পথে মিছিল করে যান।

শিখ সম্প্রদায় এই বিষয় নিয়ে চিঠিপত্র লিখতে থাকেন। বিভিন্ন পর্যায়ে দেন-দরবার শুরু করেন। ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর দফতরেও একটি আবেদনপত্র পাঠানো হয়।

আর এই আন্দোলন ব্যক্তিগতভাবে আভতার সিং আজাদকে আঘাত করতে শুরু করে। "এই আন্দোলন চলার সময় কোন একটি বর্ণবাদী গ্রুপ- ঠিক বলতে পারবো না কোনটি - তারা আমার বাড়ির পেছনে বাগানে আগুন ধরিয়ে দেয়। সম্ভবত তাদের লক্ষ্য ছিল ভয় দেখিয়ে আমাকে ঐ আন্দোলন থেকে সরিয়ে আনা।"

ছবির কপিরাইট পিএ
Image caption লন্ডনের শিখদের বৈশাখী মিছিল।

কিন্তু এই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি ঘটনা। পাগড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে শিখ কমিউনিটির একজন নেতা সোহান সিং জলি নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, শিখ নববর্ষ, অর্থাৎ ১৯৬৯ সালের ১৩ই এপ্রিল তিনি আত্মহত্যা করবেন। সে সময়ে এক সাক্ষাৎকারে মি. জলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই আত্মহত্যার জন্য তিনি কী ভয় পাচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, কোন কিছুর জন্য তিনি ভীত নন। এই নিষেধাজ্ঞা তার ধর্মের ওপর সরাসরি আঘাত।

মি. জলির আত্মহত্যার দিন যতই ঘনিয়ে আসতে থাকে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপও ততই বাড়তে থাকে। ১৯৬৯ সালের ৮ই এপ্রিল বিষয়টি নিয়ে উলভারহ্যাম্পটন শহরের কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করার জন্য সরকারের একজন উপমন্ত্রীকে লন্ডন থেকে পাঠানো হয়। এর পরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যের বাসের শিখ ড্রাইভার এবং কন্ডাকটরদের পাগড়ি পরে কাজে যোগদানের অনুমতি দেয়া হয়।

এই ঘটনার পরদিন লন্ডনের শিখ গুরুদুয়ারাগুলিতে আনন্দ উৎসব করা হয়। এই বিজয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন আভতার সিং আজাদ। এর পরই উলভারহ্যাম্পটন বাস গ্যারেজ থেকে তার সাথে যোগাযোগ করা হয়।

আভতার সিং আজাদ বলছিলেন, "মি. বার্টল আমার কাছে ফোন করেন। তিনি বলেন, কর্পোরেশন আমাদের দাবিদাওয়া মেনে নিয়েছে। তিনি জানতে চান, তাদের ইউনিফর্মে কী পরিবর্তন আনতে হবে? কারণ আমাদের ইউনিফর্মের জন্য পাগড়ি উলভারহ্যাম্পটন কর্পোরেশন কিনে দেবে। আমি তাকে বললাম শিখদের রঙ হচ্ছে নীল। তাই আমরা বললাম পাগড়ির রঙ হওয়া উচিত নীল।"

"মি. বার্টলই আমাদের কর্পোরেশনের কেনা পাগড়ি সরবরাহ করেন। সেই পাগড়ি পরে আমরা দুজন ড্রাইভার এই প্রথমবারের মতো ডিউটিতে এসে যোগ দিলাম। প্রথম ছিলাম আমি। আমার পরে এসে কাজে যোগ দিয়েছিলেন দীদার সিং নামের আরেকজন ড্রাইভার।"

এত বছর পর যখন ১৯৬৯ সালের ৯ই এপ্রিলের সেই দিনটির কথা স্মরণ করেন, তখন কেমন লাগে আভতার সিং আজাদের? তিনি বলছিলেন, "আমি খুব খুশী হয়েছিলাম। কারণ আমি আমার ধর্ম ফিরে পেয়েছিলাম। যে কোন ধর্মই হোক না কেন আপনি যখন সেটাতে বিশ্বাস আনবেন, তখন সেই ধর্ম আপনাকে কিছু শক্তি জোগাবে। আমার ক্ষেত্রেও সেই বিশ্বাসের শক্তি আমি ফিরে পেয়েছিলাম।"

আভতার সিং আজাদ এরপরের ৩২ বছর ধরে বাস ড্রাইভার হিসেবে কাজ করে যান। তিনি অবসর নেন ২০০৫ সালে। ব্রিটেন এবং ভারতের চণ্ডীগড়ে সময় ভাগাভাগি করে এখন তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।

(বিবিসির ফারহানা হায়দারের তৈরি ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি পরিবেশন করেছেন মাসুদ হাসান খান।)

সম্পর্কিত বিষয়