ভারতে নারীর প্রতি নৃশংসতার পাশে উঠে আসছে মেয়েদের অসম সাহস

মালবী গুপ্ত ছবির কপিরাইট মালবী গুপ্ত

হরিয়ানার সোনেপতে মায়ের সঙ্গে বসে যে তেইশ বছরের তরুণীটি মে'র প্রথম সপ্তাহে টিভিতে ''নির্ভয়া'' হত্যাকাণ্ডে দোষীদের উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাজা শুনতে শুনতে ভাবছিলেন, ''এবার লোকে হয়তো ‍‍এমন অপরাধ করার আগে দু'বার ভাববে'', মাত্র কয়েক দিনের মাথায় সেই তরুণীটি‍ই নির্ভয়ার মতোই ভয়ঙ্কর নৃশংসতার শিকার হলেন।

(সোনেপতের ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।)

বস্তুত সংবাদপত্রে প্রকাশিত গণ ধর্ষণ ও বীভৎস অত্যাচারে ওই মৃতা'র খবরটি পড়া যাচ্ছিল না। এটা ঠিকই যে, যেসব পুরুষ নারীকে চিরকাল জব্দ করতে, অপমান করতে চেয়েছে, তার ওপর প্রতিহিংসা নিতে চেয়েছে, নির্যাতন নিপীড়নের মাধ্যমে তাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে, তারা সেই তাবৎ হিংসা সংঘটনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে বারবার‍ই বেছে নিয়েছে ধর্ষণকে।

আর সব থেকে যা ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে, কখনও ‍একক, কখনও দলগত ভাবে সংঘটিত সেই অপরাধের শিকার হচ্ছে ‍৩/৪ বছরের শিশু কন্যা ‍থেকে ৬৫/৭০ বছরের প্রবীণারাও।

সদ্য ঘটে যাওয়া সোনেপতের ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কয়েক বছর আগে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত মেয়েদের ওপর বর্বরোচিত নিষ্ঠুরতা, বীভৎসতা আমাদের দেশে আজও শুধু ঘটে চলেছে তাই নয়, ‍উত্তরোত্তর তা বেড়ে চলেছে।

আরো পড়ুন: নিজের অজান্তে নিজেই কি গৎবাঁধা ধারণা লালন করছি?

ছবির কপিরাইট Indian Express
Image caption হরিয়ানার রোহটাকে মেয়েটির দেহ যেখানে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেখানে পরিদর্শন করছেন তদন্তকারীরা

দেখে শুনে তো মনে হচ্ছে ‍দেশে এই অপরাধটি যেন কোনও ভাবেই দমনযোগ্য নয়। বিশেষত সমাজের অসংখ্য প্রান্তিক মেয়েদের নিরাপত্তাহীন জীবনে ‍এটাই যেন অনিবার্য।

‍এমন নয় যে ধর্ষণ আগে হত না। কিন্তু ‍এখন মেয়েদের সচেতনতার কারণেই তা বেশি নথিভুক্ত হচ্ছে এবং সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে প্রকাশিত খবরে অনেকের মনে হচ্ছে যেন, এই ঘটনা বেড়েছে।

এই যুক্তিকে কিছুটা মান্যতা দিলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, যে আগে কি ধর্ষিতাদের ‍‍এমন নৃশংস ভাবে মেরে ফেলা হত? ‍আগে কি ধর্ষিতার ওপর ‍এমন অকথ্য অত্যাচার চালানো হত?

হরিয়ানা, ‍উত্তর প্রদেশ হোক কিম্বা দিল্লি, বিহার, পশ্চিমবঙ্গই হোক, নানান জায়গা থেকে ‍উদ্ধার হওয়া ছ্ন্নি বিচ্ছিন্ন, থেঁতলানো ধর্ষিতাদের দেহে নিষ্ঠুরতার যে চিহ্ন অপরাধীরা নিয়ত দেগে দিয়ে যাচ্ছে, তাকে কি শুধুই ''এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা'' বা ''বিচ্ছিন্ন ঘটনা'' বলেই দায় সারা যায়?

প্রশাসনিক তরফে, ''দোষীরা সাজা পাবেই'', ‍এই কথায় তেমন আশ্বাস বা ভরসা কোনটাই কি খুব জোরালো শোনায়?

কারণ এই ব্যাপারে আমাদের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা যে অন্য কথা বলছে। প্রায় প্রত্যহ ঘরে বাইরে অফিসে মাঠে ঘাটে এমনকি মন্দিরেও শিশু কন্যা থেকে বৃদ্ধা, তথাকথিত ওই ''বিকৃত মানসিকতার'' শিকার হচ্ছে। এবং হাসপাতালের রোগিণী, অন্তঃসত্ত্বা বা সদ্য সন্তান প্রসবোত্তর জননীর ওপরও যেভাবে অত্যাচার ঘটেই চলেছে, তাতে তো আমার মনে হচ্ছে মেয়েরা ‍এই সমাজে সম্পূর্ণ অরক্ষিত।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

আমরা জানি নারীর অধিকার রক্ষায় ভারতীয় সংবিধানে অনেক রক্ষাকবচ আছে। আমরা এও জানি নারীর সুরক্ষায় ভারতে আইনের কোনও অভাব নেই। তবু কেন প্রাত্যহিক জীবনে সেই সব রক্ষাকবচ মেয়েদের ধরা ছোঁয়ার বা‍ইরেই থেকে যাচ্ছে?

নানাবিধ কার্য কারণে এই সব অপরাধ তদন্তে দেরি হয় জানি। কখনও নানান চাপ বা হুমকিতে মাঝ পথে তা বন্ধও হয়ে যায়। আর অপরাধ প্রমাণিত হলেও যেখানে সাজা পেতেই কেটে যায় যুগের পর যুগ, সেখানে 'মেয়েদের সুরক্ষা' শব্দটি কেন জানি না আমার কাছে কেবলই প্রহসন ঠেকে।

কিন্তু ‍আবার এও মনে হয়, তাহলে কি মেয়েরা নিরাপত্তার জন্য অনন্তকাল ধরে কেবল অন্যের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকবে? নাকি আত্মরক্ষায় শারীরিক ও মানসিক ভাবে সে শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করবে নিজেকে? যাতে জীবনের মৌলিক অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়ার জন্য ‍উদ্যত হাতগুলিকে সে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে?

‍কারণ সংবাদ মাধ্যমে ওই ভয়ঙ্কর হিংসার পাশাপাশি সেই হিংসা প্রতিরোধে ব্যতিক্রমী মেয়েদের অসম সাহসিক কিছু ঘটনার কথাও যে ‍ইতস্তত উঠে আসছে।

তাই মনে হচ্ছে, আপন ভাগ্য জয় করবার অধিকার যে আর কেউ ‍এসে তাকে হাতে তুলে দেবে না, নিজেকেই তা অর্জন করতে হবে, কোথাও তা নিতে হবে ছিনিয়ে, কারও কারও সেই প্রত্যয় বুঝি এতদিনে কিছুটা জন্মেছে।

ছবির কপিরাইট RAVEENDRAN/AFP
Image caption দিল্লিতে 'নির্ভয়া' হত্যাকাণ্ডের পর দোষীদের ফাঁসীর দাবীতে আন্দোলন।

আর কি আশ্চর্য, ‍একেবারে প্রান্তিক সমাজের মেয়েরাই সেখানে দেখছি অগ্রণী ভূমিকায়।

মনে পড়ছে সেই অনাম্নী সদ্য তরুণীটির কথা (সংবাদপত্রে যার নাম প্রকাশিত হয়নি)। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মাত্র বারো বছর বয়সে যিনি কাজের সন্ধানে দিল্লি পাড়ি দিয়েছিলেন।

বিনা পারিশ্রমিকে সাত বছর ধরে পরিচারিকার কাজ করতে করতে যেদিন তিনি তার দাবি করে বসেন, সেই দিন থেকেই তিনি ঘর বন্দি। সেইদিন থেকেই তিনি নানান অত্যাচার আর ধর্ষণের শিকার।

কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা সেই তরুণী ধর্ষণকারীর গর্ভপাতের দাবিকে অগ্রাহ্য করে তার কবল থেকে কীভাবে জানি পালিয়ে গিয়েছিলেন।‍ এবং শেষ পর্যন্ত ‍কলঙ্কের ভয়কে তুড়ি মেরে সমাজের রক্তচক্ষুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তিনি সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন।

তাঁর সদ্যজাত কন্যার জন্মদাতা যে একজন ধর্ষণকারী, তা গোপন করেননি। ‍অপরাধীর শাস্তি চেয়ে দ্বিধা করেননি কন্যার পিতৃ পরিচয়ের জায়গায় সেই ধর্ষকের নামটি লিখে দিতে। এবং শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া হত দরিদ্র নিরক্ষর সেই অনূঢ়া হাসপাতালেই সদ্যজাত কন্যাকে লেখাপড়া শেখানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।

ওই অসম সাহসী অনাম্নী কন্যাটি জানেনই না যে, অসহায় অরক্ষিত বিপুল সংখ্যক নারীর চোখে তিনি কী বিপ্লবটাই না ঘটিয়ে ফেলেছেন।

মনে হচ্ছে তো ক্রমাগত অত্যাচারের কাছে মাথা না নুইয়ে ''অবৈধ'' সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার ‍এমন মানসিক জোর তিনি কোথায় পেলেন? কীভাবে এত প্রবল আত্মবিশ্বাসের অধিকারী হলেন তিনি?

মনে হচ্ছে তো আত্মশক্তিতে তাঁর ‍এত গভীর আস্থা জন্মাল কীভাবে? আমাদের শিক্ষিত নগর জীবনের পারিপার্শ্বিকে এটা কি খুব চেনা ঘটনা? আমার তেমনটা মনে হয় না।

তথাকথিত সভ্যসমাজের প্রতি ‍এমন বলিষ্ঠ নিরুচ্চার প্রতিবাদ তিনি ছুঁড়ে দিতে পেরেছেন বলে তাঁকে যে কুর্ণিশ জানাতে‍ই হয়।

সম্পর্কিত বিষয়