মেয়েদের স্বঘোষিত অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করা কি সোজা কথা!

দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী ছবির কপিরাইট দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী

বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বার্লিন-এ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন 'ছোট' পোশাক পরে। এই নিয়ে ভারত জুড়ে হৈচৈ।

প্রধানমন্ত্রীর সামনে এই 'নির্লজ্জ বেহায়াপনা' না দেখালেই কি চলছিল না? এতে প্রধানমন্ত্রীর মাপের একজনকে কতটা অসম্মান করা হয় সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি কি প্রিয়াঙ্কার নেই? ইত্যাদি প্রশ্নে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল।

সমালোচনার এই ঝড়ের উত্তর প্রিয়াঙ্কা দিয়েছেন তাঁর মতো করে। ইনস্টাগ্রামে তাঁর এবং তাঁর মায়ের 'ছোট' পোশাকের একটি ছবি পোস্ট করে। আর যায় কোথায়! সোশ্যাল মিডিয়া কদর্য থেকে কদর্যতর হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এই সব পড়তে পড়তে একটা বেমক্কা প্রশ্ন মনে জাগল যেটা আদৌ প্রিয়াঙ্কার পোশাক বাছাইয়ের ঠিক-ভুল সংক্রান্ত নয়।

মহিলাদের সাজপোশাক, আচার আচরণ নিয়ে মন্তব্য করা, সমালোচনার তির ছোঁড়া যারা তাঁদের জন্মগত অধিকার বলে মনে করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা দিয়ে মহিলাদের চরিত্র মাপেন যারা, তাঁদের মুখ অন্য কোনও পোশাক পরে আদৌ কি বন্ধ রাখতে পারতেন প্রিয়াঙ্কা?

আমার তো মনে হয় নরেন্দ্র মোদীর সামনে তিনি শাড়ি পরে গেলেও এই তেনারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতেন, ঢং দেখে বাঁচি না, পর্দায় বিকিনির ঘনঘটা আর প্রধানমন্ত্রীর সামনে সনাতন ভারতীয় নারীর সাজে ধ্যাষ্টামো!

ছবির কপিরাইট .
Image caption সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়া পাল্টা জবাব দেয়ার পর তার সমর্থনেও অনেক টুইট হয়।

এই প্রসঙ্গে কলেজ জীবনের এক বান্ধবীর অভিজ্ঞতা মনে পড়ে গেল।

প্রেসিডেন্সির ক্যান্টিন-এ ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিযোগিতায় সে ছিল সামনের সারিতে। দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত পরিবারের মেয়েটির জীবন যাপন ও আচরণে দ্বিধা বা দ্বিচারিতার লেশ মাত্র ছিল না।

ও যা বলত সেটা করে দেখাবার সাহস রাখত, যুক্তি দিয়ে সেটা ব্যাখ্যা করতে পারার মতো মননও সে মেয়ের। আমরা বলাবলি করতাম ওর বাড়ির মুক্ত পরিবেশ, উচ্চশিক্ষার বাতাবরণই ওকে এতটা স্বচ্ছ করেছে।

তা সেই মেয়ে একদিন তার বাড়ির এক অনুষ্ঠানে বড়দের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারতে মারতে ধোঁয়ার টান অনুভব করায় পাশের ঘরে গিয়ে নিজের ব্যাগ হাতড়াচ্ছিল। আড্ডাস্থল থেকে ওর এক মামা হাঁক পাড়েন, "কী রে মিঠু, কোথায় গেলি?" ও উত্তর দিয়েছিল, "চট করে দু'টো টান দিয়ে আসছি ছোট মামু।"

আর এই একটা বাক্যেই না কি ওদের তথাকথিত মুক্তমনা পরিবারে ঝড় বয়ে গিয়েছিল।

মিঠুর বাবা-মাকে এর পরে দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ে নানা কথা শুনতে হয়েছিল -"কী দরকার ছিল ও ভাবে বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়ার কথা প্রচার করার? যতই আধুনিক হোক, এইটুকু রাখঢাক বজায় রাখার শিক্ষাটুকু তো থাকবে" ইত্যাদি ইত্যাদি।

আরো পড়ুন:

নৃশংসতার বিরুদ্ধে মেয়েদের অসম সাহস

একের পর এক ধর্ষণ, কিন্তু বিচারের নাম-গন্ধ নেই

ছবির কপিরাইট GABRIEL BOUYS/AFP/Getty Images
Image caption ধূমপানরত নারী: বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া নারীর শোভা পায় না?

প্রমোদদার ক্যান্টিন-এ ধোঁয়ার রিং ছাড়তে ছাড়তে মিঠু পরে আমাদের বলেছিল, "আমার ধারণা, আমি সে দিন ঢং করে অন্য কোনও বাহানা করলেও এদের মুখ বন্ধ করা যেত না। তখন দেখতি এরাই বলত, বড়দের সামনে ভাল সেজে বাইরে গিয়ে বিড়ি ফুঁকতে লজ্জাও করে না! আর যারা তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত তারা হয়তো বলত, এই দ্বিচারিতার মানে কী! মিঠু যে জীবনটা যাপন করে সেটা সবার সামনে স্বীকার করতে নিজেই লজ্জা পায় তার মানে!"

ফিচেল হেসে মিঠু বলেছিল, "হুঁ হুঁ বাবা, মেয়েদের এই সব স্বঘোষিত অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করতে পারা কী চাট্টিখানি কথা!"

আর একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে শেষ করি।

লেখাপড়ার সূত্রে তখন মিশিগানের বাসিন্দা। মাইনাস ২৫/২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় লম্বা চুলের ঝক্কি আর সহ্য হচ্ছিল না, নিজের এক চেহারা দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে যাওয়াও একটা কারণ ছিল বটে, আর তাই প্রায় মাথা মুড়িয়ে চুল ছেঁটে বাইরের আমি-কে পাল্টে ফেললাম।

নিজের নতুন চেহারায় মজা পাচ্ছিলাম বেশ। কিন্তু উইকএন্ড-এ ডেট্রয়েট-এ ভারতীয় এক বন্ধুর আত্মীয়ের বাড়িতে খেতে গিয়ে সে মজা মাথায় উঠল।

ভারতীয় মেয়ে হয়ে কী করে এত ছোট করে চুল কাটি, মেয়েদের মাথায় লম্বা চুল না হলে তাদের মেয়ে বলে মনেই হয় না ইত্যাদি মন্তব্যে তখন কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়।

কথা ঘোরানোর জন্য বন্ধুর টিনএজার খুড়তুতো ভাইটিকে দেখিয়ে বলেছিলাম, "সানির লম্বা চুল আমার প্রায় ন্যাড়া হয়ে যাওয়া মাথাকে কমপেনসেট করে দেবে তো!"

কমিউনিটি কলেজ-এর সেই ছাত্রের কাঁধ অবধি লম্বা চুলে তখন শোভা পাচ্ছে মিষ্টি হেয়ারব্যান্ড। আমার মন্তব্য শোনা মাত্র বাড়িশুদ্ধু লোকের মুখ ভার। সে রাতের ডিনারটাও কেমন বিস্বাদ ঠেকেছিল যেন! আমার বন্ধুটিও আমার ওপর কম ক্ষুণ্ণ হয়নি!

আর তখনই মিঠুর কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিল, "হুঁ হুঁ বাবা, মেয়েদের এই সব স্বঘোষিত অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করতে পারা কী চাট্টিখানি কথা!"

সম্পর্কিত বিষয়