'চরিত্র গঠনের জন্যই লেখায় এসেছে ধর্মের পাশাপাশি যৌনতা '

  • ৩১ মে ২০১৭
লেখক কাশেম বিন আবুবাকার
Image caption লেখক কাশেম বিন আবুবাকার

মানুষের চরিত্র গঠনের উদ্দেশ্যে লিখতে শুরু করেন কাশেম বিন আবুবাকার। আর এজন্য তিনি ধর্মের সাথে মিশিয়ে দেন প্রেম আর হালকা যৌনতা। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এভাবেই সহজেই তরুণ পাঠকদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তিনি বলছেন, ''কোরান হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে, তার আলোকে আমি বই লিখেছি,যে তোমরা এই ভাবে চলো, এইভাবে জীবন গড়ো। কোরান হাদিসের অনেক বই তো আছে, সেগুলো তো তারা পড়ছে না। তাই আমি উপন্যাসের আদলে এসব বিষয় লিখেছি। তার সঙ্গে প্রেম বা যৌনতা এসেছে। সেটা না দিলে তো ওরা পড়বে না।''

মি. আবুবাকার বলছেন, বর্তমান সমাজের চিত্র হিসাবেই সেসব এসেছে। কিন্তু তিনি বরাবরই চেয়েছেন লেখার মাধ্যমে মানুষের চরিত্র গঠন করতে।

বাংলা ভাষায় একশোরও বেশি বই বেরিয়েছে তাঁর, বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন তিনি।

কিন্তু মূলধারার বাংলা সাহিত্যের চর্চা যারা করেন, খোঁজ-খবর রাখেন, তাদের অনেকে নাকি এই লেখকের নামই শোনেননি।

কাসেম বিন আবুবাকার তাঁর মূলত গ্রামীণ পটভূমির উপন্যাসে ইসলামী আদর্শ প্রচার করেন। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, পাঠক আকর্ষণের একই সঙ্গে জন্য তাঁর লেখায় এক ধরণের যৌনতারও সংমিশ্রণ ঘটানো হয়।

বিবিসিকে তিনি বলছেন, ''বর্তমান সমাজের যে চিত্র বা অবস্থা, সেখানে তো সেগুলো থাকবেই। ভালো দিকটাও অর্ধেকটা আছে। আমি কোথাও নায়ককে ধার্মিক করেছি, তার দ্বারা নায়িকা আকর্ষিত হয়েছে, আবার কোথাও নায়িকাকে ধার্মিক করেছি, যার মাধ্যমে নায়ক ভালো হয়েছে। হয়তো এটা ঠিক না, তারপরেও আমি এটা করেছি, না হলে বই তো কেউ পড়বে না। তারা যাতে আমার বইটা পড়ে, সেভাবেই বইগুলো লিখেছি। বইগুলোর প্রচুর চাহিদাও হয়েছে।''

''বর্তমান সমাজকে দেখাতে গিয়েই যৌনতা এসেছে, সুড়সুড়ি কিন্তু কোন বইতে নেই। এই যৌনতাও বেশিদূর এগোয়নি।'' বলছেন মি. আবুবাকার।

বিবিসিকে এর জবাবে কাসেম বিন আবুবাকার বলছিলেন, "নাম-যশ-অর্থ কোনও দিনই আমার লক্ষ্য ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম মানুষের চরিত্র গঠন করতে, আর তাই কোরান-হাদিসের আলোকে চিরকাল মানুষকে মানুষের মতো করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়েই লিখে গেছি।"

বইয়ের পাশাপাশি নিজের জীবনের প্রেম এসেছিল কাশেম বিন আবুবাকারের। তবে সেই প্রেম সফল হয়নি।

কাশেম বিন আবুবাকার প্রথম বই 'ফুটন্ত গোলাপ' লেখেন ১৯৭৮ সালে। অনেক প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু তার বই কেউ প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। এমনকি তিনি যে প্রকাশনীতে চাকরি করতেন, তারাও রাজি হয়নি।

সবাই বলেছেন, বইটা ভালো, কিন্তু এরকম মোল্লাদের বই কেউ পড়বে না।

অবশেষে একজন প্রকাশক আগ্রহ করে বইটি প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় সংস্করণের সময় মাত্র ১ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি তার কাছে স্বত্ব বিক্রি করে দেন।

তিনি বলছেন, ''পরবর্তীতে এমন হয়েছে, প্রকাশকরা এক লক্ষ টাকা অ্যাডভানস দিয়ে আমার বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতো। অনেক সময় তাদেরকেও আমি বই দিতে পারতাম না।''

মি. আবুবাকার জানান, কখনো লেখালেখি করবেন, স্বপ্নেও ভাবেননি। তিনি যখন মল্লিক ব্রাদার্স নামের একটি বইয়ের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, তার দোকানে আসা পুরুষ নারীদের অশালীন চলাফেরা দেখে তার বই লেখার ইচ্ছা হয়। এমন বই, যার মাধ্যমে তাদের নৈতিক শিক্ষা দেয়া যাবে।

দোকানে আসা একজন পর্দানশীন নারীর অনুকরণে তিনি তার প্রথম বইয়ের নারী চরিত্র তৈরি করেন।

পরবর্তীতেও তার উপন্যাসের চরিত্র হিসাবে এসেছে ব্যক্তি জীবনের নানা চরিত্র। তাদের অনেকের গল্প তিনি তার উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন, যার মধ্যে রয়েছে তার নিজের জীবনের অনেক কাহিনীও।

আরো পড়ুন:

‘প্রতিবন্ধী মেয়েদের ঋতুস্রাব বন্ধ করার ব্যবস্থাও করা হয়’

মোদীর সাথে বৈঠকে কেন সমালোচিত হলেন প্রিয়াঙ্কা

‘হুমকি দেয়ার একটা রূপ চাপাতি, অন্যটা মামলা’

‘বাংলাদেশ ক্লিয়ারলি আন্ডার-ডগ, ইংল্যান্ড ফেভারিট’

Image caption লেখকের জনপ্রিয় কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ

প্রথম বইয়ের সাফল্যের পর তিনি এ পর্যন্ত ১০০টি বই লিখেছেন। তার বেশিরভাগ প্রেমের উপন্যাস। একটা পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি শুধুমাত্র উপন্যাস লেখাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।

ইসলামী ভাবধারায় এই মূল্যবোধ-নির্ভর সাহিত্যই তার পাঠকপ্রিয়তার আসল রহস্য বলে মনে করেন কাসেম বিন আবুবাকার। তবে সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করেন, তার পাঠকদের ৮০ শতাংশই গ্রামের, বাকিরা শহরের।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় কাশেম বিন আবুবাকারের জন্ম। মেট্রিকুলেশন পাসের পর সেখানেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন।

তার ভাষায়, 'স্বপ্নে আদেশ' পেয়ে ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সপরিবারে চলে আসেন। প্রথমদিকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। কিছুদিন খুলনায় কাটিয়ে পরে ঢাকায় মল্লিক ব্রাদার্সে টাইপিস্ট কাম সেলসম্যান পদে চাকরি পান। সেই চাকরিতেই ছিলেন পরের দুই দশক।

১০০টির বেশি বই প্রকাশের পরেও বরাবরই মুল ধারার গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থেকেছেন কাশেম বিন আবুবাকার।

তিনি বলছেন, তার সাথেও যেমন কেউ তেমন একটা যোগাযোগ করেননি, কারো কাছে যেতেও তার ভালো লাগেনি।

তিনি সর্বশেষ বইটি লিখেছেন ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর শারীরিক অসুস্থতা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়ার কারণে লেখালেখি বন্ধ রেখেছেন।

তিনি জানালেন, ''বই না লিখলেও, এখনো তার ভক্তরা প্রায়ই ফোন করে তার খোঁজখবর নেন।''

তার চার ছেলে আর দুই মেয়ে। ঢাকায় সন্তানদের সঙ্গে এখন অবসর জীবনযাপন করছেন ৮০ বছরের এই লেখক।

তিনি বলছেন, ''আমি যা চেয়েছিলাম, তা পৌছাতে পেরেছি পাঠকদের কাছে।''

সম্পর্কিত বিষয়