'সাংবাদিকতার আকর্ষণ থেকে আমি কখনই বের হতে পারি নাই

বাংলাদেশে ২০১০ সালে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেবার তিন বছরের মাথায় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের সম্পাদক হন এম শামসুর রহমান। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন সাংবাদিকতা কীভাবে তার জীবনে পেশা ছাড়িয়ে নেশায় পরিণত হল।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
এম শামসুর রহমান : সাংবাদিকতার আকর্ষণ থেকে আমি কখনই বের হতে পারি নাই।

১৯৯৫ সালে দ্য ডেইলি স্টারে সাংবাদিক জীবন শুরু করে পরবর্তীকালে সেখানে তিনি বিজনেজ এডিটর হয়েছিলেন।

তবে সংবাদপত্রে কাজ করবেন বা সাংবাদিক হবেন এমন কোনো চিন্তাভাবনা কোনোদিনই ছিল না। বড়ভাই একসময় কাজ করতেন ডেইলি স্টারে, পরে গাল্ফ নিউজে কাজ নিয়ে চলে যান দুবাই। তিনিই একবার ছুটির বন্ধে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি চাকরি করতে আগ্রহী কীনা।

"ডেফিনিটলি," বলেছিলেন শামসুর রহমান। এরপর ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনমের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ছোট ভাইকে নিয়ে যান পত্রিকা অফিসে। "আর একধরনের ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ দিয়ে আমার চাকরি হয়ে যায়।"

"কয়েক মাস কাজ করার পর আমি এত বেশি কাজটা এনজয় করি যে সাংবাদিকতা আমার পেশা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে নেশা।"

ডেইলি স্টারে প্রায় নয়-দশ বছর কাজ করার পর মিঃ রহমান চলে যান দুবাইয়ে এবং সেখানে একটি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর কাজ করেন। বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি ২০০৫ সালে শুরু করেন ইমপ্যাক্ট পিআর নামে একটি জনসংযোগ সংস্থা। বাংলাদেশে তখন জনসংযোগ সংস্থার ধ্যানধারনাটা ছিল খুবই নতুন।

"ডেইলি স্টারে বিজনেস এডিটার হিসাবে কাজ করা অবস্থায় দেখতাম প্রচুর কোম্পানি থেকে আমাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ইনভিটেশন বা প্রেস রিলিজ আসত। তারা মূলত তাদের নিউজগুলো আমাদের পত্রিকার মাধ্যমে পাঠককে জানাতে চাইত। তখন দেখতাম ঐ প্রেস বিজ্ঞপ্তিগুলো পেশাদারভাবে লেখা থাকত না বা তারা কী বলতে চাইছে তা ঠিকমত লেখা থাকত না।"

তিনি বলছেন ডেইলি স্টারে তারা ছিলেন ৫-৭জনের একটা টিম। দুটো পত্রিকা স্থানীয় খবর দিয়ে ভরাতে তারা হিমশিম খেতেন। "কিন্তু দুবাইয়ে দেখলাম একই লোকোবল দিয়ে প্রায় ১০-১২ পৃষ্ঠার এক একটা সাপ্লিমেন্ট ওরা বের করছে।"

তখন থেকেই তার মনে হয়েছিল বাংলাদেশে এধরনের এজেন্সির একটা বাজার রয়েছে। "এজেন্সিতে যারা কাজ করত তারা সবাই সাংবাদিকতা ব্যাকগ্রাউন্ডের। তারাই প্রত্যেকটা নিউজ লিখে দেত। সেই নিউজটা যখন একজন রিপোর্টার বা সাব-এডিটারের ডেস্কে আসত, তখন তারা একটা তৈরি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেয়ে যেতেন। তারা শুধু তাদের মত করে হেডলাইন করে, হয়ত বা কিছু চেঞ্জ করে সেগুলো ছাপতেন। এতে করে লোকাল নিউজের ফ্লো-টা অনেক বেশি থাকত। "

তিনি বলছেন এসব খবর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোই দিত জনসংযোগ সংস্থার মাধ্যমে। এই মডেলটা ব্যবহার করেই তিনি বাংলাদেশে ইমপ্যাক্ট পিআর এজেন্সি শুরু করেন, যেটি ছিল বাংলাদেশে প্রথম জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান।

শামসুর রহমান বলছেন শুরুটা ছিল খুবই কঠিন। কেউ প্রথমে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসেনি।

"পরে আমাদের একজন পরিচিত ব্যবসায়ী, এখন আমার বিজনেস পার্টনার, উনি তখন এসে বললেন, আমি আপনার এই কনসেপ্টটা বুঝি এবং আমি অর্থ দেব।"

খুব অল্প টাকা দিয়ে শুরু করার পর বাংলাদেশের বেক্সিমকো গ্রুপ প্রথম তাদের সংস্থাকে কাজ দেয়। "বেক্সিমকো তাদের পঁচিশটা কোম্পানির সবরকম জনসংযোগের কাজ, গণমাধ্যমের সঙ্গে সবরকম যোগাযোগের কাজ তারা ইমপ্যাক্ট পিআরকে দিয়ে পত্রিকা বা পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিত।"

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption বাংলাদেশে এখন গণমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটায় সাংবাদিকতাও অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে : এম শামসুর রহমান

নিজের হাতে গড়ে তোলা এই জনসংযোগ সংস্থা ৫বছর পর ছেড়ে দেন মিঃ রহমান- আবার ফিরে যান সাংবাদিকতায়।

বলছিলেন জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা শুরু করার পর "সাংবাদিকতাটা প্রচণ্ডভাবে মিস্" করতেন।

"সেই নিউজরুম পরিবেশ, কাজ করার পর পরদিন পত্রিকায় নিজের রিপোর্ট দেখা এই জিনিসটার আকর্ষণ থেকে আমি কখনই বের হতে পারি নাই।"

এ কারণে ২০১০ সালে ইমপ্যাক্ট পিআর থেকে বের হয়ে এসে তিনি একটি নতুন পত্রিকা বের করার ভাবনা নিয়ে এগুচ্ছিলেন।

"বেক্সিমকোর সাথে যেহেতু আমি দীর্ঘদিন কাজ করছিলাম, ওনারা যখন আমার আইডিয়াটা জানতে পারলেন, তখন ওনারা আমাকে ওনাদের টেলিভিশন চ্যানেলের দায়িত্ব নেবার একটা প্রস্তাব দেন।"

ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি চ্যানেলের দায়িত্ব নেবার প্রায় তিনবছর পর ২০১৩ সালে মিঃ রহমান ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনপেন্ট পত্রিকায় সম্পাদকের দায়িত্ব নেন।

তিনি যখন পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়িত্ব নেন, তখন 'দ্য ইনডিপেনডেন্ট' পত্রিকাটি তেমন ভালো করছিল না।

সেসময় কয়েক মাস ধরে পত্রিকাটি থেকে সাংবাদিক ছাঁটাই চলছিল। কয়েকমাস ধরে তাদের বেতন বকেয়া পড়ছিল যার ফলে সাংবাদিক-কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে খবর ছিল ।

এরকম একটা সময় দায়িত্ব নেওয়াটা বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল বলে মনে করেন মিঃ রহমান। তিনি বলেন পত্রিকাতে অনেক কর্মী ছিলেন খুবই দক্ষ, তিনি শুধু নিশ্চিত করেছিলেন যে যে কাজটা সবচেয়ে ভাল করেন তাকে যাতে সেই কাজটা করতে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন মালিক যারা বিনিয়োগ করছেন তাদের কাছ থেকে তিনি "সম্পাদকীয় স্বাধীনতার আশ্বাস" জোগাড় করতে পেরেছিলেন, যেটা তার বিশ্বাস এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়তা করেছে।

গত কয়েকবছরে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জগতে অনেক পরিবর্তন দেখেছেন মিঃ রহমান। যখন শুরু করেছিলেন তখন শুধু ছিল তার প্রিন্ট মিডিয়াতে কাজের অভিজ্ঞতা। এখন বাংলাদেশে গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। তার মতে সংবাদমাধ্যমে কাজ করা খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা পেশা।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption গুলশানে হোলি আর্টিজানে রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের মত অনেক বড় বড় ঘটনা সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ : এম শামসুর রহমান

"এখন বাংলাদেশে প্রচুর ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টিভি চ্যানেল, অনলাইন মাধ্যম- পরিবর্তনটা অনেক ব্যাপক। যদিও টেলিভিশনের অগ্রযাত্রা বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল অনেক আগে, কিন্তু এখন দেখা যায় চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি।"

"আমার মনে হয় না আর কোনো প্রফেশন আছে যেখানে প্রতিদিন আপনাকে জবাবদিহিতার জায়গায় দাঁড়াতে হয় আপনার কাজের জন্য।"

"যদি আমি পত্রিকার ক্ষেত্রে বলি আমাকে সবসময় কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, জনগণ আমাকে বিচার করেন, যে নিউজটা আমি ডেলিভার করলাম, সেটা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে কীনা।"

বাংলাদেশে এখন অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটছে, অর্থনীতি বড় হয়েছে, তিনি বলছিলেন, "আমরা রানা প্লাজার মত ঘটনা দেখেছি, আমরা বিডিআর-এর মত ঘটনা দেখেছি, হোলি আর্টিজান দেখেছি- কাজেই কীভাবে এসব খবর কীভাবে সংগ্রহ করব এবং পাঠকদের সামনে তুলে ধরব, সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এবং আমাদের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি প্রতিদিন এখান থেকে শিখছে।"

তিনি বলেন বাংলাদেশে সংবাদপত্রের সংখ্যা কম নয়। "সঠিক সংবাদ আমরা জনসমক্ষে যদি তুলে ধরতে পারি জনসাধারণই আমাদের বিচার করবে।"

তাই সাংবাদিকতার পেশাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

যে পত্রিকা ও টিভিতে তিনি কাজ করেন তার মালিক একজন ব্যবসায়ী। সেখানে কতখানি স্বাধীনভাবে তিনি কাজ করতে পারেন? এ প্রশ্নে মিঃ রহমান বলেন তিনি মনে করেন সম্পাদকীয় নীতিমালা মেনে তিনি পুরোপুরি স্বাধীনভাবেই কাজ করছেন।

"তবে মালিকদের একটা প্রত্যাশা থাকবেই। তারা কয়েক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। তারা অবশ্যই চাইবেন সেই বিনিয়োগের রিটার্ন তারা কতটুকু পাচ্ছেন। তাই আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্যটা আমাকে দেখতেই হয়। সেখানে একটা চাপ বলতে পারেন আছে ।"

"তবে যেহেতু আমি তাদের কাছে কোনো সাবসিডি নিচ্ছি না, ওনাদের থেকে কোনো অনুদান নিচ্ছি না, সেই কারণে আমার সম্পাদকীয় স্বাধীনতা পুরোটাই আছে এবং কোনো চাপ আমি সেভাবে ফিল করি না।"

সম্পর্কিত বিষয়