গুলশান হামলার এক বছর: যেভাবে কেটেছিল ভয়াল সেই রাত

হোলি আর্টিজান ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই রাতে হোলি আর্টিজান রেস্তোরার কাছে পুলিশের প্রহরা। (ফাইল ছবি)

"পরিবেশ স্বাভাবিক, একটু ব্যস্ততা ছিল। কুকিং করতেছিলাম, গেস্টরা খাওয়া-দাওয়া করতেছিল- তখনই ঘটনার সূত্রপাত"

ঘটনাস্থল ঢাকার গুলশান-২ এলাকার ৭৯ নম্বর রোড। রমজান মাস প্রায় শেষের দিকে। সন্ধ্যার পর অভিজাত একটি বেকারি হোলি আর্টিজান এবং রেস্টুরেন্টে যে কয়কজন ক্রেতা তখন বসে ছিলেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই বিদেশী।

কথা বলছিলাম হোলি আর্টিজানের স্টাফ মোহাম্মদ আকাশের সাথে। তিনি বর্ণনা করছিলেন রাত পৌনে ন'টার দিকে সেখানকার পরিস্থিতি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্ত রেস্টুরেন্টের পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেল। গোলাগুলি হুড়োহুড়ি, মানুষের চিৎকার, পালানোর চেষ্টা। আকাশের মত ঘটনার শুরুতেই পালানোর চেষ্টা করলেন কিছু অতিথি এবং রেস্টুরেন্টের কর্মী।। তবে অনেকেই সফল হলেন না, আটকে পড়লেন ভেতরে।

আরো পড়ুন: ২৫ বছরের প্রেমের পর মেসির বিয়ে: 'শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিয়ে'

"ফার্স্টে আমি হলরুম দিয়ে দৌড়ায়ে পালাইতে চেষ্টা করি, কিন্তু যখন দেখি যে সন্ত্রাসীরা কাছাকাছি চলে আসছে তখন আমি দৌড়ায়ে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যাই। তারপর যখন দেখি আমাদের কিছু স্টাফ টয়লেটে আশ্রয় নিছে, তখন আমিও তাদের সাথে সেখানেই আশ্রয় নিই"।

এদিকে কূটনৈতিক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে হামলার এই ঘটনা খুব দ্রুতই পৌঁছে যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। সোয়া ন'টার মধ্যেই পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি। তবে শুরুতে ঘটনা কতটা গুরুতর সেটি হয়তো বোঝা যাচ্ছিল না।

সেসময় ঐ এলাকায় বিশেষ বাহিনী র‍্যাব ১-এর অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা ল্যা. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ তখন তারাবির নামাজ পড়ছিলেন। "আট রাকাতের সালাম ফেরানোর পরপরই আমি ডিজির কাছ থেকে একটা কল রিসিভ করি। তিনি জানতে চাইলেন যে কোন রেস্টুরেন্ট বা হোটেলে বিদেশীদের কেউ জিম্মি করছে এমনটা আমি জানি কিনা। আমি তখনি চেক করলাম এবং অন্যান্য সোর্স থেকেও খবর আসতে শুরু করলো"

মি. মাসুদ বর্তমানে ঢাকাতেই র‍্যাব ৩-এর প্রধান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলছিলেন, সেখানে পৌছানোর পর তিনি দেখলেন আশেপাশে পুলিশ অবস্থান নিয়েছে। তিনিও পাশে ভবনের ওপর থেকে দেখার চেষ্টা করলেন ভেতরে কী হচ্ছে। র‍্যাব সদস্যদেরও ভবনটি ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দিলেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption হামলার কয়েক মাস পর গুলশানে হোলি আর্টিজান ক্যাফের ভবনের সংস্কারকাজ। (ফাইল ছবি)

এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে।

"অ্যারাউন্ড টেন থার্টি ডিএমপির একটি টিম একটু ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং দেখার চেষ্টা করছিল যে তাদের সাথে কোনভাবে যোগাযোগ করা যায় কিনা। তখনি তারা (সন্ত্রাসীরা) একটি আইইডি দিয়ে হামলা করে। বিস্ফোরণের পরপরই আমি দেখলাম আমার দুই পাশে দুইজন পড়ে গেলেন। একজন এসি রবিউল এবং অপরজন ওসি সালাহউদ্দিন"।

মি. মাসুদ বলেন, বিস্ফোরণের পরপরই সবাই পেছনদিকে সরে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আহত হয়ে পড়ে থাকা দুজনকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।

সেই বিস্ফোরণে আহত হয়ে পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম এবং গুলশান থানার ওসি সালাউদ্দিন দুজনেই মারা যান। ঐ বিস্ফোরণে আরো প্রায় ২০ জনের মত আহত হয়েছিল।

"আমার মনে হল পায়ের মধ্যে গরম কিছু একটা আঘাত করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্লিডিং শুরু হলো। তখন বুঝতে পারলাম যে আমারো কিছু একটা ক্ষতি হয়েছে"

"নিজের পায়ে নিজেই ব্যান্ডেজ করে নিই"- বলেন ল্যা. কর্নেল মাসুদ।

Image caption র‍্যাব কর্মকর্তা ল্যা. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ।

ততক্ষণে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এটি সাধারণ কোন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি জঙ্গি হামলা।

তবে হামলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই যে হামলাকারীরা প্রায় ২০ জন মানুষকে মেরে ফেলেছে সেটি তখনো জানা যায়নি। কিছুক্ষণ পর র‍্যাব প্রধান জানান, এটিকে তারা একটি জিম্মি পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন এবং হামলাকারীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।

এদিকে ভেতরে থাকা কর্মী আকাশ এবং কয়েকজন সহকর্মী টয়লেটে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা বলছিলেন, ভেতরে কী হচ্ছে সেটি তারা বুঝতে পারছিলেননা।

"তওবা- কলেমা পড়ে একদম রেডি ছিলাম। হান্ড্রেড পার্সেন্ট ধরে নিয়েছিলাম মারা যাবো। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমাদেরকে বের করে আনছেন"- টয়লেটে আটকে থাকা অবস্থায় ভয়াবহ পরিস্থিতি বর্ণনা করছিলেন মোহাম্মদ আকাশ।

Image caption হোলি আর্টিজানের কর্মী মোহাম্মদ আকাশ

এদিকে বাইরে তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। রাত ১২ টার আগে এবং পরে অনেকবার ভেতরে থাকা জঙ্গিদের সাথে নানাভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি।

লে. কর্নেল তুহিন বলেন. তারা নানাভাবে বারবার হামলাকারীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে কোন ধরণের আলোচনা করার ইচ্ছা সন্ত্রাসীদের নেই।

সেই রাতটি ছিল সংশ্লিষ্ট সবার জন্য সেটি ছিল একটি আতঙ্ক এবং উত্তেজনার রাত।

আকাশ বলছিলেন, হামলাকারীরা তার একজন সহকর্মীকে রান্না করতে বলে এবং তারা ভোররাতের আগে খাওয়া-দাওয়াও করে। বিষয়টি তিনি পরে সহকর্মীর কাছ থেকে জেনেছেন।

রাত ১ টা থেকেই ঘটনাস্থলে সেনাসদস্যদের আনাগোনা দেখা যায়। শেষপর্যন্ত গভীর রাতেই সিদ্ধান্ত হয় সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো দল এসে অভিযান পরিচালনা করবে। ভোর থেকেই সেনাবাহিনীসহ পুলিশ, র‍্যাব এবং অন্যান্য বাহিনী নিয়ে গঠিত যৌথবাহিনী ঘটনাস্থলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ভোররাতের দিকে কথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠির বার্তা সংস্থা আমাক থেকে কিছু ছবি প্রকাশ করে দাবী করা হয় ভেতরে বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

প্যরাকমান্ডোদের অভিযানের আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা বলয় বাড়ানো হয়। এরপর সকাল ৭ টার দিকে ভেতরে থাকা কয়েকজনকে ছেড়ে দেয় জঙ্গিরা। যাদের মধ্যে ছিলেন পরবর্তীতে আলোচিত তাহমিদ হাসিব খান এবং হাসনাত করিমও।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption গুলশানের ভিন্ন একটি স্থানে চলছে হোলি আর্টিজান বেকারি

সাড়ে সাতটার কিছু পরই ভেতরে অভিযান চালায় সেনাদল।

পরবর্তীতে সেনাবাহিনী জানায় ৭টা ৪০ থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে অভিযান শেষ হয় এবং অভিযানের শুরুতেই ৬ জন জঙ্গি নিহত হয়। অভিযানের পর ভেতরে থাকা রেস্টুরেন্ট স্টাফসহ বাকিদের বের করে আনা হয়। যার মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ আকাশ।

আকাশ বলেন, রাতেই তারা ফোন করে আত্মীয়-স্বজনদের জানিয়েছিলেন তারা কোথায় আছেন। সকালে সেনাদলের অভিযানের পর তাদেরকে সেখান থেকে বের করে আনা হয়। সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে, জবানবন্দী নিয়ে সন্ধ্যায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

ঐ ঘটনার এক বছর পর এখনো মাঝে মাঝে আতঙ্কে রাতে ঘুমও ভেঙ্গে যায় আকাশের। তার প্রার্থনা, এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে আর কেউ যেন না পড়ে।

অন্যদিকে র‍্যাব কর্মকর্তা মি. মাসুদ ঐরাতে আহত অবস্থায় দায়িত্ব পালনের পর পরবর্তী কয়েকদিন তাকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল।

তিনি মনে করেন, ঐ ঘটনার মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা যে বীভৎসতা দেখিয়েছে সেটিই সাধারণ মানুষকে তাদের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে।