ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে দলগুলো এবার ডিজিটাল প্রচারণার দিকে বেশি ঝুঁকেছে

  • ৬ জুন ২০১৭
ফেসবুক নির্বাচনে জনপ্রিয় প্রচারণা প্ল্যাটফর্ম ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ব্রিটেনে ২০১৭র সাধারণ নির্বাচনে প্রচারণার জন্য দলগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে সোশাল মিডিয়ায় ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম

ব্রিটেনে রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে সাধারণ নির্বাচনে তাদের জেতার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার এবার সোশাল মিডিয়া- বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন ব্রিটেনের নির্বাচনী ইতিহাসে ২০১৭-র ভোটে দেখা যাচ্ছে সোশাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রচারণার লড়াই।

২০১৫র সাধারণ নির্বাচনে এবং ২০১৬য় ইইউতে থাকা না থাকার প্রশ্নে গণভোটের সময় বড় রাজনৈতিক দলগুলো লক্ষ লক্ষ পাউন্ড খরচ করেছে ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে তাদের প্রচারবার্তা পৌঁছে দেবার জন্য।

ভোটারদের বয়স, লিঙ্গ, তারা কোন্ এলাকায় থাকেন এবং কী পছন্দ করেন এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাদের কাছে দলের নীতিমালা ও প্রতিশ্রুতি আরও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে ২০১৭র সাধারণ নির্বাচনে এবার বিশেষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সোশাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্ম।

সোশাল মিডিয়ায় এবার তুলনামূলকভাবে বেশি তৎপর লেবার পার্টি।

ছবির কপিরাইট UK Labour Party
Image caption সোশাল মিডিয়ায় এবার তুলনামূলকভাবে বেশি তৎপর লেবার পার্টি।

জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভদের থেকে তারা এখনও পিছিয়ে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দুই দলের মধ্যে যে ব্যবধান উঠে আসছে তা কমাতে বা সোজা কথায় টোরিদের সঙ্গে পাল্লায় জিততে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ২০১৭-র সাধারণ নির্বাচনে প্রচুর অর্থ ঢেলেছে লেবার পার্টি।

লেবার পার্টির একজন মুখপাত্র বলেছেন, "লন্ডনের মেয়র সাদিক খান যখন গত বছর মেয়র নির্বাচনের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, তখন আমরা বেশ কিছু ডিজিটাল পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলাম। আমরা এবারও নির্বাচনী প্রচারণার জন্য সেগুলোই কাজে লাগাচ্ছি এবং খুবই ভাল ফল পাচ্ছি।"

"যেমন আমরা 'প্রোমোট' নামে নতুন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছি। যেটা লেবার ভোটারদের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই প্রোগ্রাম ব্যবহার করে কোন্ ভোটার কী শুনতে চান শুধু সেটাই আমরা তাদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছি । যেমন ধরুন আমরা শিক্ষা খাতে টুইশান ফি বা পড়ার খরচ পুরোপুরি তুলে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এটা তরুণ প্রজন্মের কাছে বড় একটা বিষয়। কাজেই এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমরা সরাসরি তাদেরই জানাচ্ছি," বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন লেবার পার্টির ঐ মুখপাত্র।

লেবার তাদের প্রস্তাবিত নীতিগুলোর ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে ১ হাজারের বেশি প্যাকেজ তৈরি করেছে এবং এই প্রোমোট পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে যার ভোট পেতে যে সংস্করণটি সবচেয়ে ভাল করবে তা ফেসবুকে "সুপার লোকাল" বা একান্ত স্থানীয় বার্তা হিসাবে পৌঁছে দিচ্ছে গ্রাহকদের মেসেজ বোর্ডে।

শুধু তাই নয়, লেবার পার্টি বিনাখরচাতেও প্রচারণা চালাচ্ছে ফেসবুকে। যেমন প্রার্থীদের ফেসবুক পাতার জনপ্রিয় নানা পোস্ট তুলে ধরছে যেগুলো তারা জানে অনেকবার 'শেয়ার' হবে বা অনেক 'লাইক' পাবে- ফলে পৌঁছে যাবে বহু লক্ষ ভোটারের কাছে। কনজারভেটিভরা ২০১৫-য় এই প্রচারণা কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেজা মে ১৫ই মে ২০১৭ একটি টিভি সংবাদ অনুষ্ঠানে তার প্রথম ফেসবুক লাইভে ভোটারদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন

কনজারভেটিভরা ২০১৫য় সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণা পর্বে ভোটারদের কাছে পৌঁছতে সোশাল মিডিয়ায় সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের ব্যাপক ব্যবহার করেছিল। গত বছর ইইউ গণভোটের সময়েও অনলাইনে তারা ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার স্বপক্ষে ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়েছে অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ২০১৫র নির্বাচনী লড়াইয়ে কনজারভেটিভ পার্টি ডিজিটাল প্রচারণায় খরচ করেছিল ১২ লক্ষ পাউন্ড। সে তুলনায় ডিজিটাল প্রচারণায় লেবার পার্টির ব্যয় ছিল এক লক্ষ ৬০ হাজার পাউন্ড আর লিবারেল ডেমোক্রাটের মাত্র ২২ হাজার পাউন্ড। এবার লেবার পার্টি বলছে ডিজিটাল প্রচারণায় তারা ১০লক্ষ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

শুধু কনজারভেটিভ আর তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ লেবারই নয়, প্রধান সবগুলো রাজনৈতিক দলই ভোটের বাজারে প্রচারণার হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। দলগুলোর প্রচারণা ম্যানেজাররা বলছেন তাদের মতে নির্বাচন জেতার জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার এখন ফেসবুক।

"যেসব নির্বাচনী এলাকায় গতবার ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে সামান্য ভোটের ব্যবধানে, সেখানে ২০১৭-র এই নির্বাচনে অনেক ভোটার আছে যারা এখনও নির্দিষ্টভাবে মনস্থির করে নি কোন দলকে ভোট দেবে। এদের লক্ষ্য করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে ফেসবুকে," বলছেন জাইলস্ কেনিংহাম, যিনি একটি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান চালান।

দ্য ফাইনানসিয়াল টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, "ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেজা মে মেয়াদ শেষ হবার তিন বছর আগেই অপ্রত্যাশিতভাবে নির্বাচন ডেকে দেওয়ায় প্রচারণার জন্য সময় পাওয়া যাচ্ছে খুবই কম। তাই ফেসবুক সহ অন্যান্য সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার এই নির্বাচনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।"

ছবির কপিরাইট Liberal Democrat Facebook
Image caption লিবারেল ডেমোক্রাট দলও ফেসবুকে তুলে ধরছে দলের বক্তব্য ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
ছবির কপিরাইট UKIP facebook
Image caption ফেসবুক প্রচারণার দৌড়ে পেছিয়ে নেই ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টিও

তরুণ ভোটাররা যাতে ভোট দেবার জন্য নাম নথিভুক্ত করে তার জন্য লেবার পার্টি ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকে ছেড়েছে বেশ চটকদার ভিডিও। তরুণদের ভোটদানে আগ্রহী করতে দল তাদের বার্তা ছড়ানোয় ব্যবহার করছে বিখ্যাত তারকাদের ।

ভোটার তালিকায় যারা এখনও নাম নথিভুক্ত করে নি তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রথম সারির রাজনীতিকরা ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে জনসংযোগ করছেন। এমনকী প্রধানমন্ত্রী টেরেজা মে-ও ফেসবুক লাইভে ভোটারদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যা সম্প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছিল বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেল।

ফেসবুকের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে এবং সারা বিশ্বে তাদের হিসাবে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা দিনে গড়ে অন্তত ৪০ মিনিট কাটায় ফেসবুকে। সে তুলনায় ব্রিটেনে টুইটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম - প্রতি ৪জনে একজন এবং টুইটারে তারা সময় কাটায় দিনে গড়ে মাত্র এক মিনিট।

ফলে সব দলের প্রার্থীদের জন্যই এখন লক্ষ্য ফেসবুকের বিজ্ঞাপনে এবং স্পনসরড মেসেজের পেছনে অর্থ ঢালা।

ডিজিটাল প্রচারণায় বিশেষজ্ঞরা একটি বিনা খরচার সফটওয়্যার তৈরি করেছেন যার নাম "হু টারগেটস্ মি" অর্থাৎ "আমি কার লক্ষ্যবস্তু"। গুগুল ক্রোম ব্রাউজারে এই সফটওয়্যার যুক্ত করে নিলে ভোটাররা দেখতে পাবেন তাদের পছন্দ অপছন্দ, চাওয়া পাওয়া বা কিসে তারা আগ্রহী এ সংক্রান্ত যেসব ব্যক্তিগত তথ্য তারা ইতোমধ্যেই সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করেছেন, তা ব্যবহার করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে ফেসবুকে তাদের টার্গেট করে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ফেসবুকে ভোটারদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন ব্যবহার পর্যবেক্ষণকারী অ্যাপ 'হু টার্গেটস্ মি'-র সহ উদ্ভাবক লুইস নাইট ওয়েব

এধরনের টার্গেটিং হয়েছে ইইউ গণভোটের সময়। আপনি হয়ত ফেসুবকে কোনো এক পোস্টে বলেছেন সমুদ্রে সার্ফিং আপনার খুব প্রিয়, ঐ ব্যক্তিকে গণভোটের আগে সমুদ্র সৈকতের পরিবেশ দূষণ নিয়ে ইইউ নীতিমালা সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হয়েছে।

ইইউ গণভোটে যারা ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে তাদের প্রচারণা ডিরেক্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রচারণা বাজেটের ৯৮ শতাংশই খরচ করা হয়েছিল ডিজিটাল প্রচারণায়।

তবে অন্য আরও যেসব দল এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে যেমন লিবারেল ডেমোক্রাট, গ্রিন পার্টি বা ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেনডেন্স পার্টি তারা ডিজিটাল প্রচারণায় কীধরনের অর্থব্যয় করছেন সে তথ্য এখনও জানা যায় নি।

ছবির কপিরাইট Green Party Instagram
Image caption তুলনামূলকভাবে ছোট রাজনৈতিক দল গ্রিন পার্টি ফেসবুক ছাড়াও ব্যবহার করছে ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাট

লিবারেল ডেমোক্রাট এবং গ্রিন পার্টির কাছে এই তথ্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে লিব ডেমের কাছ থেকে তাদের ডিজিটাল প্রচারণা বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি।

তবে গ্রিন পার্টির একজন মুখপাত্র মাইক ব্লেকমোর বিবিসি বাংলাকে বলেন তার দল এই খাতে কত খরচ করছে তা এখন জানাতে তারা অপারগ হলেও, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম এবং স্ন্যাপচাটে তারা সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

সম্পর্কিত বিষয়