'আমার তথ্যগুলো তাদের বর্তমান নষ্ট করে দিচ্ছে'

ছবির কপিরাইট MOHIUDDIN AHMED
Image caption লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইতিহাস লিখে পাঠকের কাছে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন মহিউদ্দিন আহমদ।

২০১৪ সালে তাঁর প্রকাশিত প্রথম রাজনৈতিক বই 'জাসদের উত্থান-পতন, অস্থির সময়ের রাজনীতি' বইটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

সে বইতে মি: আহমদ ১৯৭০-এর দশকে জাসদের ভূমিকা নিয়ে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন সেটি নানা আলোচনা, সমালোচনা এবং বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিবিসি বাংলার সাপ্তাহিক আয়োজন 'এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার' অনুষ্ঠানে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি রাজনৈতিক দলের ইতিহাসকে 'নির্মোহভাবে' তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

"বিষয়টা যদি আমি ১৯৭৫, ৭৬ বা ৮০ সালে লিখতাম তাহলে হয়তো অন্যভাবে লিখতাম। কারণ তখনো আমার গায়ে দলের গন্ধ ছিল। কিন্তু যতদিন যাবে তখন আবেগ বিবর্জিত হয়ে আপনাকে ইতিহাসটা তুলে ধরতে হবে," বলছিলেন মি: আহমদ।

জাসদের রাজনৈতিক ইতিহাস ছাড়াও মি: আহমদ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন।

তবে জাসদ নিয়ে বইটি যতটা বিতর্কের ঝড় তুলেছিল বাকি দুটো বই সেরকম বিতর্ক তৈরি করেনি।

বর্তমানে জাসদের সাথে সম্পৃক্ত অনেকেই মনে করেন, মি: আহমদ 'উদ্দেশ্যমূলকভাবে' জাসদকে হেয় করার জন্য এ বইতে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্র থাকার সময় মি: আহমদ প্রথমে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের জন্মের পর তিনি সে দলটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যান।

কিন্তু ১৯৭৬ সালের পর রাজনীতি থেকে দূরে সরে পেশাগত কাজে মনোযোগ দেন।

গণ উন্নয়ন গ্রন্থাগার নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ছিলেন মি: আহমদ। তিনি সে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন ১৫ বছর।

সমালোচকদের জবাবে মি: আহমদ বলেন, " ঐ সময়ে জাসদ মনে করতো যে একটা বিপ্লব করতে হবে এবং বিপ্লব করতে হলে শেখ মুজিবের সরকারকে উৎখাত করতে হবে।... সমস্যা হচ্ছে জাসদ এখন ভাঙতে ভাঙতে আওয়ামী লীগের মিত্র। এবং তারা প্রাণপণে চেষ্টা করছে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হওয়ার।"

" আমাকে কেউ-কেউ বলেছিল যে তাহেরের (কর্নেল তাহের) একটা মিথ নিয়ে টিম-টিম করে জ্বলছিল জাসদ। আমি সে মিথটা ভেঙ্গে দিয়েছি। এজন্য তাদের অনেকের অনেক রাগ। কিন্তু আমরা কথা হচ্ছে যে জাসদ ঐ সময়ে কী করেছিল সেটা ১০ বছর, ২০ বছর বা ৫০ বছর পরের প্রজন্ম তো জানতে চাইবে।... অনেকে মনে করেন, আমার এ তথ্যগুলো এবং বিশ্লেষণগুলো তাদের বর্তমান নষ্ট করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতও ঝরঝরে করে দিচ্ছে।"

মি: আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সবাই সবকিছু লিখতে চায় না।

কারণ তাতে কোন একটি পক্ষের রোষানলে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ভবিষ্যতের পাঠকরা তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে সে বিষয়টিকে সবসময় গুরুত্ব দেন মি: আহমেদ।

তিনি আশা করেন ইতিহাসের মানদণ্ডে তাঁর লেখাগুলো পাঠকদের কাছে টিকে থাকবে।

মি: আহমেদ বলেন তিনি তাঁর বইতে প্রতিটি তথ্য এবং সাক্ষাৎকারের সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র উল্লেখ করেন। সেজন্য সে কেউ চাইলে বিষয়গুলো সহজে যাচাই করে নিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক দলের ইতিহাস লিখলেও মহিউদ্দিন আহমেদ অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন মি: আহমেদ।

তাঁর বাবা একজন সরকারী কর্মকর্তা এবং মা ছিলেন স্কুল শিক্ষক।

কয়েকটি স্কুলে পড়াশুনার পর মি: আহমেদ ১৯৬১ সালে ৫ম শ্রেণিতে ভর্তি হন ঢাকার গভর্মেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে।

সেখান থেকে এসএসসি পাশ করার পর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

এরপর ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে মি: আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর আগে তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে যোগ দেন।

মি: আহমেদ বলেন, ছাত্র জীবনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখার প্রতি আগ্রহী হয়েছেন।

এক্ষেত্রে তিনি গবেষণার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করাকে গুরুত্ব দেন। ১৯৭২-১৯৭৫ সালের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে তিনি এখন লিখছেন ।

মি: আহমদ মনে করেন, ইতিহাসকে এমনভাবে লিখতে হবে যেখানে তথ্যকে গল্পের মতো করে উপস্থাপন করা দরকার।

তাহলে পাঠকরা ইতিহাস-ভিত্তিক বই পড়তে আগ্রহী হবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কাছে মনে হয় ইতিহাস লিখতে গিয়ে সবসময় বস্তুনিষ্ঠ হওয়া খুব কঠিন কাজ।

মি: আহমদ বলেন, " আসলে আমাদের তো বলবো যে সেই ইউরোপীয় মন নাই। আমরা অবজেক্টিভ (বস্তুনিষ্ঠ) হতে পারি না অনেক ক্ষেত্রে।আমরা আবেগ প্রবণ তো। আমি যখন লিখি তখন চেষ্টা করি সৎ থাকার জন্য।.... একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন রাজাকার মারে, এটার বর্ণনা আমি যেভাবে দিব, একজন রাজাকার যখন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মারে, ঐ টার বর্ণনা হয়তো আমি ওভাবে দিব না। এখানে একটা বায়াস (পক্ষপাত) কাজ করে। এটা হয়তো আমি ইহ জিন্দেগিতে কাটাতে পারবো না। এখানে কতগুলো ব্যাপার আছে।"

সম্পর্কিত বিষয়