ট্রাষ্ট ব্যাংককে ঘিরে বিতর্ক

মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণের ধারণা থেকে যে ব্যাংকের শুরু, শেষপর্যন্ত তা হয়েছে সামরিকবাহিনীর ব্যাংক৻ আর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রয়োজনে রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছিলো যে প্রতিষ্ঠান সেটি হলো ট্রাষ্ট ব্যাংক৻

ট্রাষ্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তা হচ্ছে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট৻ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের নিয়ন্ত্রণ তার ট্রাষ্টি বোর্ডের হলেও তার কার্য্যকর নিয়ন্ত্রণ মূলত সেনাসদরে কেন্দ্রীভূত৻ আর, সেকারণে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের বিনিয়োগ, তার উৎস, সম্পদ কিম্বা আয়-ব্যায়ের হিসাব – এসব তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে হলেও সংস্থার মালিকানায় ষাট শতাংশ শেয়ার থাকার পরও ট্রাষ্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার সুযোগ এখন অনেকটাই সীমিত ৻

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

অবশ্য, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রয়োজনে ট্রাষ্ট ব্যাংক ন্যূনতম যেটুকু তথ্য প্রকাশে বাধ্য হয়েছিলো তার কারণেই তৈরী হয় এক নতুন বিতর্ক৻ ২০০৭ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনী যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নেপথ্য থেকে পরিচালনা করছিলো বলে বলা হয়ে থাকে সেসময়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে সফররত অবস্থায় টেলিফোনে বিবিসি বাংলাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন৻

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য ট্রাষ্ট ব্যাংকের যে প্রস্পেক্টাস প্রকাশিত হয় তাতে দেখা গেলো ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁর ঋণের যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে তাঁতে তাঁর গৃহনির্মাণ ঋন ছিলো ২০০৫ সালে নিরানব্বুই লক্ষ টাকা এবং ২০০৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে তেত্রিশ লাখ টাকায়৻

ব্যাংকের নিরীক্ষাকৃত হিসাবটিতে ব্যাংকের সব পরিচালক - যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন কর্মরত সেনাকর্মকর্তা এবং শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক প্রাতষ্ঠান সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রত্যয়ন করা ছিলো৻ সঙ্গত কারণেই তাই অভিযোগ ঊঠলো যে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ যেহেতু একবছরে ছেষট্টি লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেছেন সেহেতু ঐ টাকার উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রয়োজন৻ জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ তখন বিবিসিকে বলেন যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে ম্যালাইন করার জন্য অপপ্রচার করা হচ্ছে৻ করাপ্ট যাঁরা আছে তাঁদের সঙ্গে এক কাতারে তাঁকে দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে ৻

Image caption সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ

জেনারেল আহমেদ বলেন যেএক কোটি টাকা তিনি কোনদিনই ব্যাংক থেকে লোন নেননি - এটা টোটালি ফলস৻ আর, দ্বিতীয়ত - ষাট লক্ষ্ টাকা তিনি ফেরৎও দেননি৻ এইটাও ফলস৻

জেনারেল আহমেদ বলেন যে ট্রাষ্ট ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী আর্মি অফিসার যতোটুকু লোন পায় আমি ঠিক ততোটুকুই পেয়েছি৻ তার চেয়ে এক টাকাও বেশী নয়৻

জেনারেল আহমেদ আরো বলেন যে হাউজ বিল্ডিংয়ে আমরা পেতে পারি সব্বোর্চ্চ পঁচিশ লাখ টাকা আর পেনশন কমিউট করে আরো দশ লাখ টাকা - টোটাল পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা৻ আর আমি যে রিটার্ণ করছি - আমি বাড়ী ভাড়া যা পাই তার সবটাই আমি দিয়ে দিচ্ছি৻

অবশ্য ট্রাষ্ট ব্যাংকের ঐ প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত নিরীক্ষাকৃত হিসাব ভূল ছিলো - এমন কথা কেউই দাবী করেন নি৻

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যাংকটির ঐবছরের অডিটর প্রতিষ্ঠান - এ সি এন এ বি আই এন, ব্যাংকটির শেয়ারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলো যে প্রতিষ্ঠান – সেই এএএ কনসালটেন্টস এন্ড ফিনান্সিয়াল এডভাইজারস কিম্বা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কেউই ঐ প্রসপেক্টাসের তথ্যকে বেঠিক বলে নি৻

অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের যাঁর সাথেই কথা বলেছি তাঁরা সবাই র্নিদ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েছেন যে সেনাবাহিনীর কোন পদস্থ কর্মকর্তার কোন প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা - বিশেষ করে বাণিজ্যিক কার্য্যক্রমে সংশ্লিষ্টতার কারণে - সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিরই ভাবমূর্তি ও মর্য্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে৻

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ থেকে ফৌজি কল্যাণ

এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ইতিহাস একটু দীর্ঘ৻ এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগের সাথে জড়িতদের একজন হলেন সাবেক এডজুটেন্ট জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী৻

জেনারেল চৌধুরী বলেন যে প্রাইভেট ব্যাংকের পারমিশন দেওয়া শুরু হওয়ার সময়, তিনি ছিলেন ডিফেন্স মিনিষ্ট্রিতে – এবং তখন আঁকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের এমডি পদে বদলি করা হয়৻

জেনারেল চৌধুরী বলেন যে সেই সময় থেকে ১৯৮৭ সালে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের জন্য একটা আলাদা ব্যাংক করার পরিকল্পনা হাতে নেন৻ ১৯৮৮ -৮৯ সালে এর নীতিগত অনুমোদন পাওয়া যায়৻

তিনি জানান যে সেই সময় মাত্র চব্বিশ ঘন্টার নোটিশে তাঁকে ট্রাষ্ট থেকে অন্যজায়গায় বদলি করা হয়৻

জেনারেল চৌধুরী বলেন যে আমি তখন ভাবলাম যে ব্যাংকের মতো একটা স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের যদি আমি ঠিকমতো ব্যবস্থা করতে না পারি তাহলে ভবিষ্যতে তা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে৻ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের জন্য আমরা যে মেমোরেন্ডাম অব এসেসিয়েশন এবং আর্টিকেলস অব এসোসিয়েশন তৈরী করেছিলাম সেগুলো আমি রাতারাতি তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল আতিকের কাছে হস্তান্তর করলাম৻ লাইসেন্সটা এভাবেই তখন সেনাপ্রধানের কাছে দেওয়া হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের সব শেয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে দেই৻

জেনারেল চৌধুরী বলেন যে এরপর তিনি আবার যখন ৯২ নালে সেনাসদরে ফিরে যান – তখন দেখেন যে ঐ ব্যাংকের লাইসেন্স তখনও সেনাসদরে পড়ে আছে৻ এরপর তিনি তা বাস্তবায়নের কাজে আবার হাত দেন৻

ট্রাষ্ট ব্যাংক সেনাবাহিনীর জন্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন তাঁরা কেন অনুভব করেছিলেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল চৌধুরী বলেন প্রথমত সেনা কল্যাণ সংস্থার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ব্যাংকিং সেবা প্রয়োজন হতো সেটা মেটানো এবং অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালুর কথা চিন্তা করেই এই ব্যাংকের কথা ভাবা হয়৻

ট্রাষ্ট ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে এবং প্রাথমিক র্পয্যায়ে এর পরিশোধিত মূলধন ছিলো কুড়ি কোটি টাকা৻

পর্য্যায়ক্রমে অবশ্য ব্যাংকের অনুমোদিত মুলধন এবং পরিশোধিত মুলধনের পরিমাণ বেড়েছে৻ পুঁজিবাজার থেকে নতুন পুঁজিরও বিনিয়োগ হয়েছে এই ব্যাংকে৻

ট্রাষ্ট ব্যাংকের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ৩১ শে মার্চ ২০০৮ এ ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ হচ্ছে দুশো কোটি টাকা এবং এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ১১৬ কোটি টাকারও বেশী৻

Image caption দিলখুশায় ট্রাষ্ট ব্যাংকের কর্পোরেট অফিস

ঐ সময়ে ব্যাংকটির সারাদেশে শাখা ছিলো ৩৮টি৻ ঐ বছরেই ব্যাংকটি রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে তার মুলধনের পরিমাণ বাড়ায় এবং তা গিয়ে দাঁড়ায় ১৫৪ কোটি টাকায়৻

২০০৮ এর বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৭ এ ব্যাংকটির মুনাফা ছিলো প্রায় চব্বিশ কোটি টাকার মতো এবং ২০০৮ এ তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ছেচল্লিশ কোটি টাকা৻

প্রথমদিকে ব্যাংকটির কার্য্যক্রম যদিও ছিলো সেনানিবাসকেন্দ্রিক - এখন তারা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পৌছানোর কৌশল অনুসরণ করছে৻

বেসরকারী খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা

তবে, দেশের প্রায় অর্ধশত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতায় ট্রাষ্ট ব্যাংক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে নিয়ে তা প্রশ্নসাপেক্ষ৻ সেরকমটিই বলছিলেন বেসরকারী একটি ব্যাংকের পরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বারের সাবেক সভাপতি সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী৻

মি এলাহী বলেন যে ব্যাংকের সিক্সটি ফাইভ পারসেন্ট কিন্তু এখন প্রাইভেট ব্যাংকগুলো কন্ট্রোল করে - দশ বছর আগেও যেটা ছিলো না৻ ন্যাশনালাইজড ব্যাংকগুলো তা করতো৻

তিনি জানান, বর্তমানে যে হারে প্রাইভেট সেক্টরে গ্রোথ হচ্ছে তাতে তাঁর মনে হয়না - সেই রেটে আর্মির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রোথ হচ্ছে৻

মি এলাহী বলেন যে তিনি তাদেরকে প্রাইভেট সেক্টরের জন্য কোন প্রতিদ্বন্দী মনে করেন না৻ প্রাইভেট সেক্টরের সাথে আর্মির প্রতিষ্ঠান কতোটা প্রতিযোগিতা করতে পারবে - তাতে তাঁর সন্দেহ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন৻

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলোকে যখন বেসরকারীকরণের কথা বলছে সরকার তখন বিভিন্ন বাহিনীর জন্য সরকারের পৃষ্টপোষকতায় এবং অর্থায়নে আলাদা ব্যাংক করার যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়৻

দুই বাহিনীর দুই ব্যাংকে দুই রকম চিত্র

সেনাবাহিনীর মতো সরকার আরো একটি বাহিনীর জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলো যার অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়৻ এটি হচ্ছে আনসার - ভিডিপি ব্যাংক৻

বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআরের জন্যও একইধরণের একটি ব্যায়ক প্রতিষ্ঠার সিন্ধান্ত সরকার নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করে রাখলেও বিষয়টি নানাকারণে এখনও বাস্তাবায়িত হয় নি৻

আনসার - ভিডিপি ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো আনসার সদস্যদের নানা অভাব-অভিযোগ দূর করতে তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া৻ আনসার-ভিডিপির এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো আনসার-বিদ্রোহের পর৻

আনসার ভিডিপি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মোহাম্মদ নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন যে সারা দেশে যে প্রায় ছাপান্ন লক্ষ আনসার - ভিডিপি সদস্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৻ মাইক্রো ক্রেডিট কর্মসূচী দিয়ে এই আনসার ভিডিপি ব্যাংকের কার্য্যক্রম শুরু৻

মি চৌধুরী বলেন যে প্রথমে পরিকল্পনা ছিলো প্রত্যেকটি উপজেলায় একটি করে শাখা হবে৻ কিন্তু, দূভার্গ্যজনক হলেও সত্য যে গত বারো তেরো বছরে এটার ছিলো ৮১টি শাখা - আর গত একবছরে তাঁরা আরো উনিশটি শাখা খুলেছেন৻

২০০৮ সাল পর্য্যন্ত এর একটা মাত্র প্রোডাক্ট ছিলো - ক্ষুদ্র ঋণ - যা অনেক এনজিও দিয়ে থাকে উল্লেখ করে তিনি জানান যে এখন আরো কয়েকটি প্রোডাক্ট তাঁরা চালু করেছেন - যেমন কনজিউমার ঋণ, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পে ঋণ, এস এম ই ইত্যাদি৻

আনসার ভিডিপি ব্যাংক ব্যাংকিং কোম্পানী আইনে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় কোনরকম বাণিজ্যিক ব্যাংকিং করতে পারছে না৻

মি চৌধুরী বলেন যে মনে হতে পারে আনসার ভিডিপি ব্যাংক আনসার বাহিনীর একটা ব্যাংক এবং ট্রাষ্ট ব্যাংক সেনাবাহিনীর আরেকটা ব্যাংক৻ কিন্তু এক্টিভিটির দিক থেকে এখানে ডিফারেন্স আছে - যেমন আনসার ভিডিপির ব্যবসা - সদস্য কিম্বা বাইরে থেকে কোন ডিপোজিট তাঁরা নিতে পারেন না - আবার বাইরে কাউকে তাঁরা ঋণও দিতে পারেন না৻ কিন্তু, ট্রাষ্ট ব্যাংক সেখান থেকে বেরিযে গেছে - তারা যেহেতু শিডিউলড ব্যাংক -কর্মাশিয়াল ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স পেয়েছে৻

কার্যত আনসার-ভিডিপি ব্যাংক কাজ করছে একটি ক্রেডিট সোসাইটির মতো৻ অনুমোদিত মূলধনের যতোটা অংশ সরকার পরিশোধ করবে বলে কথা ছিলো শেষপর্য্যন্ত তার অর্ধেকটা দিয়েছে সরকার৻

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা

অন্যদিকে, ট্রাষ্ট ব্যাংক শুধু যে বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসাবে কাজ করছে তাই নয় - বরং তারা মার্চেন্ট ব্যাংক বা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসাবেও কাজ করার অনুমতি পেয়েছে৻ এছাড়া, বিশেষ রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার আলামতও এখানে স্পষ্ট৻ যেমন পাসপোর্টের ফি জমা নিয়ে সেই পাসপোর্ট ইস্যু করার ক্ষমতাও এই ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে৻

ট্রাষ্ট ব্যাংকের নবনিযুক্ত ব্যাবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার অবশ্য বলছেন যে কোনধরণের বিশেষ পৃষ্টপোষকতার ওপর ব্যাংকটি নির্ভরশীল নয়৻

শাহ আলম সারওয়ার বলেন যে আপনি যদি বলেন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায় - সেটা কিন্তু সেভাবে নয়৻ এই ব্যাংকের প্রথম রেজিষ্টার্ড অফিস ছিলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে - কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে কিন্তু এর কর্পোরেট অফিস চলে এসেছে বাণিজ্রিক কেন্দ্র দিলকুশাতে৻

তিনি বলেন তার মানে আমরা আর অন্যসব ব্যাংকের মতোই ব্যাংক৻ এটা হলো এক৻ দুই নম্বর হলো প্রাইভেট কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারী ব্যবসার প্রশ্নে যেসব রেষ্ট্রিক্শন আছে সেগুলো এই ব্যাংকের ওপরও এপ্লিকেবল৻ এবং যেকোন প্রতিষ্ঠানের যতো বড় বড় ব্যবসা আছে তাঁরা তার কোনটারই স্পেশাল প্রিভি নন৻

Image caption ডঃ আকবর আলী খান

মি সারওয়ার বলেন যে - সরকারী ব্যাংক - সোনালী ব্যাংক - লার্জেস্ট সার্ভিস প্রোভাইডার টু আর্মি বা আর্মড ফোর্সেস৻ সেই তুলনায় তাঁরা কোন পৃষ্টপোষকতা পান না৻

তবে, তিনি বলেন যে যেটা তাঁরা পান তা হোল একটা ইউনিক বোর্ড - যে বোর্ডটা একটা ইনিষ্টিটিউশনের প্রতিনিধিদের দ্বারা রিপ্রেজেন্টেড৻ সুতরাং, তাদের বিহ্যাভিরিয়াল প্যাটার্ণ, অর্গানাইজেশনাল ডিরেকশনটা লাইক এন ইনিষ্টিটিউশন৻ মি সারওয়ার বলেন যে দুভার্গ্যজনক হলেও তিনি বলতে বাধ্য হচ্ছেন যে প্রাইভেট সেক্টরের কোন ব্যাংকে এটা নেই৻ এখানে কোন ব্যাক্তিগত বা ইনিষ্টিটিউশনাল ইন্টারভেনশন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন৻

তবে, সরকারী কার্য্যবিধির বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রশাসনের সব্বোর্চ্চ পদে কাজ করেছেন সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিবদের একজন ড: আকবর আলী খান বলছেন যে পাসপোর্টের আবেদন এবং ফি গ্রহণের এই কাজ এভাবে একটি ব্যাংককে দেওয়া আইনসম্মত নয়৻

মি খান বলেন যে সরকারের যে প্রোকিউরমেন্ট গাইডলাইন আছে তাতে এধরণের ক্ষেত্রে টেন্ডার হওয়া উচিৎ ছিলো ওপেন টেন্ডার৻ ওপেন টেন্ডারে সবচেয়ে সস্তায় সবচেয়ে ভালো কাজ পাওয়া যেখানে সম্ভব ছিলো সেখানে তা দেওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিলো বলে মনে হয়৻

তবে, মি খান বলেন যে অনেকসময় সরকার তাড়াতাড়ি কোন কাজ করানোর জন্য কোন প্রতিষ্ঠানকে এধরণের কাজ দিতে পারে তবে তা স্বল্পসময়ের জন্য হতে হবে - কোন স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না৻

অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের মতো ট্রাষ্ট ব্যাংকের কার্য্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব একেবারেই নেই৻ সুতরাং, সেই দিক থেকে এখনও পর্য্যন্ত কোন মন্দ ঋণ বা কুঋণের ভার তাদের তাদের ঘাড়ে চাপেনি৻

অবশ্য, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হিসাবে লেনদেন বা মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় ইতোমধেই ব্যাংকটি কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছিলো৻

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে ব্যাংকটির পরিচালনায় সাধারণ শেয়ারধারীদের কাছে পরিচালকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা আইনগতভাবে থাকলেও বিশেষজ্ঞরা ষাট শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের হাতে থাকার কথা উল্লেখ করে বলছেন যে যেহেতু পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই হচ্ছেন সেনাবাহিনীর কর্মরত কর্মকর্তা এবং বোর্ডের চেয়ারম্যান সেনাপ্রধান নিজে - সেখানে সেনাসংস্কৃতির প্রভাব থাকাটাই স্বাভাবিক৻

ফৌজি বাণিজ্যের পঞ্চম পর্বে আমরা নজর দেবো সামরিকবাহিনীর ভূসম্পদ কীভাবে বিদেশী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনে ব্যবহৃত হচ্ছে সেদিকে৻

[‘ফৌজি বাণিজ্য‘ প্রামাণ্য ধারাবাহিকটি প্রচার করা হচ্ছে প্রতি শুক্রবার বিবিসি বাংলার সন্ধ্যে ও রাতের অধিবেশনে৻]

Image caption ট্রাষ্ট ব্যাংকের প্রসপেক্টাসে নিরীক্ষাকৃত হিসাবে ব্যাংকটির পরিচালকদের ঋণের বিবরণ
Image caption প্রসপেক্টাসে ট্রাষ্ট ব্যাংকের পরিচালকদের হলফনামার স্বাক্ষরের অংশ