ওরু আদর লাভ: ভারতে মুসলিমদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ মালয়ালম গানের বিরুদ্ধে

ভুরু নাচিয়ে চোখ মারছেন প্রিয়া প্রকাশ ওয়ারিয়ার।
Image caption ভুরু নাচিয়ে চোখ মারছেন প্রিয়া প্রকাশ ওয়ারিয়ার।

একটি দক্ষিণ ভারতীয় ছবির গান মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়েছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন এক ব্যক্তি।

'মাণিক্কিয়া মালারায়্যা পূভি' নামের ওই গানটির একটি টিজার কয়েকদিন আগে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হওয়ার পরে তা ভাইরাল হয়ে গেছে।

'ওরু আদার লাভ' নামের মালয়লাম ছবিটিতে ওই বিশেষ গানটির চলচ্চিত্রায়ন করেছেন যে অষ্টাদশী অভিনেত্রী, সেই প্রিয়া প্রকাশ ওয়ারিয়ার এখন ভারতের নতুন ইন্টারনেট সেনসেশন হয়ে উঠেছেন মাত্র তিন চার দিনের মধ্যেই।

গানের একটি জায়গায় দেখা যাচ্ছে প্রিয়া তারই স্কুলের সহপাঠীকে ভুরু নাচিয়ে চোখ মারছেন।

ইন্টারনেটে গানটির যে সিকোয়েন্স টীজার হিসাবে দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে একটি কো-এডুকেশন স্কুলের অনুষ্ঠানে গানটি গাইছেন এক শিল্পী। আর হলে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রীরা সেটা মন দিয়ে শুনছে।

হঠাৎই এক ছাত্রীর চোখ পড়ে যে তার দিকে তাকিয়ে আছে বয়সে এক বছরের বড় এক ছাত্র - শুধুমাত্র ভুরু নাচিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ভাব বিনিময় হয় দুজনের মধ্যে।

তারপরে মেয়েটি - যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন ১৮ বছর বয়সী নতুন অভিনেত্রী প্রিয়া ওয়ারিয়ার, সে ওই ছাত্রের দিকে চোখ মারছে।

Image caption সহপাঠীর চরিত্রে রোশন আব্দুল

মেয়েটির ঠোট টেপা হাসি, আর ছাত্রটি আনন্দে এতটাই আত্মহারা যে সে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।

ছবিটির পরিচালক ওমর লুলু বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "গানের শটটা যে এত জনপ্রিয় হয়ে যাবে, আশা করি নি। প্রচুর মানুষের ভাল লেগেছে, তারা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুধু যে গানের সিকোয়েন্সটা মানুষ শেয়ার করছেন, তা নয়। এই সংক্রান্ত খবরও শেয়ার হচ্ছে।"

"আবার লোকে প্রিয়ার ওই ভুরু নাচানো আর চোখ মারার দৃশ্যটা নিয়ে জিফ বানিয়েছে।"

"শুটিংয়ের সময়ে কিন্তু আগে থেকে এরকম চিত্রায়ন করা হবে সেটা ভাবা হয় নি। ওদের শুধু বলেছিলাম খুব কিউট, মিষ্টি একটা শট দিতে। প্রিয়া আর রোশন আব্দুল - ওরা নিজেরাই এটা করেছে," বলছিলেন ছবিটির পরিচালক ওমর লুলু।

এই গানের সিকোয়েন্স নিয়ে আপত্তি তুলেছে মুসলমান সমাজের একাংশ।

তাদের মধ্যে একজন হায়দরাবাদ পুলিশে কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন, যে গানটির চিত্রায়নের ফলে মুসলমান হিসাবে তাঁর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে।

যে ফালাকনামা থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে, সেই হায়দ্রাবাদ সাউথ ডিভিশনের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ভি সত্যনারায়না বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "মুকিথ খান নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন যে ওই মালয়ালম ছবির একটি গানে এমন কিছু শব্দ আছে, যা তার ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছে।"

ছবির কপিরাইট Omar Lulu
Image caption ওমর লুলু, পরিচালক।

"তিনি বলেছেন যে গানটিতে ইসলামের নবী এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজার প্রসঙ্গ আছে, কিন্তু ওই প্রসঙ্গের ওপরেই যে ছবি দেখানো হয়েছে, তা অনুচিত। গানটির অনুবাদ জানার পরে তিনি এটা বুঝতে পেরেছেন বলেও আমাদের জানিয়েছেন অভিযোগকারী।"

মি. সত্যনারায়না বলছিলেন, আইন অনুযায়ী ছবিটির পরিচালককে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। খতিয়ে দেখা হবে যে আসলে গানটিতে কী আছে এবং সেটা আদৌ কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে কী না।

হায়দরাবাদের বাসিন্দা মুকিথ খানও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গানের শব্দ নিয়ে তার আপত্তি নেই। কিন্তু ওই কথার ওপরে যেভাবে একটি প্রেমের দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যেখানে একটি মেয়ে একটি ছেলেকে চোখ মারছে, সেটিতেই তার আপত্তি।

মানিক্যিয়া মালারায়্যা পূভী গানটি ১৯৭৮ সালে রচিত হলেও পরিচালক ওমর লুলু বলছিলেন, কেরালার মালাবার অঞ্চলে এটি বহুল প্রচলিত। সব ধর্মের মানুষই এই গানটা শুভ অনুষ্ঠানে গেয়ে থাকেন।

"আমি তো ছোট থেকেই গানটা শুনছি মায়ের কাছে। এই গানে যে নবী এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজার প্রসঙ্গ আছে সেটাও জানি। তবে গানের কথায় এমন কিছু নেই যাতে কারও আবেগে আঘাত লাগে। নবী বা খাদিজাকে নিয়ে কোনও অসম্মানসূচক কিছু নেই। অন্তত নিজে একজন মুসলমান হিসাবে আমার ধর্মীয় অনুভূতিতে তো আঘাত লাগে নি," বলছিলেন ওমর লুলু।

এই গানটি নিয়ে অভিযোগের মধ্যেও অবশ্য ১৮ বছর বয়সী বিকম প্রথম বর্ষের ছাত্র অভিনেত্রী প্রিয়া ওয়ারিয়ারের জনপ্রিয়তা থেমে নেই। গানটি মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ইউটিউবে এক কোটি মানুষ দেখে ফেলেছেন.. ইনস্টাগ্রামে প্রিয়ার ফলোয়ার ছুঁয়েছে ২৫ লক্ষ আর টুইটারে সেটা ৬০,০০০।

যেভাবে ভাইরাল হলো ওরু আদর লাভের টিজার

কয়েক সেকেন্ডের শট - ঢেউ তুলে ভুরু নাচানো - আর তারপরে? সহপাঠির দিকে তাকিয়ে তার বাঁচোখটা বন্ধ হয়ে গেল। ইংরেজিতে বলে উইঙ্ক, আর বাংলায় চোখ মারা।

আর সেটাই ভ্যালেন্টাইনস ডে-র আগে ঢেউ তুলে দিয়েছে হাজার হাজার যুবকের মনে!

ইন্টারনেটে সবথেকে বেশী সার্চ করা হচ্ছে যে চোখের অধিকারিণীকে। গুগলে শুধু প্রিয়া টাইপ করলেই চলে আসছে সেই ঢেউ তোলা ছবি।

এঁর নাম প্রিয়া। ভারতের নতুন সেন্সেশন।

Image caption প্রিয়া প্রকাশ ওয়ারিয়ার, নৃত্য শিল্পী।

বয়স ১৮। কেরালার থ্রিসূর শহরের বাসিন্দা প্রিয়া। পুরো নাম প্রিয়া প্রকাশ ওয়ারিয়ার।

থ্রিসূরেরই একটি কলেজে বিকম পড়ছেন তিনি। প্রথম বর্ষের ছাত্রী।

বহুদিন ধরেই ক্ল্যাসিকাল নাচ শিখেছেন। আজকাল শেখেন গানও।

আগে দু'একটা শর্ট ফিল্ম করেছেন, আর সেই সুবাদেই ওরু আদর লাভের জন্য অডিশন দিতে গিয়েছিলেন - যদি ছোটখাটো কোনও রোল পান, সেই আশায়।

পরিচালক ওমর লুলু বলছিলেন, স্ক্রীনটেস্ট দেখেই মনে হয়েছিল এ নতুন কিছু করবে। শুধু প্রিয়া নয়, ওর সহপাঠীর চরিত্রে যে অভিনয় করেছে, সেই রোশন আব্দুলও এসেছিল ছোট কোনও রোল করতেই।

ওদের দুজনের অডিশন দেখেই আরও কয়েকজন স্কুল ছাত্রছাত্রীর সঙ্গেই প্রিয়া আর রোশনকেও নেওয়া হয় মূল চরিত্রে।

ওরু আদার লাভ- ই সেই অর্থে প্রিয়া ওয়ারিয়ারের প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি।

ওমর লুলুও এর আগে মাত্রই কয়েকটি ছবি করেছেন, কিন্তু এর মধ্যেই তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন প্রচুর।

তিনি বলছিলেন, "গানটার শুটিংয়ের সময়ে আগে থেকে ওদের কিছু নির্দেশ দিই নি। শুধু চেয়েছিলাম খুব কিউট একটা কিছু করুক ওরা। নিজেদের মতো করে কয়েকটা শট দিয়েছিল, কিন্তু এটাই আমাদের সবার পছন্দ হয়।"

প্রিয়া আর তার সহ অভিনেতা রোশনের এখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা। অন্য একটি ছবির শুটিং চলছে, তার মধ্যেই সমানে আসছে সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাতকারের অনুরোধ।

কখনও দুজনকে পাওয়া যাচ্ছে, কখনও শুধুই 'প্রিয়া'কে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে সাংবাদিকদের।

এরকমই একটি সাক্ষাতকারে প্রিয়া বলেছেন, "ওই চোখ মারার দৃশ্যটা আগে থেকে ভেবে কিছু করি নি। ইন্সট্যান্টলি হয়ে গেছে। ভুরু নাচানোর অভ্যাসটা ছিল নাচ শেখার সুবাদে। তবে একটা বিষয় মাথায় ছিল যে আমি বেশ বোল্ড একটা মুভ করতে যাচ্ছি। কারণ আমাদের সমাজে তো মেয়েরা কোনও ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ মারে না!! কিন্তু আমার মনে হল শুধু ছেলেরাই বা কেন মজাটা করবে। মেয়েরাও যে চোখ মারতে পারে, সেটাই অভিনয় করি আমি।"

টিভি সাক্ষাতকারগুলোতে অবধারিতভাবে প্রিয়াকে অথবা রোশন-প্রিয়া জুটিকে ওই ভুরুতে (এবং বহু যুবকের বুকেও) ঢেউ তোলা আর তারপরে চোখ মেরে দেখানোটা অভিনয় করতে হচ্ছে।

আজ সকালে উঠেই ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে সব ছেলেদের (এবং নতুন পাওয়া ভক্তকুলকে) ভালবাসার দিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অষ্টাদশী সেন্সেশন প্রিয়া।

সম্পর্কিত বিষয়