মাহমুদুর রহমান বেনু
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

অস্ত্র নিয়ে লড়াই করার বদলে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন যে শিল্পী

মাহমুদুর রহমান বেনুর সঙ্গীত জীবন শুরু হয়েছিল ঢাকায় অনেক কম বয়সে।

কিন্তু ২৫শে মার্চ ১৯৭১ তার জীবনের মোড় পুরো ঘুরিয়ে দেয়।

পাকিস্তানি বাহিনীর ঢাকায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ তাকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ করে তোলে যে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়াই করতে যাবেন, দেশের জন্য প্রাণ দেবেন।

"আমার ৭৫ বছরের জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল ওই নয়টি মাস," বলেন মি: রহমান।

বলেন একটা আবেগের বশে যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য মনস্থির করেছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক।

সীমান্তে তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে একত্রিত হচ্ছেন সবাই।

মাহমুদুর রহমান বেনু ঠিক করলেন যুদ্ধে যাবেন।

"কিন্তু কোথায় যাব, কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে, কোথায় যুদ্ধ করা শিখব, কিছু তো জানি না। জীবনে কোন দিন একটা মাছিও মারি নি।"

২৫শে মার্চ সিদ্ধান্ত নেওয়ার তিন সপ্তাহ পর ১৪ই এপ্রিল মেহেরপুরের কাছে বেতাই ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম লেখান মাহমুদুর রহমান বেনু।

"কিছুদিন পর ফর্মালি, আরও সাংগঠনিকভাবে ট্রেনিংএর জন্য আমাকে পাঠানো হল পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোলে। সেখানে তখন ছিলেন তার ক্যাপ্টেন হাফিজ- আমার ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন উনি ।"

তার সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তার এক ভাইয়ের ছেলে।

''খবর পেলাম সে সম্পূর্ণরূপে প্রশিক্ষণ না নিয়েই যুদ্ধে চলে গেছে আর ফ্রন্টে গিয়ে অস্ত্রসহ পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে।"

''ভাবলাম তার বাবাকে খবরটা দেওয়া উচিত। ঢাকা যেতে হবে। কিন্তু ক্যাপ্টেন অনুমতি দিলেন না। বললেন এটা কি ছেলেখেলা। যুদ্ধে আবেগ চলে না। ''

''কিন্তু ওর বাবা আমার কাছে তার ছেলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তানি সেনা বাহিনির উচ্চ পর্যায়ের লোকজনকে চিনতেন। মনে হল তিনি ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করতে চাইবেন। করেছিলেনও। এবং সফল হয়েছিলেন।''

তবে মি: রহমানকে তার কমান্ডিং কর্মকর্তা বলেছিলেন, ''তুমি যদি যাও তুমি একজন পালিয়ে যাওয়া সৈনিক হিসাবে চিহ্ণিত হবে। এর শাস্তি মৃত্যু।''

তারপরেও বড়ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে তিনি ঢাকায় ফিরে যান। এরপর তিনি আবার রওনা হন ভারতের উদ্দেশ্যে। সেখানেই তার অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ইতি।

ভারত যাওয়ার পথে একজন বাঙালি সেনা অফিসার তাকে একটি ছবি দেখিয়ে বলেছিলেন তিনি সহ তাদের দলের কয়েকজনকে পাকিস্তানি বাহিনি খুঁজছে। কারণ তারা ২৩শে মার্চ ৭১ শহীদ মিনারে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের দেখলেই হত্যা করবে। দলেরই এক সহ-শিল্পী যার সঙ্গে তার বিয়ে হবার কথাই ছিল, তাকে তড়িঘড়ি বিয়ে করে ফেলেন এবং তাকে নিয়ে চলে যান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গে র কলকাতায় গিয়ে ওয়াহিদুল হক, সানজিদা খাতুন এদের সঙ্গে গড়ে তোলেন মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা। তিনি ছিলেন তার সাধারণ সম্পাদক।

এই সংস্থার পক্ষ থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরে এবং শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াতেন - লক্ষ্য তাদের অনুপ্রেরণা জোগানো।

"প্রতিদিন প্রায় সাতটা ক্যাম্পে গান গাইতাম- প্রতি ক্যাম্পে ডজনখানেক গান - প্রায় ৮৪টা গান প্রতিদিন গাওয়ার পর সন্ধ্যেয় গলার আর কিছু বাকি থাকত না। "

"ইণ্ডিয়ান রিহ্যাবিলিটেশন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাসে করে ঘুরতাম। ওরা লাঞ্চ দিত- দু পিস রুটি, একটা কলা আর একটা সিদ্ধ ডিম।"

তারা যখন ঘুরে ঘুরে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান করতেন তখন তাদের গান করার রেকর্ডিং করেছিলেন লিয়ার লেভিন আর রিচার্ড লেভিন বলে দুই আমেরিকান। তারা মানুষের ওপর অত্যাচার অবিচার নিয়ে মূলত ছবি করতেন।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ থামার পরে চলচ্চিত্র বানানো। কিন্তু অর্থাভাবে সে কাজ তারা আর করে উঠতে পারেন নি।

"ওটাই মুক্তির গান। ওই ফুটেজ পরে কিনে নেন আমার এক ভাই তারেক মাসুদ ও তার স্ত্রী ক্যাথরিন। "

তারা পরে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসাবে তৈরি করেন মুক্তির গান প্রামাণ্য চিত্রটি।

ইংল্যান্ডে তিনি চলে আসেন ১৯৭৩ সালে। ঘটনাক্রমে এখানেই থেকে যান।

এখনও তিনি সঙ্গীত চর্চ্চা করছেন। শুধু তার পরবর্তী প্রজন্মকে সঙ্গীত শিক্ষা দেন নি, এমনকি তার শিক্ষকতায় বাংলা গান শিখেছেন বহু ইংরেজ।

সম্পর্কিত বিষয়