বরিশালে পিতৃপুরুষের গ্রাম দেখে মুগ্ধ মিহির বোস

চল্লিশ বছর ধরে লন্ডনে টেলিগ্রাফ, টাইমস, ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড, বিবিসি সহ প্রথম সারির মিডিয়াতে সাংবাদিকতা করছেন মিহির বোস। বেশ কবছর বিবিসির ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। সেই সাথে চালিয়ে গেছেন নানা বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি এবং এখন পর্যন্ত খেলাধুলো, ইতিহাস, চলচ্চিত্র সহ নানা বিষয়ে ৩০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে তার।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
বরিশালে পিতৃপুরুষের গ্রাম কতটা মুগ্ধ করেছে তাকে? বিবিসিকে বলেছেন ব্রিটিশ-ভারতীয় সাংবাদিক-লেখক মিহির বোস।

ভারতের স্বাধীনতার ৭০ বছর নিয়ে তার লেখা সর্বশেষ বইটি প্রকাশের অপেক্ষায়। সেই সূত্রে কিছুদিন আগে গিয়েছিলেন পিতৃপুরুষের আদি নিবাস বাংলাদেশের বৃহত্তর বরিশালের রামচন্দ্রপুর গ্রামে।

স্বাধীন ভারতের বয়স এবং মিহির বোসের বয়স একই। নিজেকে তিনি বলেন "মিডনাইটস চাইল্ড" । এই ৭০ বছরে তার সাথে সাথে ভারত কতদূর এগিয়েছে তা নিজের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন তার নতুন প্রকাশিতব্য বইতে। "তাই আমি বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলাম। আমার বাড়ি কোথায়.. কোথা থেকে আমার বাবা এসেছিলেন তা না দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যেতো লেখাটি।"

বাবার কাজের সূত্রে মিহির বসের বড় হওয়া এবং স্কুল কলেজ সবই ছিল মুম্বাইতে। সে সময় বাবা পূর্ববঙ্গের কথা, বরিশালের কথা, রামচন্দ্রপুর গ্রামের কথা শোনাতেন ছেলেকে।

"আমার মা কলকাতার মেয়ে। তিনি প্রায়ই বাবাকে নিয়ে ঠাট্টা করে বলতেন - আইতে শাল যাইতে শাল, তার নাম বরিশাল.. বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানোর কথা শুনতাম। মা এমনভাবে রসিকতা করে এসব বলতেন যেন পূর্ববঙ্গের মানুষের বুদ্ধি কম, কথাবার্তায় চৌকস নয়।"

কিন্তু বরিশাল এবং রামচন্দ্রপুরের ফেলে আসা জীবন নিয়ে বাবার মুখে অনেক কথা শুনেছেন তিনি। বরিশালের নদীগুলোর সৌন্দর্যের কথা, ঐশ্বর্যের কথা বলতেন। "আমি তাই দেখতে চেয়েছিলাম বাবা শুধু গল্প করতেন কিনা।"

কি দেখেছেন তিনি? বিবিসি বাংলাকে মিহির বোস বলেন - "খুব সুন্দর। রামচন্দ্রপুর গ্রামটি খুব সুন্দর। বাবা যেটা বলতেন সেগুলো মিথ্যা নয়।"

বাংলাদেশে গিয়ে সবচেয়ে যে দুটো বিষয় মিহির বোসকে মুগ্ধ করেছে তা হলো - বাঙালি সংস্কৃতি এবং রবীন্দ্র প্রেম।

"আমার দিদিমা, বাবা-মার কাছে যে বাঙালি সংস্কৃতির শুনেছি সেটা টের পেয়েছি বাংলাদেশে... দেশ বা ধর্মকে অতিক্রম করা সেই সংস্কৃতি এবং ঐক্য। এমনকী রবীন্দ্রনাথকে তারা এতটা উঁচুতে রেখেছে যেটা ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গেও আমি দেখিনি।"

রামচন্দ্রপুরে দুই হিন্দু পরিবারের সাথে দেখা হয়েছিল তার। তারা দাবি করেছিলো বোস পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তাদের। খুব ভালো ইলিশ খেয়েছেন বরিশালে। "ইলিশ আমার ভীষণ প্রিয়.. এত ভালো ইলিশ আগে খাইনি।"

বাংলাদেশ, বরিশাল, রামচন্দ্রপুর গ্রাম মিহির বোসের নতুন বইয়ের পুরো একটি চ্যাপ্টার জুড়ে থাকবে।

ছবির কপিরাইট Facebook (Mihir Bose)
Image caption এখন পর্যন্ত ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে মিহির বোসের

মুম্বাইয়ের শৈশব-কৈশোর

একদিকে শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে মুম্বাইতে, তারপর দীর্ঘ ৫০ বছর ব্রিটেনে জীবন কাটানোর ফলে বাংলায় কথা বলতে কষ্ট হয় মিহির বোসের। তারপরও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মিহির বোস বিবিসি বাংলাকে তার জীবন ও কাজ নিয়ে খোলামেলা অনেক কথা শুনিয়েছেন।

পরিবারের চাপে ৬০এর দশকে মুম্বাই থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছিলেন ব্রিটেনে। কিন্তু আসার পর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বদলে পড়েছেন একাউন্টেন্সি। পেশা শুরু করেছিলেন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হিসাবে। ছেড়ে দিয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করেন ক্রীড়া সাংবাদিকতা।

"আমি ছোটবেলা থেকেই সাংবাদিক হতে চাইতাম। স্কুলের শিক্ষকরা এক পরীক্ষার পর বলেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার মত আমার নাকি মাথা নেই। বাবাকে এসে বলেছিলাম সাংবাদিক হবো। এক কথায় না করে দিলেন আমার ব্যবসায়ী বাবা .. তার দুই সাংবাদিক বন্ধু খুব মদ খেতেন, টাকা পয়সা ছিলোনা।"

স্বাধীনতার পর নেহেরু তখন প্রধানমন্ত্রী। "তিনি সবসময় বলতেন ভারতে ইঞ্জিনিয়ার দরকার, বিজ্ঞানী দরকার। আমাকেও সেই দিকেই ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিলো।"

ক্রীড়া সাংবাদিকতা কেন? খেলাধুলো করতেন? মিহির বোস জানান, গাভাসকার স্কুলে তার দুই বছরের জুনিয়র ছিলেন। তার মত খেলতে পারতেন না, তবে ক্রিকেট খেলতেন এবং ক্রিকেট নিয়ে বিস্তর আগ্রহ ছিলো তার।

লন্ডন ব্রডকাস্টিং নামে এক বাণিজ্যিক রেডিওর ক্রীড়া সম্পাদকের সাথে ক্রিকেট নিয়ে এক কথোপকথনের পর কাজের প্রস্তাব পেয়ে যান তিনি। মজা করে বললেন, "তিনি ভেবেছিলেন আমি অনেক জানি.. বলতে পারেন আমি ধোঁকা দিয়েছিলাম তাকে।"

ক্রিকেট নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন, অনেক কিংবদন্তির ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

ছবির কপিরাইট Facebook
Image caption চার দশকের সাংবাদিকতা পেশায় বিবিসি সহ ব্রিটেনের প্রথম সারির অনেকগুলো মিডিয়াতে কাজ করেছেন মিহির বোস

বিস্ময়কর গ্যারি সোবার্স

মনে রাখার মত সাক্ষাৎকার শুনতে চাইলে, বার্বেডোজে গ্যারি সোবার্সের সাথে এক সাক্ষাৎকারের কথা শোনালেন মিহির বোস। "আমি তার সামনে তারই অসামান্য সব ইনিংসের কথা তুলছিলাম, কিন্তু তিনি (সোবার্স) কিছুই মনে করতে পারছিলেন না।"

বললেন, অনেক সময় তারকাদের বাইরে থেকে যা মনে আসলে তারা অন্যরকম। "সৌরভ গাঙ্গগুলি সম্পর্কে এদেশে মানুষের ধারণা সে খুব উদ্ধত.. মহারাজের মত আচরণ...কিন্তু আমার ব্যক্তিতগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন।"

একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত হয়ে ব্রিটেনের মূলধারায় সাংবাদিকতা করা কতটা সহজ ছিল? মিহির বোস বললেন, ফুটবল নিয়ে লেখা শুরুর সময় গ্রহণযোগ্যতা পেতে তার সমস্যা হয়েছে। একবার সাদামটন ফুটবল ক্লাবের এক ম্যানেজার সংবাদ সম্মেলনে মিহির বোসকে খোলাখুলি বলেছিলেন, "তোমার হকির মাঠে যাওয়া উচিৎ.. তুমি ভুল জায়গায় এসেছো।"

"এমন ভাব ছিলো যেন তুমি ভারত থেকে এসেছো, তুমি হয়তো ক্রিকেট জানো, কিন্তু ফুটবল তোমার জায়গা নয়।"

সাংবাদিকতার পাশাপাশি, এখন পর্যন্ত তার ৩০ টি বই প্রকাশ হয়েছে। ক্রিকেটের ইতিহাস নিয়ে যেমন লিখেছেন, বলিউডের ইতিহাস নিয়েও লিখেছেন। এমনকী আগা খান পরিবারকে নিয়েও লিখেছেন।