নতুন করে আরো একটি সাইবার হামলার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

শুক্রবারের সাইবার হামলার শিকার হয়েছে হাজার হাজার কম্পিউটার ছবির কপিরাইট Webroot
Image caption শুক্রবারের সাইবার হামলার শিকার হয়েছে হাজার হাজার কম্পিউটার

শুক্রবার বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের সাইবার হামলার পর শিগগিরই আরো একটি বড় ধরনের সাইবার হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবারের সেই সাইবার হামলার শিকার হয় এক লাখ পঁচিশ হাজারেরও বেশি কম্পিউটার সিস্টেম।

'ম্যালওয়ের টেক' ছদ্মনামে পরিচিত যুক্তরাজ্যের একজন নিরাপত্তা গবেষক, যিনি কম্পিউটারে 'র‌্যানসমওয়্যার' মোকাবেলায় অদ্ভুতভাবে সাহায্য করেছেন, তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন "আরো একটি সাইবার হামলা আসন্ন...খুব সম্ভবত সোমবার।"

স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, ইটালি, রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্তত একশো দেশে শুক্রবার ওই সাইবার হামলা হয়, ওসব দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে 'র‍্যানসমওয়্যার' ছড়িয়ে পড়ে যা কম্পিউটার ব্যবহারকারীর ফাইল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডিজিটাল মুদ্রা 'বিট কয়েনের' মাধ্যমে ৩০০ ডলার করে চাওয়া হয়।

অনেক দেশের স্বাস্থ্য, টেলিকম বা যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত এই হামলার শিকার হয়।

বিশেষ করে বড় ধরনের হামলার মুখে পড়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস। দেশটির হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা সেবা বন্ধ রাখতে হয়। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের অন্তত ৪৮টি সিস্টেম এই হামলার শিকার হয়।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাম্বার রাড শনিবার বলেছেন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ছয়টি সিস্টেম তারা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন কিন্তু কম্পিউটারকে ভাইরাসমুক্ত রাখার জন্য আরো অনেক কিছু করার আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্পেনের টেলিকম ও জ্বালানি কোম্পানি, যুক্তরাষ্ট্রের ডেলিভারি কোম্পানি ফেডএক্সও এই সাইবার হামলার শিকার হয়েছে।

আরো পড়ুন:

অন্ধকার সাইবার জগতে বাংলাদেশী এক হ্যাকারের গল্প

বাংলাদেশেও র‍্যানসমওয়্যারের আক্রমণ

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption সাইবার হামলায় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ

বিবিসির প্রযুক্তি সংবাদদাতা জোয়ি ক্লেইনম্যান বলেছেন, ''র‍্যানসমওয়্যার' হচ্ছে এমন এক ধরনের ম্যালওয়ার বা ভাইরাস, যা কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং ব্যবহারকারীকে প্রবেশে বাধা দেয়। অনেক সময় হার্ডডিস্কের অংশ বা ফাইল পাসওয়ার্ড দিয়ে অবোধ্য করে ফেলে। পরে ওই কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ ফেরত দেয়ার জন্য মুক্তিপণ বা অর্থ দাবি করা হয়। 'ট্রোজান ভাইরাসের' মতো এ ধরনের ম্যালওয়ার এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

'ওয়ানাক্রাই' এবং 'ভ্যারিয়্যান্ট' নামের র‍্যানসমওয়্যারের শিকার হওয়া কয়েকটি কম্পিউটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি দেখেছে- হ্যাকারদের যেসব অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা দিত বলা হয়েছে তাতে অন্তত ২২ হাজার আশি পাউন্ড জমা পড়েছে।

'ম্যালওয়ের টেক' ছদ্মনামের যুক্তরাজ্যের একজন নিরাপত্তা গবেষক যিনি অনাকাঙ্খিতভাবে ওই সাইবার হামলা আটক দিয়ে 'অদ্ভুত নায়ক' হয়ে উঠেছেন। মাত্র ৮ পাউন্ড খরচ করে বিশ্বব্যাপী ওই সাইবার হামলা আটক দেন তিনি।

তবে র‍্যানসমওয়্যার হামলার বিস্তৃতি আটকানো সম্ভব হলেও যেসব কম্পিউটার ও নেটওয়ার্ক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

২২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি বিবিসিকে বলেছেন - "খুব তাড়াতাড়ি সবাইকে তাদের কম্পিউটার সিস্টেমের 'সিকিউরিটি প্যাচ' করে নেয়া প্রয়োজন"।

"এই হামলাতো ঠেকানো গেল। কিন্তু আরেকটা সাইবার হামলা আসন্ন এবং খুব সম্ভবত ওটা আমরা ঠেকাতে পারবো না"।

"এটার সাথে বিশাল পরিমাণে অর্থ জড়িত। তারা যে এমনটা করবে না তারও কোনো কারণ নেই। কোড পরিবর্তন করে আবারো হামলা চালানো হ্যাকারদের কাছে খুব একটা কষ্টকর কাজ হবে না"।

"ফলে আবারো সাইবার হামলা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সপ্তাহান্তে না হলেও সোমবারে সকালে এমনটি ঘটতে পারে"-বলছিলেন তিনি।

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption সাইবার হামলায় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ

কিভাবে সাইবার হামলা আটকালে 'ম্যালওয়ের টেক'?

যখন বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার কথা শুনতে পান তখন সেটা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেন যুক্তরাজ্যের ওই গবেষক।

তিনি দেখতে পান কোনো কম্পিউটার 'ওয়ানাক্রাই' ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ওই কম্পিউটারটি একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওই ওয়েব ঠিকানা বা ডোমেইনটি রেজিস্টার্ডই করা হয়নি।

'ম্যালওয়ের টেক' ঠিক করেন, ওই ডোমেইনটি রেজিস্টার্ড করার। তিনি তা ৮ পাউন্ডে কিনে নেন। এরপর তিনি ওই ওয়েব ঠিকানায় গিয়ে দেখতে পান কি বিশাল পরিসরে কম্পিউটার এই ভাইরাসের শিকার হয়েছে।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, র‍্যানসমওয়্যারের কোড পরিবর্তন করে তার বিস্তার তিনি আটকে দেন। এ ধরণের কোড 'কিল সুইচ' নামে পরিচিত। অনেক সাইবার হামলাকারীরা কোনও হামলার পরিধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া আটকাতে এমন কোড ব্যবহার করে থাকে।

"এটা আসলে অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিতই বলা যায়। সারারাত আমি ঘুমাতে পারিনি"- বলছিলেন ২২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি।

ওই ডোমেইনটি বাতিল করার আগ পর্যন্ত সেখান থেকে কোনও ঝুঁকির সম্ভাবনা নেই।

এদিকে প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান প্রুফপয়েন্টের অন্যতম নিরাপত্তা গবেষক ড্যারিয়েন হাস-ও 'ম্যালওয়ের টেক' এর মতো মন্তব্য করেছেন।

শুক্রবারের ওই সাইবার হামলায় কারা জড়িত থাকতে পারে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সম্পর্কিত বিষয়