ভারত ভাগের ৭০ বছর: 'শেকড়ের সন্ধানে গিয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গে'

৭০ এর ভারত ভাগের পরের প্রজন্মের একজন আবু সাদ।
Image caption ৭০ এর ভারত ভাগের পরের প্রজন্মের একজন আবু সাদ।

১৯৪৬ সালে ১৬ই আগস্ট পশ্চিমবঙ্গে এক দাঙ্গায় তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয় স্থানীয় হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে। এর রেশ পরবর্তী কয়েকবছর ধরে চলে। মি. সাদ তার বাবা,চাচা,ফুফুদের কাছে শুনেছেন সেই সময় কলকাতায় বা পুরো পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান বাঙ্গালীদের শিক্ষা, চাকরী, ব্যবসার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।

সামাজিক ভাবে একটা চাপা মানসিক দূরত্ব ছিল তখন। আবু সাদের পূর্ব পুরুষেরা চেষ্টা করে সেখানে মানিয়ে চলার কিন্তু অবস্থা কোন ভাবেই সুবিধা জনক স্থানে না থাকায় একরকম বাধ্য হয়ে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।

আবু সাদের জন্ম ঢাকায়, ১৯৭১ সালে জানুয়ারির ১ তারিখে। মা বাংলাদেশের বাগেরহাটের মেয়ে ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের তাঁর পূর্বপুরুষ এবং সেখানকার বাড়ী সম্পর্কে তিনি শুনেছিলেন অনেক কথা। "সেসব কিছুই আমার কাছে রাজা-রানীর গল্পের মত" বলছিলেন তিনি।

তিনি বলছিলেন "আমার দাদার দাদা ভূপাল স্টেটের প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে বর্ধমানে বিশাল এক বাড়ী পেয়েছিলেন। যথেষ্ট বড় বাড়ী। আব্বা গল্প করতেন দুইতলা বাড়ীতে ১৫/২০টি শুধু শোবার ঘর ছিলো, আরো অন্যান্য কাজের ঘর ছিল"।

ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন:

Image caption সংবাদদাতা ফারহানা পারভীনের সাথে কথা বলছেন আবু সাদ

"আরো শুনেছি বর্গিদের উপদ্রুপ হত, একেবারে ছোটবেলার গল্পের বইএর মত সব কাহিনী। টেরাকোটার কাজ করা, নানা রঙের কাঁচ- একেবারে রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি যেমন হয় তেমটাই মনে মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল"।

আবু সাদ প্রথম বারের মত ভারতে যান নব্বই এর দশকের শুরুর দিকে। ১৯৯০/৯১ সালের দিকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

দেশের রাজনৈতিক কারণে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। "এমন সময়ে আমি আর আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মামুন সিদ্ধান্ত নিলাম ভারতে যাবো সেই আমার প্রথম পূর্বপুরুষের ভিটা দেখতে যাওয়া। "।

কিন্তু হঠাত করে কেন এই সিদ্ধান্ত?

Image caption মি. সাদ বর্ধমানের বাড়ীর ছবি দেখাচ্ছিলেন

তিনি বলছিলেন "তাঁরা কীভাবে সেখানে থাকতেন, কোন বাড়ীতে থাকতেন সেসব দেখা, একই সাথে আমার শেকড়ের সন্ধান করা"।

মজার ব্যাপার হল মানুষ যা কল্পনা করে বাস্তবতা সেটার থেকে ভিন্ন কিছুই হয়।

"আমি যখন সেখানে গেলাম দেখলাম বাড়ীটা আছে কিন্তু তার সেই জৌলুস, চাকচিক্যের কোনটাই নেই। আমি অবশ্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কারণ দুশো বছরের পুরনো একটা বাড়ী আগের অবস্থায় থাকার কথা না। লাল ইট-সুরকি বের হয়ে গেছে, যেন একটা কঙ্কাল দাড়িয়ে আছে" প্রথম দেখায় বর্ণনা তিনি এভাবেই দিচ্ছিলেন।

"আমার যাওয়ার কারণ ছিল আমার শেকরের সন্ধান করা। শেকরটা কোথায় ছিল, কেমন ছিল, কেন সেটা দুর্বল হয়ে গেল সেসব জানতে চাওয়া আমার আগ্রহ ছিল", আবু সাদ বলছিলেন

"যখন আমি আমার বাবার ঘরে ঢুকে খাটের উপর তাঁর নাম লিখা দেখলাম, ফুফুর ঘরে ড্রেসিং টেবিলে ফুপুর নাম লেখা, চাচার খাটে নাম লেখা এমন আরো নানা জিনিস দেখলাম তখন আমি বুঝে নিলাম আমার সেই গাছটা না থাকলেও গাছের শেকড়গুলো রয়ে গেছে। আমি গাছটাকে পুরো না পেলেও শেকড়গুলো পেয়ে গেলাম"।