ভারতে চার বিচারপতির সংবাদ সম্মেলনে কি একটা সংকট তৈরি হয়েছে?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

যে চারজন বিচারক গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে অভূতপূর্বভাবে সুপ্রীম কোর্টের কাজকর্ম, বিশেষত প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক কাজ নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম বিচারপতি রঞ্জন গগই কলকাতায় আজ মন্তব্য করেছেন যে ওই ঘটনায় কোনও সঙ্কট তৈরী হয় নি।

কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে আলোড়ন চলছে। কাজটা ঠিক হয়েছে কিনা তা নিয়ে সংবিধান ও আইনবিশেষজ্ঞদের মধ্যেও চলছে বিতর্ক।

তবে বিচারপতি রঞ্জন গগই ছাড়াও আরেক বিচারপতি কুরিয়ান যোশেফও কেরালায় নিজের বাড়িতে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন যে তাঁরা শুধুমাত্র বিচারব্যবস্থার স্বার্থেই ওই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন।

মি. যোশেফ এ-ও আশা প্রকাশ করেন যে তাদের তোলা বিষয়গুলির সমাধান হয়ে যাবে।

ওদিকে ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে ভেনুগোপালও আশা প্রকাশ করেছেন যে সোমবার সকালের মধ্যেই মিটে যাবে ওই দ্বন্দ্ব।

চার বিচারপতির অভূতপূর্ব সংবাদ সম্মেলন এবং সেখানে দেশের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে বলে করা মন্তব্য সংক্রান্ত খবরাখবরই আজ দ্বিতীয় দিনের মতো ভারতের সংবাদমাধ্যমে শীর্ষ খবর হিসাবে রয়েছে।

সেখানে যেমন শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলন সংক্রান্ত খবর ছাপা হচ্ছে, তেমনই প্রকাশিত হয়েছে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রকে কেন্দ্র করে কিছু পুরোনো বিতর্কের কথাও।

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র সেই আশির দশকে যখন ওড়িশা হাইকোর্টের আইনজীবি ছিলেন, সেই সময়ে তাঁকে কেন্দ্র করে একটি দুর্নীতির প্রসঙ্গ যেমন ছাপা হয়েছে, তেমনই লেখা হয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে তাঁর কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের সংঘাত থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তিনি একটি বিশেষ মামলা নিজের বেঞ্চে শুনানীর জন্য গ্রহণ করেছিলেন, সেই কথাও।

এছাড়াও কর্ণাটক হাইকোর্টের এক বিচারপতিকে কীভাবে অন্তত দুবার দুটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হওয়ার ঠিক আগে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল, সেই ইতিহাসও তুলে এনেছে ভারতের সংবাদপত্রগুলি।

তবে পার্শ্ব প্রতিবেদন হিসাবে সব থেকে বেশী উঠে এসেছে মুম্বাইয়ের একটি বিশেষ আদালতের বিচারক বি এইচ লয়ার মৃত্যুর ঘটনা।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনেই এক প্রশ্নের জবাবে চার বিচারপতির অন্যতম, রঞ্জন গগই বলেছিলেন যে এই সমস্যার মধ্যে রয়েছে বিচারপতি লয়ার মৃত্যুর ঘটনা সংক্রান্ত বিষয়ও।

মি. লয়ার আদালতেই সোহরাবুদ্দিন ভুয়ো এনকাউন্টার মামলা চলছিল, যেখানে গুজরাতের বেশ কয়েকজন পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গেই নাম উঠে এসেছিল বি জে পি-র প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ-র নামও।

মি. শাহকে আদালতে ব্যক্তিগত হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওই বিচারক। তার আগেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সম্প্রতি একটি পত্রিকার তদন্তমূলক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

ওই বিচারকের মৃত্যু নিয়ে সুপ্রীম কোর্টেই মামলাও দায়ের হয়েছে।

অন্যদিকে চার বিচারপতি সুপ্রীম কোর্টের প্রশাসন এবং মামলার বিলিবন্টন নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন, তা নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের বার এসোসিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ঠিক করেছে তারা গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলির সুষ্ঠু বিলিবন্টনের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে ভেনুগোপাল আশা প্রকাশ করেছেন যে সপ্তাহান্তের অবকাশের শেষে সোমবার সকালেই সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে আবারও ঐকমত্য দেখতে পাওয়া যাবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি জানিয়েছেন, হয়তো রবিবার প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র ওই চার সিনিয়র বিচারকের সঙ্গে বৈঠকে বসে সমস্যাগুলির সমাধান করার চেষ্টা করবেন।

তবে সুপ্রীম কোর্টের চার বরিষ্ঠ বিচারপতির ওই সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতানৈক্য প্রকাশ্যে এসেছে। অনেকেই বলছেন, বিচারব্যবস্থার অভ্যন্তরীন বিষয় প্রকাশ্যে আনা অনুচিত - নোংরা কাপড় নিজের ঘরের ভেতরেই কাচা উচিত ছিল।

সুপ্রীম কোর্টের বার এসোসিয়েশনের সভাপতি বিকাশ সিং আজ বিকেলের সংগঠনের বৈঠকের আগে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত জানাতে গিয়ে বলছিলেন, "তাঁরা যদি সংবাদ সম্মেলনই করবেন, তাহলে তাঁদের বক্তব্যে সারগর্ভ কিছু থাকা উচিত ছিল। মানুষের মনে কিছু সন্দেহ তৈরী করে দেওয়াতে বিচারব্যবস্থার আখেরে কোনও লাভ হবে না। তাঁদের আরও ভাবনাচিন্তা করে সংবাদসম্মেলন করা উচিত ছিল - কিন্তু যা হয়েছে, তা হল মানুষকে নানারকম অনুমান করে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।"

আবার প্রবীন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও লোকসভার অবসরপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল সুভাষ কাশ্যপের কথায়, "বিচারব্যবস্থা যে কোনও গণতন্ত্রের অন্তিম স্তম্ভ। এখন মনে হচ্ছে সেই বিচারব্যবস্থাও কেঁপে উঠছে, যেন ভেঙ্গে পড়বে যে কোনও সময়ে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে মোটেই শুভ সময় নয়। কিন্তু যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা এই কারণে জরুরী, যে কী এমন হল যে চারজন বরিষ্ঠতম বিচারপতিকে সর্বসমক্ষে বিষয়টা নিয়ে আসতে হল।"

প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক কাজকর্ম - বিশেষত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা, যেগুলি দেশের ওপরে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, সেগুলি তাঁর পছন্দের বেঞ্চে বা বিচারকের কাছে পাঠানো নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন সুপ্রীম কোর্টের চারজন বরিষ্ঠতম বিচারক, তা নিয়ে সরকার বা ক্ষমতাসীন বিজেপি এখনও কোনও মন্তব্য করে নি।

কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এ নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছেন, "বিচারপতিরা উল্লেখ করেছেন, যে গণতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়েছে, সেই বিষয়টা অতি গুরুত্ব সহকারে দেখা দরকার। তাঁরা বিচারক লয়ার মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করেছেন - এটার তদন্ত হওয়া দরকার। সুপ্রীম কোর্টের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই বিষয়টা দেখা দরকার।"

আবার সি পি আই এমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির কথায়, "ভারতীয় বিচারব্যবস্থার স্বাতন্ত্র আর নিরপেক্ষতা এমনই একটা বিষয়, যা নিয়ে কোনও দরকষাকষি চলতে পারে না। এ নিয়ে যে কোনও সমস্যারই খুব দ্রুত সমাধান দরকার।

"আর সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব শুধু বিচারব্যবস্থার নয়, গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ - সরকার, আইনসভা এবং বিচারব্যবস্থা - তিনটেকে যৌথভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে" - বলেন মি. ইয়েচুরি।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

যে মেয়ে শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যায় উত্তাল পাকিস্তান

নির্বাচনকালীন সরকারে 'বিএনপির জায়গা হবে না'

ট্রাম্পের 'শিটহোল' শব্দটি নিয়ে সাংবাদিকদের বিড়ম্বনা

ভালো ঘুমের জন্য মধ্যযুগের সাতটি উপায়

মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে সেদিন বঙ্গভবনে যান জেনারেল মইন

সম্পর্কিত বিষয়