ভারতে এখনো কেন 'সুপুত্র' হয়, 'সুকন্যা' কেন হয়না?

মালবী গুপ্ত ছবির কপিরাইট মালবী গুপ্ত

আগেকার দিনে প্রায়শই 'শত পুত্রের জননী হও', বলে প্রবীণারা মেয়েদের আশীর্বাদ করতেন। তবে সেটা সত্য হলে যে মেয়েদের পক্ষে আদৌ তা আশীর্বাদ হয়ে উঠত না, একথা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমার মনে হয় এক মহাভারতের গান্ধারীর উদাহরণই বোধহয় এই ব্যাপারে যথেষ্ট। যিনি শতপুত্রের জননী হয়েও একটি সন্তানকেও বাঁচাতে পারেননি। কৌরব বংশ ধ্বংসই হয়ে গিয়েছিল পুত্রদের নানান কৃতকর্মের ফলে।

সেকথা যাক, এখন অবশ্য শত পুত্র না বললেও 'সুপুত্রের জননী হও' অনেকেই বলে থাকেন। কিন্তু ভুলেও কখনও কেউ বলেন কি 'সুকন্যার জননী হও'? যেন সন্তান মানেই এক অমোঘ অনিবার্যতায় কেবল পুত্রই হওয়ার কথা।

তাই বোধহয় এক সন্তান কাঙ্ক্ষিত অনেক বাবা মা'ই প্রথমে পুত্র সন্তান জন্মালে - যাক বাবা আর দরকার নেই বলে নিশ্চিন্ত হন। কন্যা হলে অবশ্য এক বা একাধিক বার অনেক মা'কেই গর্ভধারণ করতে হয়।

আর প্রথমেই মেয়ে এবং তারপরেও পর পর মেয়ে হতে থাকলে বাধ্য হয়ে যাঁদের বহুপ্রসবা হতে হয় পুত্রের আশায়, তাঁদের তো মতামত কোনও কালেই গ্রাহ্যই হয় নি, এখনও হয় না।

প্রসঙ্গত, মনে পড়ছে প্রায় এক দশক আগে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে বিবিসি বাংলা রেডিও'র জন্য একটি ধারাবাহিক করতে গিয়ে এই ব্যাপারে কিছু অভিজ্ঞতার কথা। তখন দেখেছি, বেশিরভাগ গর্ভবতী বা আসন্নপ্রসবারা পুত্র কামনা করছেন।

মনে পড়ছে ছয়টি কন্যার জননীর অসম্ভব রুগ্ন করুণ মুখটি। যিনি বার বার কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে মরমে মরে ছিলেন। তাঁর নিরাপত্তার অভাবও বোধ ছিল। কারণ মেয়ে যে বোঝা, মেয়ে যে দায়।

ছবির কপিরাইট PRAKASH SINGH/AFP
Image caption ভারতে নারী: পুত্র সন্তানের দাবি মেটাতে না পারায় একই সঙ্গে মা ও মেয়েকেও এখনও অবর্ণনীয় অত্যাচারের শিকার হতে হচ্ছে।

তাই অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের দাবি মেটাতে সপ্তম বারেরটি অন্তত ছেলে হোক। না হলে যে তাঁর গর্ভধারণ থেকে মুক্তি নেই। জানি না শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই মুক্তি ঘটেছিল কি না।

আমার মনে হয় প্রায় নিরানব্বই শতাংশ নারীর মনস্কামনাতেও পুত্রের বদলে কন্যা সন্তানের কোনও ছবিই ফুটে ওঠে না। এই মানসিকতার পেছনে একটা আর্থ-সামাজিক কারণ নিশ্চয়ই আছে।

তবে সাধারণত সচেতন কখনও বা অবচেতন মনেও অনেক সময়ই এই ভাবনা কাজ করে যে, বুড়ো বয়সে ছেলেই দেখবে। মেয়ে তো চলে যাবে অন্য পরিবারে। তাছাড়া বংশ রক্ষাও তো করবে ওই ছেলেই।

তাই পুত্রের জন্ম দেওয়া তথা বংশধর নিয়ে আসার মধ্যে যেন এক গর্ব প্রচ্ছন্ন থাকে নারীর মনেও। এবং 'স্বর্গে বাতি দেওয়া'র সেই বংশধর, পরিবারকে উপহার দিতে পারার মধ্যে কোথাও যেন এক অদৃশ্য অহংকারও তার কাজ করে।

এই মনোভাব শুধু নিরক্ষর বাবা মা'র চেতনাতেই যে ঘা মারে তেমনটা নয়। বরং সেই গণ্ডী পেরিয়ে তার ডালপালা সমাজের নিম্ন, মধ্য ও উচ্চবিত্ত জনমানসেও রীতিমতো পল্লবিত। এবং বাংলার অসংখ্য গ্রামে এবং শহরেও ‍এই ছবি এখনও তত বদলায়নি।

সে দেশে, 'বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও', কিম্বা 'কন্যাশ্রী', যে নামে যত প্রকল্পই হোক না কেন, কন্যা সন্তান সম্পর্কে মানসিকতায় আজও ভারতবর্ষ আছে ভারতবর্ষেই, বাংলা আছে বাংলা'তেই।

মনে হয় সেই ট্র্যাডিশন যেন সমানে চলেছে।

তাই তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে বা অকারণেও মেয়েদের শুধু মারই নয়, একেবারে মেরেই ফেলা যায় অনায়াসে।

ছবির কপিরাইট NARINDER NANU/AFP
Image caption কন্যা শিশু বাঁচাতে ভারতীয় শিশুর আহ্বান: শত প্রতিবাদ সত্ত্বেও মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে না।

অবশ্য অকারণ কেন বলছি? মেয়ে হয়ে জন্মানোই তো তার সবচেয়ে বড় কারণ। ঠিক সেই কারণেই তো ঝাড়গ্রামের রঘুনাথ সিংহ তার তিন বছরের 'মেয়ে হয়ে জন্মেছিল বলেই মৌসুমিকে মেরে ফেলেছে', গলা টিপে।

সে কথা স্বীকার করতেও তার কোনও লজ্জা বোধ হয়নি, দুঃখ হয়নি এবং কোনও অপরাধ বোধও তার জাগেনি।

রঘুনাথের মতো অবশ্য অনেকের কাছেই কন্যাদের প্রাণ সবথেকে মূল্যহীন, সবথেকে হেলাফেলার। সে প্রাণ থাকলেই কী, গেলেই বা কী। তাই সদ্যজাতকে কাপড়ে মুড়ে বা ব্যাগে পুরে রাস্তায় কিম্বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায়।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই তাকে মেরে ফেলাও যায় শুধু মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে। এমনকি জন্মের আগেই যদি জানা যায় মায়ের গর্ভে ক্রমশ বড় হতে থাকা ভ্রূণটি ছেলে নয় মেয়ে, তাহলে ভ্রূণাবস্থাতেই তাকে নিকেশ করে দেওয়া যায়। ( বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)

সেক্স ডিটেকশন আমাদের দেশে আইনত নিষিদ্ধ হলেও এবং ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ ও শুধু লিঙ্গের কারণে(পড়ুন কন্যা ভ্রূণ) ভ্রূণ হত্যা যতই অনৈতিক, অবৈধ হোক না কেন, ভারতে গত কয়েক বছরে এর রমরম করে ১০০০ কোটিরও বেশি ব্যবসা চলছে।

কিন্তু পুত্র সন্তানের দাবি মেটাতে না পারার অপরাধে একই সঙ্গে মা ও মেয়েকেও এখনও যে অবর্ণনীয় অত্যাচারের শিকার হতে হচ্ছে, যেভাবে নৃশংসতার বলি হতে হচ্ছে - তা কোনও সভ্য সমাজে ঘটে বলে আমার মনে হয় না।

এবং আশ্চর্য এই যে, বহু কাঙ্ক্ষিত, পরম স্নেহে লালিত পুত্রই যখন শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে ক্রমে পুরুষ হয়ে উঠছে, সেই তখন নানা ভাবে স্ত্রী, মেয়ে কখনও মাকেও নির্যাতন করছে।

তবু পুত্র সন্তানের কামনায় কিন্তু ভাঁটা পড়ছে না।

ছবির কপিরাইট NARINDER NANU/AFP
Image caption কন্যা ভ্রূণ হত্যা যতই অবৈধ হোক না কেন, ভারতে এর ১০০০ কোটি রুপিরও বেশি রমরমা ব্যবসা চলছে।

এটাও আশ্চর্য যে, স্বর্গে বা নরকে বাতি দেওয়ার জন্য যে সব বাবা মায়েরা আজও ছেলে ছেলে করে হেদিয়ে মরছেন, ছেলে না হলে বংশ রক্ষার চিন্তায় যাঁদের ঘুম হচ্ছে না তাঁরাও অনেকেই ছেলের নির্মম অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।

বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া, এমনকি বিষয় সম্পত্তি দখলের জন্য ছেলের হাতে বাবা, মা'র খুন হওয়ার ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে।

মধ্য দিল্লির করল বাগে ৭৫ বছরের কুসুমলতার কথা আমার মনে পড়ছে। যাকে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে তাঁর ছেলে গাজিয়াবাদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছিল।

সেখানকার যে হোমে অনেক প্রবীণার সঙ্গে কুসুমলতাও আশ্রয় পেয়েছেন, আমার তাঁদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে - এখনও কি তাঁরা মনে করেন এইসব 'সুপুত্র'দের দিয়ে তাঁদের বংশ রক্ষাটা খুব জরুরি?

সম্পর্কিত বিষয়