ডোভালের 'জেমস বন্ড' ইমেজেই কি হিতে বিপরীত?

ছবির কপিরাইট PRAKASH SINGH
Image caption ভারতে অজিত ডোভালের নিজস্ব ফ্যান ক্লাব পর্যন্ত আছে

ভুটানের ডোকলাম উপত্যকায় ভারত ও চীনের মধ্যে অব্যাহত সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ব্রিকসের এক বৈঠকে যোগ দিতে বেজিং গিয়ে পৌঁছেছেন।

ডোকলাম সঙ্কট নিয়েও তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন - তবে সে দেশের সরকার-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় মি: ডোভালকেই এর আগে এই সঙ্কটের জন্য 'মূল ষড়যন্ত্রী' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভারতের সাবেক গোয়েন্দা-প্রধান মি: ডোভাল দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মনোভাবের জন্য পরিচিত - কিন্তু তার এই নীতির জন্য ভারতকে কি একটু বেশিই দাম দিতে হচ্ছে?

ভারতে গত উনিশ বছরে যারা এনএসএ বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন, অজিত ডোভাল তাদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এই সাবেক প্রধান অবসরের পর জড়িত ছিলেন বিবেকানন্দ ফাউন্ডেশন নামে একটি জাতীয়তাবাদী থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে - এবং বরাবরই তিনি সওয়াল করে গেছেন ভারতের একটি আগ্রাসী প্রতিরক্ষা-নীতির পক্ষে।

কেন আক্রমণই ভারতের সেরা আত্মরক্ষার উপায় হওয়া উচিত, ইসলামি জিহাদিদের কীভাবে মোকাবিলা করা দরকার - এই সব নিয়ে মি ডোভালের পুরনো ও নতুন নানা বক্তৃতার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়মিতই ঘুরে বেড়ায়।

কোথাও তাকে হুমকি দিতে শোনা যায়, পাকিস্তান আর একবার মুম্বাই হামলার মতো কিছু করার চেষ্টা করলে বালুচিস্তান ছিনিয়ে নেওয়া হবে।

সম্ভবত এই কারণেই অজিত ডোভাল ভারতের একমাত্র এনএসএ - যার নিজস্ব ফ্যান ক্লাবও আছে। তার ঘন ঘন সিগারেট খাওয়ার অভ্যাসের প্রসঙ্গ টেনে অনুগামীরা তাকে তুলনা করেন জেমস বন্ডের সঙ্গেও।

ছবির কপিরাইট Lintao Zhang
Image caption বেজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অজিত ডোভাল (ফাইল ছবি)

কিন্তু কাশ্মীর থেকে চীন, মিয়ানমার থেকে নেপাল - গত তিন বছরে 'ডোভাল ডকট্রিন' ভারতকে আদৌ কতটা সুবিধা দিয়েছে সেই প্রশ্নটাও কিন্তু পাশাপাশি উঠছে।

ভারতের নামী স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট রাহুল বেদী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "পাকিস্তানের বেলাতেই হোক বা চীন - ডোভালের নীতি একটি অত্যন্ত আগ্রাসী নীতি। কিন্তু আমার মতে সেটাতে বিরাট ঝুঁকিও আছে - কারণ ভারতীয় সেনা বা গোয়েন্দা বিভাগের ক্ষমতা বা দুর্বলতাকে সেখানে ঠিকমতো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।"

"পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণরেখায় বা চীনের সঙ্গে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে সেনা ও গোয়েন্দা বিভাগের ভূমিকাকে এই ডকট্রিনে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে - কিন্তু সিস্টেমের দুর্বলতাটা মাথায় রাখা হয়নি।"

দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি আরও বলছেন, ডোকলামে চীন রাস্তা বানানোর চেষ্টা করছে বহুদিন ধরেই - কিন্তু গোয়েন্দা ব্যর্থতায় ভারতের সেটা মাসদুয়েকের আগে নজরেই পড়েনি।

কিন্তু এই ডোকলাম সংঘাতে চীন কেন সরাসরি মি: ডোভালকেই দায়ী করছে?

দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে চায়না স্টাডিজের অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী মনে করেন, অজিত ডোভালের প্রোফাইল আর পূর্বসূরীদের তুলনায় তার কাজের ধারার ফারাকটাই এর কারণ।

"চীনের কাছে তিনি একজন গ্লোরিফায়েড স্পাই। চীন ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের আরও কঠোর হওয়া উচিত - আগের সরকারগুলো দুর্বলতা দেখিয়েছে, এই জাতীয় কথাবার্তা তিনি অনেকবার বলেছেন এবং চীনে সেগুলো ছাপাও হয়েছে। ডোকলামে ভারতের সেনা মোতায়েনের পেছনেও তারা মি: ডোভালের হাত দেখছে।

ছবির কপিরাইট PRAKASH SINGH
Image caption ভারতে গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান ছিলেন অজিত ডোভাল

"আসলে পূর্বসূরী শিবশঙ্কর মেননের তুলনায় ওর ব্যাকগ্রাউন্ডও একদম আলাদা। মি ডোভাল ছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের, আর মি মেনন ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। মেননের বেলায় যে 'কনসিলিয়েটরি অ্যাপ্রোচ' বা প্রশমনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যেত সেটা ডোভালের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত - তাকে দেখা হয় অনেক বেশি কট্টর বা 'হক' হিসেবে", বলছিলেন শ্রীমতি চক্রবর্তী।

রাহুল বেদীও মনে করেন এই 'সিক্রেট এজেন্ট' বা গোয়েন্দার ইমেজটা-ই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে অজিত ডোভালের জন্য বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে।

তিনি বলছেন, "মি ডোভাল প্রচার ভালবাসেন, প্রচারে উৎসাহও দেন। জেমস বন্ড ঠিকই আছে - কিন্তু বন্ড তো কাজটা করে দেখান, তিনি তো নীতি বানান না। মি ডোভাল তো এখন আর গিয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন না - কাজেই ট্যাকটিক্স নয়, তাকে আরও মন দিতে হবে স্ট্র্যাটেজিতে।"

"সেটার পরিচয় আমরা এখনও পাইনি বলেই পাকিস্তান, চীন, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা সর্বত্রই আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে - এমন কী ভুটানের সঙ্গে সম্পর্কও সুতোর ওপর ঝুলছে।"

অনেকটা এই কারণেই দিল্লিতেও কেউ বড় একটা আশা করছেন না অজিত ডোভালের বেজিং সফরে ডোকলাম সঙ্কটের সমাধানের সূত্র মিলবে। দেশের ভেতরে জনপ্রিয় ডোভাল ডকট্রিন যে বিদেশে এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

আমাদের পেজে আরও পড়ুন :

চীন-ভারত সীমান্ত সংকটে সমাধানের পথ কী?

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের মূল হোতা স্বামীরাই

অ্যান্টিবায়েটিকের কোর্স কি শেষ করা উচিত?

সম্পর্কিত বিষয়