ভারতে কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের ইমামকে ঘিরে জোর বিতর্ক

  • ১৩ মে ২০১৭
টিপু সুলতান মসজিদ
Image caption টিপু সুলতান মসজিদ

ভারতে কলকাতার প্রখ্যাত টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম নুর-উর রহমান বরকতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে সেখানকার ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলিমরাও।

একদিকে, তাকে ইমাম পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মসজিদটির মুতোয়াল্লী, অন্যদিকে মুখ খুলেছেন রাজ্যেরই এক মন্ত্রী যিনি মুসলমানদের ধর্মীয় নেতাও।

ইমামদের একাংশ বলছেন, মি. বরকতির সাম্প্রতিক কথাবার্তায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট হতে বসেছে।

তার বক্তব্যগুলির বিরুদ্ধে পুলিশের কাছেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অন্ধকার সাইবার জগতের এক হ্যাকারের গল্প

বাংলাদেশেও র‍্যানসমওয়্যারের আক্রমণ

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আজ বিকেলে টিপু সুলতান মসজিদের সামনে বিক্ষোভ করছেন কয়েকশো মুসল্লি এবং কয়েকজন ইমাম।

মি. বরকতি গত কদিন ধরে যেসব বক্তব্য রাখছেন, তার মধ্যে সবথেকে বেশি আলোচিত হচ্ছে তিনটি বিষয়।

প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে কোন ভিআইপি-ই আর গাড়ির মাথায় লালবাতিসহ বীকন লাগাতে পারেন না। কিন্তু টিপু সুলতান মসজিদের এই ইমামের বক্তব্য- ওই লালবাতি লাগানোর অধিকার তার পরিবারকে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ব্রিটিশ সরকার দিয়ে গিয়েছিল।

ওই বাতি তিনি একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নির্দেশ দিলে তবেই সরাবেন।

মমতা ব্যানার্জী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নিজে কোনদিনই লালবাতি লাগানো গাড়ি ব্যবহার করেন না।

দ্বিতীয়ত, ইমাম মি. বরকতি বলেছিলেন, তার ভাষায়, "ভারত যদি হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে যায়, তাহলে দেশে বসবাসকারী ২৫-৩০ কোটি মুসলমানকে পাকিস্তান দিয়ে দেওয়া হোক।" এই বক্তব্যের কোন ব্যাখ্যা দেননি তিনি। তবে হিন্দু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের কায়দায় জেহাদ করার কথাও বলেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, তিনি এও বলেছিলেন যে কোন মুসলমান ব্যক্তি যদি আরএসএস বা বিজেপির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তাকে ভালমতো পিটিয়ে সমাজচ্যুত করা হবে।

ছবির কপিরাইট NURUR RAHMAN BARKATI
Image caption টিপু সুলতান মসজিদের বিতর্কিত ইমাম নুর উর রহমান বরকতি

পর পর তার এই বক্তব্যগুলো সংবাদমাধ্যমে আসতে থাকায় সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

তারই প্রেক্ষিতে টিপু সুলতান মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা মুতোয়াল্লী আনোয়ার আলি শাহ সুপারিশ করেছেন মি. বরকতিকে অপসারণের জন্যে।

"অনেকবার ইমামকে বারণ করা হয়েছে মসজিদকে যেন তিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করার জন্য ব্যবহার না করেন। কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছিলাম, কোনও জবাব পাই নি। আমি সুপারিশ পাঠিয়েছি মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছে যাতে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার জন্য আমাদের মসজিদের নাম খারাপ হচ্ছে, হিন্দু মুসলমান - একে অপরকে ভুল বুঝছে," বলেন টিপু সুলতানের বংশধর ও মসজিদের মুতোয়াল্লী আনোয়ার আলি শাহ।

রাজ্যের মন্ত্রী ও মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলছেন, "বরকতি ভারতের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চাইছেন। বাংলার মুসলমানকে বিপথগামী করতে চাইছেন। ইমামতির পবিত্র পদকে তিনি কলুষিত করছেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে বিজেপির সঙ্গে ওই ইমামের যোগাযোগ আছে। হিন্দু ভোট একজোট করার জন্য বিজেপি-ই তাকে খেলাচ্ছে।"

মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে -মি. বরকতির এই দাবির বিষয়ে মি. চৌধুরী বলেন, "জমিয়েতে উলেমা এ হিন্দের রাজ্য সভাপতি হিসাবে আমার মনে হয়েছে তার এসব বক্তব্য খণ্ডন করা দরকার।"

Image caption ইমামের বিরুদ্ধে স্থানীয় মুসল্লিদের সমাবেশ

মুসলিম যুব নেতা, মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, "বরকতি সাহেবের এইসব কথাগুলো আদতে মুসলমান সমাজেরই ক্ষতি করছে। তিনি একজন ইমাম হিসাবে নয়, মমতা ব্যানার্জীর ছবি টাঙ্গিয়ে একজন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা হিসাবে কথাগুলো বলছেন। এতে হিন্দু - মুসলমান বিভেদটা আরও বাড়ছে যা থেকে বিজেপি-আরএসএস ফায়দা তুলছে। তার কথাবার্তা নিয়ে আমাদের সমাজের মধ্যেই রিঅ্যাকশন হচ্ছে।"

এই পরিস্থিতিতে সরকার একেবারে চুপ করে নেই। ইমামের সঙ্গে আলোচনা করতে টিপু সুলতান মসজিদে গেছেন রাজ্যের মন্ত্রী ও মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠতমদের একজন ফিরহাদ হাকিম। দুজনের মধ্যে আলোচনার পরে মি. বরকতি নিজের গাড়ি থেকে লালবাতি খুলে দিয়েছেন।

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ইমাম বরকতি।

বিবিসিকে তিনি বলেছেন, "এটার জন্য সংবাদমাধ্যম দায়ী। তারা আমার মুখে নিজেদের ভাষা বসাচ্ছে। কোন কথা কি ভারতকে অপমান করার জন্য আমি বলেছি? আমি তো আরএসএস সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছি যে যদি তোমরা আমাদের - মুসলমানদের না চাও তাহলে দিয়ে দাও!"

তাকে ইমাম পদ থেকে সরানোর যে সুপারিশ করা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে মি. বরকতি বলছিলেন, "আমাকে ইমাম পদ থেকে সরানোর আনোয়ার কে? ওরা কেউ নয় এই মসজিদের - এখানে আমার পরিবার ইমামতি করছে ৮০ বছর ধরে।

ওদিকে ইমাম বরকতির সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোর বিরুদ্ধে কলকাতার দুটি থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

সম্পর্কিত বিষয়