ভারতে ইন্দিরা-সঞ্জয় গান্ধীকে নিয়ে যে চলচ্চিত্র ঘিরে বিতর্ক

ছবির কপিরাইট INDUSARKARMOVIE
Image caption 'ইন্দু সরকার' ছবির পোস্টার

সত্তরের দশকে ভারতে ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা জারি করে সরকার যে সব নির্যাতন চালিয়েছিল বলে অভিযোগ, তার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি বলিউড সিনেমা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বাঁধছে।

'ইন্দু সরকার' নামে এই ছবিটি-র ট্রেলার মুক্তি পাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে ছবির দুই প্রধান চরিত্রকে অবিকল ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর মতো দেখতে - এবং ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে সিনেমাতে ইন্দিরার চরিত্রকে ভুল ভাবে তুলে ধরাটা তারা কিছুতেই মেনে নেবে না।

ছবির পরিচালক অবশ্য দাবি করেছেন, তার সিনেমা সত্যি ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও কারও বায়োপিক নয় - আর এখানে কোনও দল বা পরিবারের অনুমতি নেওয়ারও প্রশ্ন নেই।

জাতীয় পুরস্কারজয়ী চিত্রনির্মাতা মধুর ভান্ডারকরের এই নতুন ছবি ইন্দু সরকারের ট্রেলার মুক্তি পেয়েছে মাত্র দু-তিনদিন আগে। ছবির থিম ভারতের জরুরি অবস্থা, আর চরিত্রগুলো কাদের আদলে তা চিনতেও কোনও অসুবিধা হয় না।

সমকালীন ইতিহাসবিদরা বলেন, তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলে সঞ্জয়ই ছিলেন যাবতীয় সংবিধান-বহির্ভূত ক্ষমতার উৎস। সিনেমাতে সেই ঘটনারও ছায়া পড়েছে অতি স্পষ্টভাবে।

এই ছবি যথারীতি অস্বস্তিতে ফেলেছে কংগ্রেসকে - আর তারা এখন অভিযোগ করছেন ইন্দিরা গান্ধীর মতো জাতীয় নায়ককে হেয় করতেই একটি স্বার্থাণ্বেষী মহল পয়সা দিয়ে এই ছবি বানিয়েছে।

শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বলছেন, "এটা হল পুরোপুরি একটা স্পনসর্ড ফিল্ম। কী উদ্দেশ্য নিয়ে, কোন কোন সংগঠন এই ছবিতে পয়সা ঢেলেছে তা আমরা সবাই জানি। কারও চরিত্রকে ভুলভাবে তুলে ধরার চেষ্টার আমরা কড়া নিন্দা করছি - আমরা সর্বশক্তি দিয়ে এই ছবির বিরোধিতা করব।"

ছবির কপিরাইট Keystone
Image caption ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী।

ইমার্জেন্সির সময় সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল যে 'মেইনস্ট্রিম' পত্রিকা, তার বর্তমান সম্পাদক সুমিত চক্রবর্তী অবশ্য বলছেন সে সময়কার অবস্থা নিয়ে কোনও ছবি তৈরি হলে তাতে বাধা দেওয়ার কোনও নৈতিক অধিকার কংগ্রেসের নেই।

"দেখুন কেউই তো হোলি কাউ নয়। এমন কী ন্যাশনাল আইকন যারা, তাদেরকে নিয়েও কাটাছেঁড়া চলতে পারে - তাদেরকেও সব সময় স্ক্রুটিনির মধ্যে রাখা উচিত।"

"বিশেষ করে ইমার্জেন্সির সময় ভারতে যা হয়েছে তা তো অবশ্যই সমালোচনার দাবি রাখে। সে সময়ের ঘটনার দিকে পেছন ফিরে তাকানো যেতেই পারে - আর আমি মনে করি এই বিতর্কের পটভূমিতে সেটা প্রযোজ্যও বটে!", বলছিলেন মি চক্রবর্তী।

ইন্দু সরকার ছবিতে এমন একটি সংলাপ আছে, যেখানে ছবির প্রোটাগোনিস্ট একজন পুলিশ অফিসারকে বলছেন - "আজীবন তোমরা মা-ব্যাটার গোলামি করে যাও!"

এই 'মা-ব্যাটা' কারা, সাংবাদিক সম্মেলনে সরাসরি সে প্রশ্ন করা হলে ছবির নির্মাতারা অবশ্য তা হেসেই উড়িয়ে দেন।

পরিচালক মধুর ভান্ডারকর প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে গেলেও ছবির অন্যতম প্রধান অভিনেতা অনুপম খের বলেন, "সবাই এখানে যা ভাবছে উত্তরটাও আসলে তাই। কিছু জবাব দিতে হয় না, প্রশ্নের মধ্যেই তার উত্তর থাকে।"

আইন বাঁচানোর জন্যই যে ছবিতে ইন্দিরা গান্ধীর নাম করা হয়নি, সেটা স্পষ্ট - এবং সেন্সর বোর্ডের প্রধান পহেলাজ নিহালনিও আগাম জানিয়ে রেখেছেন এ ছবির সেন্সর সার্টিফিকেট পেতেও কোনও অসুবিধা হবে না।

ফলে কংগ্রেস ইন্দু সরকারের মুক্তি আটকাতে পারবে সেই সম্ভাবনা কম - তবে সুমিত চক্রবর্তী বলছিলেন এক্ষেত্রে তাদের অবস্থান খুবই হতাশাজনক।

"জহরলাল নেহরু যখন কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট, তখন তিনি রাষ্ট্রপতি নামে একটি লেখায় নিজেই লিখেছেন প্রত্যেকেরই একটা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাওয়া উচিত। নিজের সম্পর্কেই বলেছেন জহরলাল যখন এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তার মানে এই নয় যে সে সব কিছুর ঊর্ধ্বে। নিজের দম্ভ আকাশছোঁয়া হয়ে উঠছে বলে নিজেই স্বীকার করছেন।"

"নেহরু একজন গণতন্ত্রী হিসেবে নিজে এ কথা বলতে পারছেন, অথচ তার সংগঠন যখন আজ এই জিনিস করে - আমি হতাশ না-হয়ে পারি না। এই আত্মসমালোচনার দৃষ্টান্ত তো গান্ধী-নেহরুরা নিজেরাই দেখিয়েছেন, সেটা কী করে আপনি উপেক্ষা করবেন?", বলছিলেন সুমিত চক্রবর্তী।

এর আগে ইন্দিরা ও তার স্বামী ফিরোজ গান্ধীর মধ্যে সম্পর্কের আভাস নিয়ে বলিউডে আঁধি নামে বিখ্যাত এক ছবি বানিয়েছিলেন গুলজার। সুচিত্রা সেন অভিনীত সেই ছবিটিও ইমার্জেন্সির সময় সব সিনেমা হল থেকে তুলে দেয় সরকার।

সেই ঘটনার চার দশক বাদে ইন্দিরা ও তার ছোট ছেলের মধ্যেকার জটিল সম্পর্কও সেলুলয়েডে আসতে চলেছে - কিন্তু এখন দুর্বল বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেস তেমন প্রতিরোধ করার জায়গাতেই নেই!

সম্পর্কিত বিষয়