বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কোন কোন জায়গায় ১০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে ভুগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে

বাংলাদেশে মাটির নিচে পানির স্তর ক্রমশই আরো নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সরকারি হিসেব মতেই সারা দেশের নানা যায়গায় পানির স্তর ৪ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে।

এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে এর বদলে সরকারি কর্মকর্তারা এখন মাটির উপরিভাগের পানি অর্থাৎ পুকুর বা নদী নালার পানির ব্যবহার বাড়াতে জোর দেবার কথা বলছেন।

কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪৪ শতাংশ মানুষ খাওয়ার জন্যে নিরাপদ পানি পায় না । এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে চলছে পানি বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। পুকুর আর নদী নালার পানিকে কর্তৃপক্ষ কতোটা খাওয়ার যোগ্য করে তুলতে পারবে সরকার?

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পানি সরবরাহ) বেগম নাসরিন আক্তার বলছেন, "জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম একটা কারণ। এই যে আমাদের ইকলজিকাল ইমব্যালান্স যেটা হচ্ছে, আমাদের পুরো স্ট্র্যাটেজিটাই বদলাতে হচ্ছে"

তিনি বলছেন, "ঢাকার জন্য আশপাশে তিনটি নদী থেকে ইতিমধ্যেই পানি শোধন করা হচ্ছে। আর সারা দেশের জন্য যে পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে বা যেগুলোর পানি নষ্ট হয়ে গেছে সেরকম পুকুর পুনরায় খনন কিভাবে পরিশোধন করে ব্যবহার করা যায় সেই চেষ্টা করছি আমরা। এরকম সাড়ে তিন হাজার পুকুরকে আমরা পুন খনন কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে এসেছি"।

সরকারি হিসেবে দেশের একশ ভাগ মানুষই পানি পাচ্ছে। কিন্তু নিরাপদ পানির প্রশ্ন উঠলে দেখা যাচ্ছে ৮৭ শতাংশ মানুষ উৎসে নিরাপদ পানি পায়। তবে সেটি মানুষের ব্যবহারের পর্যায়ে যেতে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই আর নিরাপদ থাকছে না।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভূগর্ভস্থ পানি এখন ব্যাপকভাবে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ চলতি মাসেই নতুন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মোটে ৫৬ ভাগ মানুষ নিরাপদ পানি পানের সুযোগ পাচ্ছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রাক্টিকাল অ্যাকশনের বাংলাদেশ প্রধান হাসিন জাহান বলছেন, মাটির ওপরের পানি ব্যবহার করতে গেলে দূষণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে।

তিনি বলছেন, "দূষণের দুটো প্রধান উৎস। একটা হচ্ছে মানবসৃষ্ট বর্জ্য, বাসা বাড়ির টয়লেট। এসব বাসাবাড়িতে তৈরি মল-মূত্রের সঠিক ব্যবস্থাপনা হয়না। তাই তা পানিতে মিশে যায়। এটা একটা বড় অন্তরায়। আর একটা দূষণের সূত্র হচ্ছে বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য। সুতরাং আমাদের এই ধরনের দূষণ ব্যবস্থাপনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে"।

কিন্তু বাংলাদেশে মানুষের ব্যক্তিগত আচরণের কারণেও অনেক সময় নিরাপদ পানিও তার মান হারায়। কি ধরনের পাত্রে এবং কিভাবে তা সংরক্ষণ করা হলো, কিভাবে তা বহন করা হলো আর নিজের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা কতটা রয়েছে সেটিও অনেক বড় ব্যাপার। শুধু হাতের ময়লা বা একটি অপরিচ্ছন্ন পাত্রও পানিকে বিশুদ্ধ করে তোলে।

পরিবেশ বিষয়ক প্রকৌশলী স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ বলছেন, "সমস্যা যেটা হলো আমাদের মাটির ওপরের পানি হাইলি কন্টামিনেটেড। আমাদের যেসব প্ল্যান্টে পানি ট্রিটমেন্ট করা হয় তাতে ব্যাক্টেরিয়া কিছুটা থেকেই যায়। যার জন্য ডিজইনফেকশন বলে একটা ব্যবস্থা আছে যা দিয়ে আমরা মাইক্রোঅর্গানিজমগুলোকে মেরে ফেলতে পারি। ভবিষ্যতে এর একটা ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে"

কিন্তু সেটি সারা দেশে কোটি কোটি মানুষের জন্য করা কতটা সম্ভব হবে? এছাড়া বাংলাদেশের জন্য আরো চ্যালেঞ্জ হলো দুই কোটির বেশি মানুষ ইতিমধ্যেই আর্সেনিক যুক্ত পানি খাচ্ছে। আর উপকূলীয় এলাকায় পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলারই এখন চেষ্টা চলছে।

সম্পর্কিত বিষয়