রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় বাংলাদেশের বৌদ্ধরা ক্ষুব্ধ

রোহিঙ্গা সংকটের ছবি ছবির কপিরাইট Dan Kitwood

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন ও সেনা অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করছে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়।

মিয়ানমার একটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ এবং একটি বড় অভিযোগ রয়েছে যে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনে শামিল হয়েছে সেখানকার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও।

কিন্তু এটা কোনোভাবেই বৌদ্ধ ধর্মের মূল নীতির সাথে যায় না উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা, ধর্মগুরু ও সাধারণ সদস্যরা।

ঢাকার পূর্বভাগে মেরুল বাড্ডার একটি সুপরিচিত বৌদ্ধ মন্দির, ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার।

মূল সড়কের পাশে মন্দিরটির বিরাট একটি ফটক। ফটকটি তালাবদ্ধ। পাশ দিয়ে একটি গলি চলে গেছে, সেদিক দিয়েই ঢুকতে হবে, ভেতরের দিকে রয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি ফটক। কিন্তু সেদিক দিয়ে প্রবেশ করতেও পুলিশি বাধা।

এখানে সড়কের মুখে পুলিশের একটি সাঁজোয়া যান রাখা। রাস্তায় বেরিকেড সৃষ্টি করা। আর পুলিশের সশস্ত্র টহলতো রয়েছেই।

জিজ্ঞাসা করতে এই টহল দলটির প্রধান জানালেন, মিয়ানমারে চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সপ্তাহ দুয়েক ধরে তারা এখানে এই নিরাপত্তা চৌকি বসিয়েছেন।

"সরকারের তরফ থেকে আমরা তাদেরকে নিরাপত্তা দিচ্ছি", বলছিলেন টহল দলটির নেতা।

পুলিশি তল্লাশী পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়বে একটি টিন দিয়ে ছাওয়া ভবন। এটিই মন্দির। পাশেই তৈরি হচ্ছে নতুন বহুতল বিশিষ্ট দালান।

নির্মাণ কাজ শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম সেখানেই চলে যাবে বলে কথা।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
কেন বেশিরভাগ বার্মিজ নিজেদেের ওপর হুমকি আছে বলে মনে করে?
Image caption বৌদ্ধদের জন্য নির্মিত ভবনের সামনে নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁজোয়া যান

এই ভবনেরই একটি কামরায় বসে কথা হলো মন্দিরের ভান্তে বা অধ্যক্ষ ধর্মমিত্র মহাথেরোর সঙ্গে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর নির্যাতন ইস্যুতে তার কি অভিমত?

"মিয়ানমার একটি বৌদ্ধ জাতি। কিন্তু তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ নয়। বৌদ্ধ ধর্ম হতে পারে কিন্তু তাদের ভাষা আলাদা সংস্কৃতি আলাদা"।

"সবার মধ্যেই ভালো মন্দ আছে। চিন্তা চেতনাতো সবার একরকম নয়। সেখানে যেটা হচ্ছে তাতে আমরা খুশী নই"

ধর্মমিত্র মহাথেরো বলছেন, তারা স্পষ্টতই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর চলমান সহিংসতা সমর্থন করছেন না।

কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাধারণ নাগরিকদের মনোভাব কী?

Image caption অশোক বড়ুয়া

ঢাকায় যে হাজার পাঁচেক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর বসবাস, তার মধ্যে ষাট পয়ষট্টিটির মতো পরিবার বাস করে এই মেরুল বাড্ডাতেই, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের অনতিদূরে ডিআইটি প্রজেক্টে।

গৃহবধু ষিটু বড়ুয়া মুন্নী বলছিলেন, "বার্মাতে ওটা কি কারণে হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে কিন্তু আমরা জানিও না। কিন্তু বার্মা সরকার যেটা করতেছে, রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার, সেটা আমরা মানিনা। আমরা ওগুলা সমর্থন করিনা"।

এই এলাকারই বাসিন্দা এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় মহিলা মধুমিতা বড়ুয়া বলছেন, "আমরা তো এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। একটা মশা মারতেও আমাদের অনেক চিন্তা ভাবনা, মনেই আসে না। আমরা এটাকে ধিক্কার জানাই। অবিলম্বে যেন এটা বন্ধ হয়ে যায় এবং যত দ্রুত সম্ভব যেন তাদের সসম্মানে ওখানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়"।

কথাবার্তা বলে জানা যাচ্ছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা এখন এককাট্টা। সম্প্রদায়ের যত সংগঠন রয়েছে সবগুলো এরই মধ্যে একীভূত হয়ে বাংলাদেশের সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজ নামে একটি জোট গঠন করেছে, যেটির মুখ্য সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন অশোক বড়ুয়া।

তারা এরই মধ্যে এই ইস্যুতে মানববন্ধণ ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন,ঢাকায় মিয়ানমারের দূতের সাথে দেখা করে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন, রবিবারও তাদের একটি সংবাদ সম্মেলন রয়েছে বলে তারা জানাচ্ছেন।

Image caption ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের ভান্তে বা অধ্যক্ষ ধর্মমিত্র মহাথেরো

কিন্তু তাহলে বৌদ্ধদের মন্দিরের সামনে পুলিশী নিরাপত্তা বাড়াতে হচ্ছে কেন।

ফিরে আসি আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে, সেটির প্রবেশ মুখেই শুধু নয়, ফটকের ভেতরেও একটি তল্লাশী চৌকি বসিয়ে পুলিশ অবস্থান নিয়েছে। নারী পুলিশও রয়েছেন কয়েকজন। এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন, জানতে চেয়েছিলাম বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় একজন নেতা অশোক বড়ুয়ার কাছে।

মিয়ানমারের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কয়েকজন ভিক্ষুকে হেনস্থার কয়েকটি পৃথক ঘটনা উল্লেখ করে বৌদ্ধদের নেতা অশোক বড়ুয়া বলছেন, এসব ঘটনা কোন কোন ক্ষেত্রে এই সমপ্রদায়ের কিছু সদস্যরে মধ্যে একধরণের নিরাপত্তাহীনতা বোধ সৃষ্টি করেছে।

এসব কারণেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সম্পর্কিত বিষয়