চব্বিশ বছরের যুবক কেন গুজরাটে 'বিজেপির ত্রাস'?

ছবির কপিরাইট SAM PANTHAKY
Image caption সাংবাদিক বৈঠকে হার্দিক প্যাটেল

ভারতের গুজরাটে চলতি নির্বাচনে মাত্র চব্বিশ বছরের এক যুবক ভোট-রাজনীতির অনেক অঙ্ক উল্টে দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে - আর তার নাম হার্দিক প্যাটেল।

বছরদুয়েক আগেও তার নাম কেউ শোনেনি বললেই চলে, অথচ রাজ্যের প্রভাবশালী পাটিদার সমাজের জন্য চাকরিতে সংরক্ষণের দাবিকে সামনে রেখে হার্দিক প্যাটেল শাসক বিজেপিকে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, পাটিদার ভোটের বড় একটা অংশ সত্যিই যদি তার দিকে ঝোঁকে তাহলে রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় ফেরা বেশ কঠিন হয়ে উঠবে।

কিন্তু রাজনীতিতে একেবারেই অনভিজ্ঞ, এত অল্প বয়সী এই তরুণ কীভাবে গুজরাটে বিজেপির মতো পোড়খাওয়া দলকেও এভাবে বেগ দিতে পারছেন?

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

সিনেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে সৌদি আরব

এক দেশে প্রায় ৬০ কোটি সিসিটিভি ক্যামেরা

পূর্ব জেরুসালমকে ফিলিস্তিনের রাজধানীর স্বীকৃতি দিন: আরব লিগ

হারাম আল-শরিফ কেন এত স্পর্শকাতর একটি স্থান

ছবির কপিরাইট Hardikpatel.club
Image caption গুজরাটে হার্দিক প্যাটেলের রোড শো

গুজরাটের রাজধানী গান্ধীনগরের কাছে মানসা-তে হার্দিক প্যাটেলের জনসভা লোকে লোকারণ্য। বয়স পঁচিশ বছরও হয়নি বলে নিজে এবার ভোটে লড়তে পারছেন না, কিন্তু ভোটের মুখে তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটা সেক্স ভিডিও ঠিকই বাজারে চলে এসেছে।

হার্দিক অস্বীকার পর্যন্ত করেননি যে ভিডিওর লোকটি তিনি নন, কিন্তু বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন এই বলে যে এই সব নোংরামো বাদ দিয়ে আসল নির্বাচনী ইস্যু নিয়ে কথা বলুন!

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের আদর্শে নতুন গুজরাট বানানোর স্বপ্ন বেচছেন এই যে যুবক, রাজ্যের রাজনীতিতে তার চমকপ্রদ আবির্ভাব দুবছর আগের আগস্টে, পাতিদারদের জন্য সংরক্ষণের দাবিতে আহমেদাবাদে এক জনসভার মধ্যে দিয়ে।

সেই সভার পর পুলিশ গ্রেফতার করে হার্দিক প্যাটেলকে, রাজ্য জুড়ে পরবর্তী হিংসায় অন্তত ১৪জন মারা যান - আর রাতারাতি নায়ক হয়ে ওঠেন তখন সবেমাত্র বাইশে পা-রাখা ওই তরুণ।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption হার্দিক প্যাটেলের বাড়ির দাওয়ায় বসে তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন

গুজরাটের ভিরামগামের কাছে হার্দিক প্যাটেলের পৈতৃক বসতবাড়ি যেখানে, সেই চন্দননগরি গ্রামে হার্দিক এখন পাটিদার তথা প্যাটেলদের জন্য আশা-ভরসার প্রতীক।

গ্রামের প্রবীণ কৃষক বিপিন প্যাটেলের যুক্তি, "সমাজের উঁচু জাত পাটিদারদের হাতে এখন আর কোনও চাষের জমি অবশিষ্ট নেই, আর অন্যের ক্ষেতে গিয়ে মজুরি খাটাও তাদের শোভা পায় না।"

ফলে তিনি মনে করেন সরকারি চাকরিতে প্যাটেলদের সংরক্ষণ দিতেই হবে - যেটা হার্দিকের প্রধান দাবি।

পাশ থেকে হার্দিকের নিজের চাচা কানচম প্যাটেল যোগ করেন, "জমি থাকবে কী করে - বাবার দশ বিঘে জমি পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হলে এক একজনের কপালে কী আর জোটে?"

Image caption হার্দিকের পৈতৃক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রিয় ট্রাক্টর

এই গ্রামে কারও সংশয় নেই, হার্দিক সত্যের পক্ষে কথা বলছেন - ন্যায্য দাবি তুলছেন, তাই তার জয় নিশ্চিত।

চন্দননগরিতে হার্দিক প্যাটেলের পাড়া প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয়রা প্রায় সবাই তুলাচাষী। কিন্তু চাষের কাজে যেহেতু আর ভবিষ্যৎ নেই, চাকরিই তাই ভরসা - হার্দিকের এই যুক্তিটাকে তাদের সবারই 'সাচ্চা কথা' বলে মনে হচ্ছে।

তবে মেহসানার বিজেপি-সমর্থক ব্যবসায়ী লালজিভাই পোপট বলছিলেন, "গুজরাটে নরেন্দ্র মোদির একটানা শাসনে এই রাজ্য ছিল একটা শান্তিপূর্ণ, নিস্তরঙ্গ পুকুরের মতো। সেখানে হার্দিক প্যাটেল একটা পাথর ছুঁড়ে ঢেউ তৈরি করেছেন।"

"আর যেহেতু চুপচাপ কোনও জায়গায় দুটো লোকের ঝগড়া হলেও লোকে তামাশা দেখতে জুটে যায়, তাই হার্দিকের কথা শুনতেও ভিড় হচ্ছে। কিন্তু এটা যে আসলে বাইশ বছরের বনবাস ঘোচাতে কংগ্রেসের কারসাজি, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption গুজরাটে বিরোধী কংগ্রেস দলের সদর দফতর

রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ হার্দিকের হাতে পুকুরে ছোঁড়ার জন্য পাথরটা হাতে তুলে দিয়েছিল কে, এ প্রশ্ন নিয়েও আলোড়ন চলছে।

বিজেপি বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, আসলে হার্দিকের আড়ালে বিরোধী কংগ্রেসই তার আন্দোলনে অর্থ ও সাহায্য জুগিয়ে এসেছে - আর ভোটের আগে দুপক্ষের হাত মেলানোতেই তা স্পষ্ট।

গুজরাট কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীশ দোশী অবশ্য যুক্তি দেন, হার্দিককে কেউ যদি নায়ক বানিয়ে থাকে তা হল বিজেপির অপশাসন।

তিনি বলছেন, "নবীন প্রজন্মের মধ্যে - বিশেষত পাটিদার সমাজে হার্দিক এমনি এমনি সাড়া ফেলেনি। ছোট ছোট অজস্র সভা করে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিজেপির দুর্নীতি, শিক্ষায় অব্যবস্থার মতো অজস্র ইস্যু ও তুলে ধরেছে।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption আহমেদাবাদে বিজেপির প্রধান নেতা কমলেশ প্যাটেল

"পাটিদাররা ভাবছে, যে বিজেপিকে আমরা ভোট-নোট দুইই দিয়েছিলাম, তারা আমাদের ওপর আজ লাঠি-গুলি চালাচ্ছে, তাদের একটা শিক্ষা দিতেই হবে।"

অল্ট নিউজ পোর্টালের সম্পাদক, আহমেদাবাদের প্রতীক সিনহাও মনে করেন, হার্দিককে নিয়ে বিজেপি বেশ নার্ভাস, তার কারণ এই যুবক গুজরাটে বিজেপির সমর্থনের মূল ভিতটা ধরে নাড়া দিয়েছেন।

মি সিনহা বিবিসিকে বলছিলেন, পাটিদাররা বহু বহু বছর ধরে বিজেপির সমর্থক। বিগত সরকারেও বিজেপির প্রায় চল্লিশজন পাটিদার এমএলএ ছিলেন। কিন্তু এখন যে হার্দিকের সমর্থনে তাদের এত লোক বাইরে বেরিয়ে আসছেন তাতে বোঝা যায় রাজ্যের বাস্তবতায় কোথাও একটা বড় গন্ডগোল আছে - সমাজের সবচেয়ে সম্পন্ন ও প্রভাবশালী শ্রেণীও সরকারি চাকরিতে বিশেষ সুবিধা চাইছে।

ছবির কপিরাইট অল্ট নিউজ
Image caption প্রতীক সিনহা, অল্ট নিউজের প্রতিষ্ঠাতা

"পাটিদাররা আর্থিকভাবে বেশ ধনী। তাদের মধ্যে বহু অনাবাসী যেমন আছেন, তেমনি গুজরাটে ভূমি সংস্কারের সুফলও পেয়েছিলেন এই পাটিদাররাই। সেই তারাই যখন আজ বলছেন আমাদের চাষাবাদ ব্যর্থ হচ্ছে, আমাদের সরকারি চাকরি চাই -অথচ কোনও নতুন চাকরিই নেই - তখন বোঝা যায় গুজরাট মডেলের আসলে কী অবস্থা", বলছিলেন মি সিনহা।

উন্নয়নের এই মডেলে সমাজের সবচেয়ে সম্পন্ন অংশেরই ক্ষোভ যদি এত তীব্র হয়, তাহলে বাকিদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

আহমেদাবাদের বিজেপি প্রধান কমলেশ প্যাটেল অবশ্য নিশ্চিত, তার ভাষায় হার্দিকের ধোঁকাবাজি ঠিক ধরা পড়ে যাবে।

তিনি জানাচ্ছেন, "শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরেই থাকত হার্দিক - একসঙ্গে আমরা সর্দার প্যাটেল গ্রুপও করতাম, খুব ভাল করে চিনি ওকে। আগে কী ছিল, এখন কী হয়েছে সেটাও ভাল করে জানি। একটা কথা স্পষ্ট - পাটিদারদের যা দাবি তা বিজেপির চেয়ে বেশি কেউ পূরণ করতে পারবে না, কাজেই কংগ্রেস হার্দিকবাবাকে কী ভুল বুঝিয়েছে সেটা তারাই জানে।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption গুজরাট ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্সের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মুকেশ খটিক

তবে এটা ঠিক, গত দুআড়াই বছরে হার্দিক প্যাটেলের অন্দোলনে নানা অরাজনৈতিক মহল থেকেও টাকাপয়সা, সমর্থন এসেছে। কিন্তু তবু এর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব নিশ্চিত নন গুজরাট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুকেশ খটিক।

অধ্যাপক খটিক বলছেন, "পাটিদারদের বিভিন্ন প্রভাবশালী ধর্মীয় সংগঠন ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল বলেই এত কম বয়সে হার্দিক নেতা হতে পারে - এমন কী পাটিদারদের দুই অংশ, লেউভা ও কাড়ভাদেরও কাছাকাছি আনতে পারে। কিন্তু ওর সংরক্ষণের দাবিতে কিছু মৌলিক সমস্যা আছে, কীভাবে তার রূপায়ন হবে সেটা মোটেও স্পষ্ট নয় - কাজেই এই আন্দোলন সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলেই আমার ধারণা।"

২০১৭র গুজরাটের নির্বাচনের পর হার্দিক প্যাটেল রাজ্য রাজনীতিতে আদৌ প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবেন কি না, সেটা অন্য প্রশ্ন - কিন্তু তাকে চান বা না-চান, গুজরাটের ভোটে এই নবাগত যুবককে কেউ যে উপেক্ষা করতে পারছেন না সেটা কিন্তু দেখাই যাচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

গুজরাটে কি নরেন্দ্র মোদি চাপের মুখে?

গুজরাটে হিন্দুত্বের লড়াইয়ে মুসলিমরা কোণঠাসা

সম্পর্কিত বিষয়