ভারতে লালু যাদব আর পি চিদাম্বরম এখন কেন বিজেপির টার্গেট?

ছবির কপিরাইট Gettys
Image caption পি চিদাম্বরম

ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই আজ (মঙ্গলবার) প্রভাবশালী দুই রাজনীতিক লালু প্রসাদ যাদব এবং কংগ্রেসের পি চিদাম্বরমের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী মি চিদাম্বরম কংগ্রেসের অন্যতম স্তম্ভ।

অন্যদিকে সাবেক রেলমন্ত্রী লালু যাদব এখনও বিহারের রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্তা। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের সরকার তার দল আরজেডি'র সমর্থনেই বিহারের নির্বাচন জিতে সরকার চালাচ্ছে।

দুজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ - তারা মন্ত্রী থাকাকালে পরিবারের স্বার্থে অবৈধ লেনদেনে অনুমোদন দিয়েছিলেন।

দিল্লিতে আমাদের সংবাদদাতা শুভজ্যোতি ঘোষ জানাচ্ছেন হঠাৎ এই সিবিআই তল্লাশিতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়েছেন চিদাম্বরম নিজে এবং তার দল কংগ্রেস।

মি চিদাম্বরম নিজে একটি বিবৃতি দিয়ে বলেন, সরকার চায় না তিনি তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন।

চিদাম্বরমের দল কংগ্রেসও তার পাশে দাঁড়িয়ে অভিযোগ এনেছে, ক্ষমতাসীন বিজেপি আসলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করছে।

দলের মুখপাত্র রনদীপ সুরজেওয়ালা বলেন - বদলার আগুন এখন বিজেপির ডিএনএ-তে ঢুকে পড়েছে। রোজই কোনও না কোনও বিরোধী নেতার কণ্ঠরোধ করার ষড়যন্ত্র চলছে, সাংবাদিক বা অ্যাক্টিভিস্টদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে।

কেন তিন বছর আগে ক্ষমতা নিলেও নরেন্দ্র মোদীর সরকার এখন কেন এসব পুরনো ঘটনা টেনে তুলছেন?

ভারতের জাতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসের সিনিয়র এডিটর এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, ২০১৯ এর নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দল কংগ্রেসকে নিয়ে বিজেপি বিরোধী একটি জোট গঠনের উদ্যোগ শুরু করেছে। বিজেপি সেটা একেবারেই পছন্দ করছে না।

জোটের সেই উদ্যোগের প্রথম দফায় বিরোধীরা যৌথভাবে একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে তারা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি দিল্লিতে গিয়ে এ নিয়েই কথা বলেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সাথে।

"বিরোধী দলগুলো বুঝতে পারছে এককভাবে তারা অদূর ভবিষ্যতে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না, জোট ছাড়া কোনো উপায় নেই।"

এই জোট বিচ্ছিন্নভাবে ইতিমধ্যেই চোখে দেখা গেছে।

উদাহরণ হিসাবে মি. চট্টোপাধ্যায় - ২০১৫ সালে বিহারে লালুপ্রসাদ যাদব এবং নীতিশ কুমার তাদের ১৭ বছরে শত্রুতা পেছনে রেখে জোট বেঁধে নির্বাচন করে বিজেপিকে হারিয়েছেন। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টির এবার যে নির্বাচনী জোট হয়েছিলো, তা একসময় অকল্পনীয় ছিল।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption লালু প্রসাদ যাদব

কিন্তু পি চিদাম্বরম এবং লালু যাদবকে টার্গেট করা হচ্ছে কেন?

সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, "পি চিদাম্বরম কংগ্রেসের প্রথম পাঁচজনের একজন, অর্থনীতি বিষয়ে কেউ যদি বিজেপিকে ঘায়েল করতে পারে, তিনিই সেটা পারেন।" সুতরাং দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারলে মি চিদাম্বরমের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা পোড় খাবে।

লালু যাদবের গুরুত্ব সম্পর্কে মি চট্টোপাধ্যায় বলেন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার একজন সৎ রাজনীতিক হিসাবে ইমেজ ধরে রাখতে উদগ্রীব। সুতরাং রাজনৈতিক শরীক দুর্নীতিগ্রস্থ বলে প্রমাণিত হলে, বিজেপির পক্ষে নীতিশ কুমারকে দ্বিধাগ্রস্ত করা সহজ হবে।

ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।

দিল্লিতে বিজেপির মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেন খবরের কাগজে মি. চিদাম্বরম কী লিখলেন না লিখলেন সরকার তাকে এতটুকুও গুরুত্ব দেয় না।

তিনি বলেন -- কাগজে কলাম লেখেন বলে তাকে হেনস্থা করা হচ্ছে এর চেয়ে হাস্যকর কথা কিছু হতে পারে না। ওনার কলামের কোনও গুরুত্ব নেই, তাতে কোনও তুফানও ওঠেনি। তিনি বরং বলুন, অর্থমন্ত্রী থাকার সময় ফরেন এক্সচেঞ্জ প্রোমোশন বোর্ড যাদের লগ্নির অনুমতি দিয়েছে, তারা কেন তার ছেলের কোম্পানিতে টাকা ঢেলেছে? দেশ এ প্রশ্নেরই উত্তর চায়।

সৌভদ্র চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বলছেন - ভারতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই সিবিআইকে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহার করেছে। নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি যে তার ব্যতিক্রম হবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।

চিদাম্বরম ও লালু যাদবের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ?

মঙ্গলবার সকালে সিবিআই গোয়েন্দারা চেন্নাইতে পি চিদম্বরমের বাড়ি-সহ মোট ডজনখানেক ঠিকানায় একসঙ্গে হানা দেন। চিদাম্বরম অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন একটি মিডিয়া সংস্থাকে অবৈধ বিদেশি লগ্নি গ্রহণের অনুমতি পাইয়ে দিয়েছেন - আর তার বিনিময়ে তার ছেলে কার্তি চিদাম্বরম পেয়েছেন মোটা অঙ্কের ঘুষ, এই অভিযোগের তদন্তেই অভিযান চালানো হচ্ছে বলে সিবিআই জানায়।

ওদিকে চেন্নাইতে যখন চিদাম্বরমের বাড়িতে হানা চলছে, একই সময়ে সাবেক রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব ও তার মেয়ে মিসা ভারতীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অন্য একটি অভিযোগের তদন্তে হানা দেওয়া হয় দিল্লি ও গুরগাঁওয়ের প্রায় কুড়িটি ঠিকানায়। বেনামে জমি কেনাবেচা করে লালু ও তার পরিবারের সদস্যরা অন্তত ১০০০ কোটি টাকার বেআইনি সম্পত্তি করেছেন, এই অভিযোগের তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতেই অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানানো হয়।

কংগ্রেস নেতারা বলছেন, গত তিন বছরে সরকার যে চুপচাপ হাত গুটিয়ে ছিল তা থেকেই বোঝা যায় অভিযোগটা ভিত্তিহীন - সরকারের আসল উদ্দেশ্য বিরোধীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করানো।

সম্পর্কিত বিষয়