বাংলাদেশের সরকারি ব্যাংকের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস:রাজনৈতিক না অর্থ বানিজ্য?

অপরাজেয় বাংলার সামনে প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption অপরাজেয় বাংলার সামনে প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদ

ঢাকার শাহবাগে চাকরি-প্রার্থী কয়েকশ মানুষ প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। ২০শে মে অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে দুই দফায় পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল।

সকালের পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই পরীক্ষা শুরু অন্তত ৭/৮ ঘণ্টা আগে প্রশ্ন চলে যায় পরীক্ষার্থীদের হাতে। রাত দুইটাই নিজের ফেসবুক পেজের ইনবক্সে প্রশ্ন সহ উত্তর পেয়ে যান এই চাকরী প্রার্থী।

তিনি বলছিলেন "রাতে দেখলাম আমার ইনবক্সে প্রশ্ন। পরীক্ষার হলে হুবহু মিলে গেছে। আমার অনেক বন্ধু পেয়েছে। এখন আমরা প্রতিবাদ করছি"।

সকালের পরীক্ষা হলেও বিকালে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রতিবাদ উঠে শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে। ব্যাপক আপত্তি, ও বিক্ষোভের মুখে বাতিল করতে হয় পরীক্ষা।

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption উত্তরপত্র অনেকে পেয়ে যান ফেসবুকে আগের দিন রাতে

আরেক জন বলছিলেন "আমি ঢাবি থেকে মাস্টার্স করে, পড়াশোনা করে-ব্যাংকে আমি যে সেবাটা দেবো সেটা কি একটা প্রশ্ন পাওয়া অযোগ্য ক্যান্ডিডেট দিতে পারবে? আমার মত হাজার হাজার ক্যান্ডিডেট চাকরি পাচ্ছে না। কারা করলো এটা তদন্ত করে শাস্তি হওয়া উচিত"।

বাংলাদেশে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের এই অভিযোগ নতুন নয়। গত এপ্রিলে আরেকটি সরকারি ব্যাংক জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠে।

আন্দোলনে কাজ হয় না। ঘটনা গড়ায় আদালত পর্যন্ত। শেষে এ সপ্তাহেই হাইকোর্ট থেকে জনতা ব্যাংকের ঐ পদের নিয়োগ পরীক্ষার সকল কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এখন কয়েকটি প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক ভাবেই এসে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের চারটি ব্যাংক সোনালী,রুপালী,অগ্রণী,জনতা। এই ব্যাংক গুলোতেই শুধু কেন প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে? কারা করছে এবং কেনই বা করছে।

চাকরী প্রার্থীরা নানা ধরণের অভিযোগ করছেন। কেও বলছেন এটা স্রেফ অর্থ বাণিজ্য আবার অনেকে বলছেন সরকারি ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের লোক নেয়ার চেষ্টা থেকেই এমনটা হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ড. ইফতেখারুজ্জামান

তবে গবেষণামূলক তথ্য পাওয়া গেল দুর্নীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কাছে। সম্প্রতি- সংস্থাটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ওপর গবেষণা করেছে।

তার আলোকেই প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মত এই চারটি ব্যাংকে সরকারের নিজের লোক নেয়ার চেষ্টা থাকবে অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা থাকবে এটা ধারণা করা যায়।

তিনি বলছিলেন "আমাদের গবেষণায় দেখেছে এসব ক্ষেত্রে প্রাইভেট পার্টি অর্থাৎ কোচিং সেন্টার ইত্যাদি যেমন আছে তেমনি প্রতিষ্ঠানের ভিতরের অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যক্তিদের জড়িত থাকতে দেখা গেছে। এখানে পরিষ্কারভাবে অর্থ বাণিজ্য বা আর্থিক লেনদেন হয়। আর অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মত এখানে রাজনৈতিক লোক ঢোকানোর চেষ্টাও থাকবে"।

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের প্রশাসনিক ভবন

সরকারি ব্যাংক গুলোর পরীক্ষার দায়িত্ব সাধারণত নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানিজ্য অনুষদকে। যে দুটি ব্যাংকের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে তার একটির দায়িত্বে ছিলো ঢাকা এই বিভাগটি ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগ।।

আমি এসেছি ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগে, বিভাগটির চেয়ারম্যান আবু তালেবের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু সামনাসামনি তিনি কথা বলতে চাননি। পরে টেলিফোনে মি.তালেবের সাথে আমার কথা হয়।

আপনাদের এখান থেকে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে-

-হলে কেন্দ্র থেকে হয়েছে

কেন্দ্রে প্রশ্ন যায় কখন?

-পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে।

-কিন্তু প্রায় ৭/৮ ঘণ্টা আগে প্রশ্ন দেখা গেছে ফেসবুকে

-এ ব্যাপারে আমরা জানি না, আমাদের কেও জানায়নি।

আপনাদের কোন সেল আছে বা প্রশ্ন ফাঁস হলে আগাম জানানোর কোন জায়গা?

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানিজ্য অনুষদের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগ

-আছে,আমি আর কথা বলতে চাচ্ছি না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এর পর থেকে কোন ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার দায়িত্ব আমরা নেব না।

খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম -সে অর্থে কার্যকরী কোন সেল নেই অভিযোগ জানানোর।

উপরন্তু চারকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করছেন অভিযোগ জানাতে গেলে তাদের রোল নম্বর চাওয়া হয়।

তাদের কাছে এটা পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়ার সামিল। কিন্তু বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্পর্শকাতর এসব বিষয়গুলোকে কিভাবে সামাল দিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ।?

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশে ব্যাংকের 'ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি' পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে। দরপত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তারা দিয়ে থাকেন পরীক্ষার দায়িত্বটি।

মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যলয়ে 'ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি'র সদস্য-সচিব মোশাররফ হোসেন খানের সাথে আমার কথা হচ্ছিল।

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption 'ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি'র সদস্য-সচিব মোশাররফ হোসেন খান

তিনি বলছিলেন "দেখেন সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার জন্য এই কমিটির সৃষ্টি, সেটাই আমরা করছি"।

প্রশ্ন-প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের পর আপনারা কি কোন তদন্ত করেছেন বা শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন?

উত্তরে তিনি বলছিলেন "আমাদের কাজ সেটা না। সেটা করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।এই পর্যন্ত এমন কোন কিছু করা হয় নি"।

রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকগুলো এখন তাদের শূন্য পদের সংখ্যা এবং চাহিদা জানিয়ে দেয় 'ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি' কাছে।

কমিটি সব কাজ সম্পূর্ণ করে শুধু কর্মী পাঠায় ব্যাংক গুলোর কাছে। এমন একটি ব্যবস্থা যেটা নিয়ে এখন নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে সেটা নিয়ে ব্যাংক গুলো কতটা সন্তুষ্ট?

জানতে চেয়েছিলাম জনতা ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার সাজেদুর রহমানের কাছে।

মি. রহমান বলছিলেন "এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করার বা কোন পদক্ষেপ নেয়ার এখতিয়ার ব্যাংকগুলোর নেই। তারা যেভাবে পরীক্ষা নিয়ে কর্মী পাঠায় আমাদের সেভাবেই নিতে হয়"।

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৫ বলছে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩০ হাজার।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের শতকরা ৪৭ ভাগ স্নাতক পাশ বেকার৷

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে- এখন ব্যাংকের ৫০০টি পদের জন্য অন্তত তিন লাখের মত চাকরি প্রার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। এর পর সেখানে রয়েছে ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধতি। সব মিলিয়ে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সুযোগটাও হয়ে পরছে সংকুচিত।

আব্দুল ওয়াহাব ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন পরীক্ষা দিতে। এখন প্রশ্ন ফাঁসের কথা শুনে তার কণ্ঠে ঝরে পরছে চরম হতাশা।

তিনি বলছিলেন "পুরো পরিবার তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এর আগে পরীক্ষা দিয়েছি সেখানেও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এবারেও হলো। আবার রয়েছে কোটা সিস্টেম। কয়েক বছর ধরে বেকার হয়ে আছি। এত হতাশ লাগে, গ্রামে খালের মধ্যে ২/৩ঘন্টা বসে থাকি"।

ছবির কপিরাইট Farhana Parvin
Image caption ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নের একটা কপি দেখাচ্ছিলেন একজন

একদিকে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ অন্যদিকে এটা রোধে কোন তদন্ত বা শাস্তির ঘটনা এখানো পর্যন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনি। ব্যাংকিং খাতে বা ব্যাংকগুলোর সেবার মানে ওপর এর কি কোন প্রভাব পরতে পারে?

গবেষক ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন এতে করে ব্যাংকিং সেবার মান যে অবনমন হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

তিনি বলছিলেন "এতে করে ঐসব ব্যাংকে মেধাহীন,যোগ্যতা হীন লোক কাজ করার সুযোগ পাবে। ব্যাংকিং খাতকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া ব্যহত হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। এবং যারা জালিয়াতির মাধ্যমে ঢুকবে তারা পুরো পেশা জীবনে এটা করে যাবেন। যদি সেটা ব্যাংকিং খাতে হয় সেটা অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ"।

সরকারি চারটি ব্যাংকে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের উদাহরণও রয়েছে অনেক।

তবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্যই হোক অথবা অবৈধভাবে অর্থ উপাজর্নের জন্যই হোক-যে কারণেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এটা সত্যি। তবে কেন,কিভাবে হচ্ছে সেটার দায়িত্ব যেমন কর্তৃপক্ষের কেও পরিস্কার ভাবে নিচ্ছেন না, আর তাই লক্ষ লক্ষ সাধারণ চাকরী প্রার্থী এখন হতাশার জলে নিমজ্জিত।