বাংলাদেশে সম্প্রতি একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বিচারের নাম-গন্ধ নেই কেন?

  • ১৭ মে ২০১৭
রোকেয়া লিটা ছবির কপিরাইট রোকেয়া লিটা

খুব অল্পদিনের ব্যবধানেই বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা কানে এলো, যেখানে ধর্ষণের মামলা নিতে গড়িমসি করেছে পুলিশ। খুব সম্প্রতি যে ঘটনাটি নিয়ে খুব সমালোচনা চলছে, সেটি হলো ঢাকায় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে এনে ধর্ষণ করে ভিডিও করার ঘটনাটি।

সন্দেহভাজন ধর্ষকরা বিত্তবান পরিবারের সন্তান। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় মাস পর ওই ছাত্রীরা ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে, পুলিশ প্রথমে অভিযোগ নিতেই চাইনি।

এ বছরের এপ্রিল মাসের দুই তারিখের ঘটনা। ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার ব্যারাকে নিজ কক্ষে শরীরে আগুন দেন কনস্টেবল হালিমা। ওইদিনই সন্ধ্যায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় তার।

পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যে, আত্মহত্যা করার আগে কনস্টেবল হালিমা তার ডায়েরিতে লিখে রাখেন যে তার আত্মহত্যার একমাত্র কারণ তারই একজন সহকর্মী পুলিশ অফিসার, যিনি হালিমাকে ধর্ষণ করেন মার্চ মাসের ১৭ তারিখে রাত দুইটায়!

হালিমা আরও লেখেন যে, তার অভিযোগ গ্রহণ করেনি অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) । হালিমার বাবা অভিযোগ করেন, একে তো হালিমা নিজ ব্যারাকে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তারপর সহকর্মীরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে।

এত অপমান সহ্য করতে পারেনি হালিমা।

ছবির কপিরাইট Focus Bangla
Image caption ধর্ষণের বিরুদ্ধে ঢাকায় বামপন্থীদের বিক্ষোভ

আরো পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুর 'হিন্দুত্ব' বাঁচাতে তোড়জোড়

এবার একটু হিসেব-নিকেশ করে নেই। কনস্টেবল হালিমা ধর্ষিত হয় মার্চ মাসের ১৭ তারিখে এবং আত্মহত্যা করে এপ্রিলের দুই তারিখে। অর্থাৎ ধর্ষিত হবার পরে হালিমা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় বেঁচে ছিলেন বিচারের আশায়।

বিচার না পেয়ে অবশেষে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

আমি তো ভাবতেই পারছি না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়োজিত একজন নারী সদস্যই যদি থানায় নিজের ওপর ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করতে এতটা বাধার সম্মুখীন হন এবং ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তাহলে এই পেশার বাইরে যারা আছেন তাদের পক্ষে ধর্ষণের অভিযোগ করা কতটা কঠিন!

কতটা কঠিন, তা বোঝার জন্য খুব দূরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। ঠিক ২৪ দিন পরের একটি ঘটনার দিকে নজর দিন।

বাংলাদেশে ধর্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করাটা সত্যিই যে অনেক কঠিন, তার আরও এক নিদর্শন পাওয়া যায় গত এপ্রিল মাসেই।

গত ২৯ শে এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে হযরত আলী নামের এক বাবা তার পালিতা শিশুকন্যা আয়েশাসহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে এই সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলেন, বাংলাদেশে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করাটাই অনেক কঠিন, বিচার পাওয়া তো দূরের কথা!

পত্রিকায় পড়লাম, হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম জানিয়েছেন, তাদের ১০ বছর বয়সী কন্যা আয়েশাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে স্থানীয় এক ব্যক্তি। কিন্তু থানায় লিখিত অভিযোগ করেও লাভ হয়নি।

উল্টো, থানার এএসআই বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য হুমকি ও মামলার ভয় দেখিয়ে অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করেন বলে অভিযোগ হালিমা বেগমের।

এখানেই শেষ নয়।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN/AFP/Getty Images
Image caption তনু হত্যার বিচারের দাবীতে বিক্ষোভ: ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পরেও অপরাধীকে এখনো চিহ্নিত করা হয়নি।

ধর্ষকের বিরুদ্ধে তো অভিযোগই লেখানো গেল না। এবার সে আয়েশাকে অপহরণ করল এবং পূর্বের ঘটনা মীমাংসা করার জন্য চাপ দিলো।

হালিমা বেগম অভিযোগ নিয়ে আবারও থানায় গেলেন। ডিউটি অফিসার অভিযোগ না নিয়ে উল্টো অপমান করে হালিমা বেগমকে থানা থেকে বের করে দেয়।

গত কয়েক দিন ধরে এসবই পড়ছি পত্রিকায়!

হালিমা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনাও প্রায় দুই মাস ধরে চলছে। অর্থাৎ পুলিশ একটি ধর্ষণের মামলা গ্রহণ করবে, তার জন্য প্রায় দুইমাস ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছিল হালিমা বেগম এবং হযরত আলী!

অভিযোগ দায়ের করতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন হযরত আলী।

কনস্টেবল হালিমা, হযরত আলী এবং আয়েশা বিচার না পেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন। তারা বেঁচে থাকতে দিনের পর দিন লড়াই করে গেলেন বিচারের আশায়, কিন্তু তাদের অভিযোগই পুলিশ গ্রহণ করেনি, বিচার পাওয়া তো দূরের কথা!

অর্থাৎ ধর্ষণ হয়েছিলেন বলেই কিন্তু, এদের কেউই আত্মহত্যা করতে যায়নি। এদের সমস্ত রাগ বা অভিমান ছিল পুলিশের ওপর!

আজকে হালিমারা আত্মহত্যা করেছে বলেই দুই/একজন অসৎ পুলিশের নাম শুনতে পাচ্ছি। কত হালিমাই না জানি আত্মহত্যাও করতে পারছে না, নীরবে সয়ে যাচ্ছে নিজেদের অপমান।

তারা আত্মহত্যা করলেন, এখন আমরা তাদের নিয়ে লিখছি। এখন যদি পুলিশের একটু দয়া-মায়া হয়।

ছবির কপিরাইট Focus Bangla
Image caption ধর্ষণের দ্রুত বিচারের দাবীতে নারী সংগঠনের সদস্যদের বিক্ষোভ

একজন অভিযোগ করতে যাবেন,তার অভিযোগ সত্যি কী মিথ্যা তা নির্ণয় করবে আদালত। পুলিশ জনগণের সেবক।

ভিকটিম অভিযোগ লেখাতে যাবে, পুলিশের কাজ অভিযোগ লিখে নেয়া। পুলিশ অভিযোগ তদন্ত করবে, বাদী বিবাদীর মধ্যে আপোষ করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব কি পুলিশের?

একজন ভিকটিম অভিযোগ করতে আসলে পুলিশ অভিযোগ নেবে না কেন? কোন ক্ষমতা বলে পুলিশ এ ধরণের ধৃষ্টতা দেখায়?

বোঝেন তাহলে অবস্থা!

একজন ভিকটিম থানায় যদি অভিযোগই দায়ের করতে না পারে, তাহলে বিচার পাবে কীভাবে? কোনো মতো যদি অভিযোগ লেখানো যায়, তারপর শুরু হয় বছর গণনা। বছরের পর বছর ধরে বিচারের আশায় দৌড়াতে হয় আদালতে।

বাংলাদেশের আলোচিত একটি -ধর্ষণ-হত্যা মামলা হলো শাজনীনের ঘটনা। বিচার পেতে সময় লেগেছে প্রায় দেড় যুগ!

শাজনীন বিত্তবান পরিবারের মেয়ে। এমন সচ্ছল পরিবারের একটি মেয়ের হত্যার বিচার পেতেই যদি দেড় যুগ সময় লাগে, তবে কনস্টেবল হালিমা আর আয়েশারা আত্মহত্যা করবে না তো আর কী করবে?

এই দেশ, এই দেশের আইনকানুন, এই দেশের বিচার ব্যবস্থা আজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে ধর্ষিতাদের আত্মহত্যাই যেন এখন একমাত্র উপায়।

কেউ বিচার পাওয়ার আশায় দেড় যুগ অপেক্ষা করেন, কেউ অভিযোগই দায়ের করতে পারেন না, বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। বিচার পাওয়া যে বড়ই কঠিন।

তারপর আবার ধর্ষণের অভিযোগকে গুরুত্বই দেয় না এই সমাজ। কেউ খোঁজে নারীর দোষ, কেউ বলে প্রেম, কেউ আবার অনৈতিক সম্পর্ক বলে ধর্ষণের অভিযোগকে উড়িয়ে দেয়। তাহলে আর কী করার থাকে হালিমাদের? আত্মহনন ছাড়া?

এজন্যই তো ধর্ষণ দিনকে দিনে বেড়েই যাচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেব অনুযায়ী এবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। ধর্ষণের পরে মারা গেছেন পাঁচজন।

আর কত বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেবে এই দেশ? দেশে যদি মানুষ বাঁচতেই না পারে, তবে আর এই উড়াল সড়ক, মেট্রো-রেল, পদ্মা সেতু দিয়ে কী হবে?

সরকার বাহাদুর, অনেক তো রাস্তা-ঘাট বানালেন, এবার একটু বিচার বিভাগের দিকে নজর দিন।

আদালতগুলোর উন্নয়ন করুন, বিচারকের সংখ্যা বাড়ান যেন কোনো ভিকটিমের পরিবারকেই বিচারের আশায় দেড় যুগ অপেক্ষা করতে না হয়। কারণ বিচার হয় না বলেই অপরাধ বেড়ে যায়।