'কোরান পড়ে বুঝেছি, তিন তালাকে তা সম্মতি দেয় না'

পার্সোনাল ল-তে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারতের মুম্বাইতে মুসলিমদের বিক্ষোভ সমাবেশ (ফাইল চিত্র) ছবির কপিরাইট PUNIT PARANJPE
Image caption পার্সোনাল ল-তে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারতের মুম্বাইতে মুসলিমদের বিক্ষোভ সমাবেশ (ফাইল চিত্র)

ভারতে মুসলিম সমাজের মধ্যে প্রচলিত তিন তালাক প্রথাকে মঙ্গলবার সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এই রায় দিয়েছে যে বেঞ্চ, তার অধিকাংশ বিচারপতি একে কোরান-বিরোধী বলেও বর্ণনা করেছেন।

পাঁচ ধর্মের পাঁচজন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত সাংবিধানিক বেঞ্চ তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে মন্তব্য করেছে, এই প্রথা কোনও ধর্মীয় রীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হতে পারে না।

বেঞ্চের অন্তত তিনজন বিচারপতি তাদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট বলেছেন, তিন তালাকের প্রথা তাদের মতে কোরান-বিরোধী এবং সে কারণেই এটাকে তারা কিছুতেই ইসলাম-সম্মত বলে মানতে পারছেন না।

বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি জাস্টিস কুরিয়েন জোসেফ তার রায়ে একের পর এক কোরানের আয়াত উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেছেন তার এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে 'কোরান কিছুতেই তিন তালাকের রীতিকে সমর্থন করে না'।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত ছমাসের জন্য তিন তালাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই সময়সীমার মধ্যে পার্লামেন্টকে তিন তালাকের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করার জন্যও বলেছে।

সরকারও আদালতে তিন তালাক প্রথা বিলোপের জন্যই সওয়াল করেছিল, যদিও ভারতের মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের যুক্তি ছিল ধর্মীয় বিষয়ে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

ছবির কপিরাইট MONEY SHARMA
Image caption তিন তালাকের বিরুদ্ধে মোট সাতটি পিটিশন জমা পড়েছিল সুপ্রিম কোর্টে

আরও দেখুন:

ভারতে তিন তালাক প্রথা বাতিলে পাঁচ নারীর লড়াই

যেভাবে তিনি 'নায়ক রাজ' হয়ে উঠলেন

দক্ষিণ আফ্রিকায় চার নরখাদকের বিচার

ভারতের মুসলিম সমাজে প্রায় চোদ্দোশো বছর ধরে পরপর তিনবার তালাক উচ্চারণের মাধ্যমে স্ত্রী-কে বিচ্ছেদ দেওয়ার যে প্রথা চালু আছে, তার বিরুদ্ধে আদালতে মুসলিম মহিলাদের পক্ষ থেকে মোট সাতটি আবেদন জমা পড়েছিল।

এর মধ্যে এমন একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীও ছিলেন, যাকে তার স্বামী তালাক দিয়েছিলেন হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে।

কিন্তু তিন তালাকে কোর্টের হস্তক্ষেপে প্রতিবাদ জানায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড - যাদের যুক্তি ছিল এটা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি।

এদিনের রায়ের পর ল বোর্ডের অন্যতম আইনজীবী ইজাজ মকবুল জানান, "রায়ে গরিষ্ঠ সংখ্যক বিচারক, জাস্টিস কুরিয়েন জোসেফ, জাস্টিস আর এফ নরিম্যান ও জাস্টিস উদয় ললিত মন্তব্য করেছেন তিন তালাক অসাংবিধানিক। তবে বাকি দুজন, চিফ জাস্টিস কেহর ও জাস্টিস নাজির আহমেদের বক্তব্য ছিল ভারতীয় মুসলিমদের ধর্মীয় রীতির অংশ এই প্রথা - আর তাতে সংস্কার আনতে গেলে আইন করেই তা করতে হবে।"

"ফলে ছমাসের মধ্যে সেটা করতে তারা পার্লামেন্টকে নির্দেশ দিয়েছেন ও সংবিধানের ১৪২ ধারা অনুযায়ী মুসলিম পুরুষদের তিন তালাক প্রয়োগে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। তবে এটা শুধু ইনস্ট্যান্ট তিন তালাকের জন্য প্রযোজ্য - তিন মাস ধরে বা ধাপে ধাপে যে তালাকের প্রথা, তালাকে এহসান বা তালাকে-হাসান সেগুলো যথারীতি চালু থাকবে।"

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption সুপ্রিম কোর্টের ওই সাংবিধানিক বেঞ্চে ছিলেন পাঁচটি ধর্মের বিচারপতিরা

মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রায়ের খুঁটিনাটি পড়েই তারা বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

তবে সরকারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সমস্বরে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে মুসলিম মহিলাদের ওপর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবিচারের অবসান ঘটবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন।

ভারতীয় মুসিলম মহিলা আন্দোলনের জাকিয়া সুমান বহু বছর ধরে তিন তালাক বিলোপ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। এদিনের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তিনি বিবিসিকে বলেন, "মুসলিম সমাজে সংস্কার আর গণতন্ত্র আনার লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হবে এই রায়।"

"সাধারণ মুসলিম নারীরাও আজ তাদের অধিকার নিয়ে সচেতন হচ্ছেন, তাই আমি আশাবাদী। এদেশে যদি সতীদাহ, পণপ্রথা বা পারিবারিক হিংসার বিরুদ্ধে আইন হতে পারে তাহলে তিন তালাকের বিরুদ্ধেই বা কেন নয়? আমি চিরকালই মনে করে এসেছি এটা অসাংবিধানিক - এবং তিন তালাক যে কোরান-সম্মতও নয়, আজকের রায়ে তাও স্পষ্ট হয়ে গেল", বলেন মিস সুমান।

তিন তালাক প্রথা আসলে কতটা ইসলাম-সম্মত আর কতটা নয়, তা নিয়েও এদিনের রায়ে বিচারপতিদের একাধিক পর্যবেক্ষণ এসেছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাইফ মাহমুদ বলছিলেন, জাস্টিস কুরিয়েনের রায়েই কথাটা সবচেয়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।

ছবির কপিরাইট BMMA
Image caption বহুদিন ধরে তিন তালাক বিলোপের দাবি জানাচ্ছে ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন

তিনি জানান, "জাস্টিস কুরিয়েন কোরান শরিফের একটার পর একটা আয়াত উদ্ধৃত করে রায়ে বলেছেন তিন তালাক অবশ্যই কোরানের চেতনার বিরোধী। আর যেটা কোরান-বিরোধী, তা তো অবশ্যই ইসলাম-বিরোধী হতে হবে।"

"জাস্টিস নরিম্যান ও জাস্টিস উদয় ললিত সেই সঙ্গে যোগ করেছেন - এই প্রথা দেশের সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী। এই তিনজনের গরিষ্ঠ রায়ের ফলেই তিন তালাক আজ থেকে দেশে বেআইনি বলে গণ্য হচ্ছে।"

তবে এই রায়ের মাধ্যমেই ভারতে তিন তালাক নিয়ে যাবতীয় বিতর্কর অবসান হতে যাচ্ছে তা বোধহয় নয়।

দেশের প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠনগুলো কীভাবে এতে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং সরকারই বা তিন তালাক প্রথার নিরসনে কী ধরনের আইন তৈরির উদ্যোগ নেয়, এখন তার ওপরেই অনেক কিছু নির্ভর করছে।

সম্পর্কিত বিষয়