সেনাবাহিনীর পথেই নৌবাহিনী

খূলনা শিপইয়ার্ডের ডকইয়ার্ড

বাংলাদেশ নৌবাহিনীও সেনাবাহিনীর মতোই উদ্যোগী হয়ে অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় খাতের জাহাজ নির্মাণ শিল্প৻

বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশকে জাহাজ নির্মাণ শিল্প যখন একটি দ্রুত বিকাশমান শিল্পখাত হিসাবে গড়ে উঠছিলো ঠিক তখনই দেশের সবচেয়ে পুরোনো শিপইয়ার্ডটি আস্তে আস্তে ধ্বংসের দিকে অধ:পতিত হচ্ছিলো৻

অন্যান্য রুগ্ন শিল্প বেসরকারীকরণ করা হলেও খুলনা শিপইয়ার্ডের ক্ষেত্রে দেখা গেল ব্যতিক্রম৻

বিরাষ্ট্রীয়করণের জন্য নির্ধারিত দুটি প্রতিষ্ঠান - বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী এবং বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট যেমন সেনাবাহিনীর আগ্রহে সরকার তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে ঠিক তেমনই নৌবাহিনী আগ্রহী হয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণভার সরকারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে৻

নৌবাহিনীর এই আগ্রহের প্রতিফলন পাওয়া যায় ৫ই মে ১৯৯৯-এ শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে:

‘সরকারের বেসরকারীকরণ নীতিমালার আওতায় প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারীকরণের তালিকাভূক্ত করা হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ইহাকে উজ্জীবিত ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার আগ্রহ ব্যক্ত করে৻‘

১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত খূলনা শিপউয়ার্ডের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় নব্বুই কোটি৻ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার প্রতিষ্ঠান হিসাবেও খুলনা শিপইয়ার্ড লাভজনক ছিলো৻

প্রতিষ্ঠানটি পরে অবশ্য রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়৻ তবে, নৌবাহিনী দায়িত্বগ্রহণের পর নৌবাহিনীর নিজস্ব জাহাজ ও নৌযানগুলোর মেরামত ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি তা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অন্যদের জন্যও জাহাজ বা নৌযান নিমার্ণের কাজ করছে৻

খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরী নৌবাহিনীর টাগবোট

এই শিপইয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর নৌবাহিনী তার নিজস্ব বাজেটের সাড়ে একষট্টি কোটি টাকাও বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটিতে৻

নৌবাহিনী অপর আরেকটি প্রতিষ্ঠানও সরাসরি পরিচালনা করে থাকে - যেটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড অব ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড৻ এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিকভিত্তিতে পরিচালনায় আগ্রহের কারণ সম্পর্কে নৌ সদরদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হলেও এবিষয়ে তাঁদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি৻

তবে, খুলনা শিপইয়ার্ডের একটি প্রকাশনায় প্রতিষ্ঠানটি নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় কীভাবে গেল তার একটি ভিন্নধরণের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে:

‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত জার্মান এবং ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এই শিপইয়ার্ড পরিচালনা করে আসছিলো৻ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ প্রতিষ্ঠানটি হস্তান্তর করা হয় বাংলাদেশ ষ্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন বা বিএসইসির কাছে৻ আশি সাল পর্যন্ত এটি পরিচালিত হতো সামান্য মুনাফায় - কিন্তু নব্বুইয়ের দশকে তা লোকসান করতে থাকে৻ পরে, সরকার তা বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৯৯ সালের তেসরা অক্টোবর সরকার তা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে৻ বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এটিকে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসাবে পরিচালনা করছে৻ ‘

নৌবাহিনীর এই প্রকল্প কতোটা মুনাফা করছে সেই তথ্য অবশ্য প্রকাশ করা হয় নি৻ এই প্রকল্পের প্রধান ক্রেতা অবশ্য নৌবাহিনী নিজে৻

এছাড়া, কোষ্টগার্ড, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ সংস্থা এবং কয়েকটি সরকারী প্রতিষ্ঠান এই শিপইয়ার্ড থেকে বিভিন্নধরনের উপকরণ এবং সেবা নিয়ে থাকে৻

নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান

কিন্তু, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতোটা তা প্রশ্নসাপেক্ষ৻ তবে, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের কথায় এটা স্পষ্ট যে খুলনা শিপইয়ার্ডের প্রতি রাষ্ট্রের আনুকূল্য যথেষ্ট৻

মি খান বলেন যে খুলনা শিপইয়ার্ড এবং নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড – এই দুটিই হলো মুলত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্প৻ এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো না৻ সরকার ‌এটি নেভিকে দেয় এবং পরবর্তীতে চলতি মূলধন হিসাবে নেভিকে একশো কোটি টাকা দেওয়া হয় এটা চালু করার জন্য ৻

মন্ত্রী বলেন যে এরপর সরকারের জাহাজগুলো – যেমন বি আই ডাব্লু টি সির চারটি জাহাজ এখন সেখানে মেরামতাধীন আছে৻ এগুলো তারা টেন্ডারের মাধ্যমেই নিয়েছে৻ তারা বাইরের কাজও করে৻

বাংলাদেশে বেসরকারী খাতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প এখন অনেকটাই সমৃদ্ধি অর্জন করেছে৻ আর এক্ষেত্রে অনেকটা পথিকৃৎ এর ভূমিকা হচ্ছে চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপইয়ার্ডের৻

এই বেসরকারি খাতের জাহাজ নির্মাতারা খুলনা শিপইয়ার্ডের চেয়ে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বিপণনে অনেক বেশী এগিয়ে৻

ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপইয়ার্ড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াৎ হোসেন প্রতিবেদকের সাথে

চট্টগ্রামের ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন যে - তাঁর প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের কাছ থেকে যেসব জাহাজ নির্মাণের আদেশ পেয়েছে তা পূরণ করতে তাঁদের এক হাজার শ্রমিককে আগামী তিনবছর একনাগাড়ে কাজ করতে হবে৻

মি হোসেন বলেন যে বাংলাদেশে স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য প্রায় দুশো ডকইয়ার্ড আছে৻ এরা লঞ্চ, কার্গোবাহী নৌযান তৈরী করে এবং পুরোনো জাহাজের মেরামত করে থাকে৻ আর উন্নতমানের জাহাজ তৈরীর ইয়ার্ড আছে মাত্র তিন চারটি যারা বিদেশে জাহাজ রপ্তানি করে থাকে৻

সাখাওয়াত হোসেন বলেন যে সরকারীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যারা গুণগত মান বজায় রাখে – খুলনা শিপইয়ার্ড - তবে তারা নিজেদের যেসব ছোট ছোট বোট তৈরী করতে হয় সেগুলো করে থাকে৻ মূলত তারা তাদের নিজেদের চাহিদাটা পূরণ করে থাকে৻

মি হোসেন বলেন যে বিদেশের বাজারে রপ্তানীর জন্য খুলনা শিপইয়ার্ড তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নয়৻

বিকাশমান বেসরকারি খাতের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠান শেষপর্যন্ত আবারো একটা রুগ্নশিল্পের রুপ লাভ করবে বলে আশংকা অনেকেরই৻

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে একধরণের ঐক্যমত্য দেখা যায় এই মর্মে যে তাঁরা সবাই মনে করেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সশস্ত্রবাহিনীর কাছে হস্তান্তর বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির পরিপন্থী এবং তা তাঁরা সমর্থন করেন না৻

ইট ইজ নট দ্য বিজনেস অব দ্য গর্ভণমেন্ট টু বি ইন বিজনেস৻ আর্মিরও বিজনেসে যুক্ত হওয়া উচিৎ না৻

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী

ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সাবেক সভাপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন যে তিনি সবসময়েই সরকারকে বলে এসেছেন যে ব্যবসা করার সরকারের কাজ নয় – ইট ইজ নট দ্য বিজনেস অব দ্য গর্ভণমেন্ট টু বি ইন বিজনেস৻

তিনি বলেন যে সামরিকবাহিনীর ক্ষেত্রেও আমার একই কথা৻ তাদের ব্যবসায় বা শিল্পে যাওয়া উচিৎ নয়৻ এটা একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ – তেমনি এখানে কোন স্বচ্ছ্বতাও নেই, জবাবদিহিতাও নেই৻

একই অভিমত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং সাবেক আমলা ডঃ আকবর আলী খানের৻ ডঃ খান বলেন যে ব্যবসায় অনেক ঝুঁকি থাকে৻ আর সেসব ঝুঁকি সামাল দিতে এসব বাহিনীর কন্টিনজেন্সি তহবিল ব্যবহার করা উচিৎ হবে না৻

ডঃ খান বলেন যে কোন বাহিনীকে এসব প্রতিষ্ঠান তখনই দেওয়া যায় যখন তারা শুধুমাত্র সামরিক সরঞ্জাম তৈরী করবে৻ কিন্তু, এর বাইরে অন্য কোন কারণে এগুলো তাদেরকে দেওয়া ঠিক হবে না৻ বরং, তখন বিবেচনা করা উচিৎ যে সম্পদের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবহার কী হতে পারে৻

রাষ্ট্রীয় অর্থে এধরণের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা যে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্যও সুখকর ছিলো না সেকথা উল্লেখ করে সেনাবাণিজ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবেক গবেষণা পরিচালক ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা বলছেন বাংলাদেশের জন্যও এধরণের পদক্ষেপ শুভ হবে না৻

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে সত্যি কথা বলতে কী এটা হবে একটা বিপর্যয়৻ তিনি বলেন যে আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি - আমি পাকিস্তান নৌবাহিনীর গবেষণা পরিচালক হিসাবে কাজ করেছি - আমার অভিজ্ঞতা বলে যে সামরিকবাহিনী মনে করে যে তারা প্রতিরক্ষা শিল্প চালাতে পারে - কিন্তু এটা তাদের ভুল ধারণা৻

খুলনা শিপইয়ার্ডের ডকে জাহাজ মেরামতের কাজ চলছে

ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে যখনই সেনাবাহিনী এধরণের শিল্পের দায়িত্ব নেই সাথে সাথে তাতে অদক্ষতা দানা বাঁধতে শুরু করে৻ করাচী শিপইয়ার্ডের কথাই ধরুন না কেন ? সশস্ত্রবাহিনী তার দায়িত্ব নেবার পর যে তার দক্ষতা বেড়েছে তা নয়৻ বরং, তার আগে করাচী শিপইয়ার্ড যখন বেসামরিক বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় ছিলো তখন তা আরো দক্ষতার সাথে চলছিলো৻

তিনি বলেন যে একই কথা বলা চলে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীর ক্ষেত্রে৻ আমার মনে হয় এটা খুব বাজে একটা প্রস্তাব৻

এধরণের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার পিছনে নীতিনির্ধারকদের যে মনস্তাত্ত্বিক একটা প্রভাব রয়েছে সেটা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের কথায় অনেকটাই স্পষ্ট৻

সামরিকবাহিনীর পরিচালনাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছ্বতা এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা কী ? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর সাথেই তা কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ? বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য যে সেনাসদস্যদের যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে তার কোন প্রভাব কী পড়ছে বিদ্যমান ব্যবস্থায়? এসব প্রসঙ্গ ফৌজি বাণিজ্যের আগামী পর্বে৻

[বিবিসি বাংলার প্রামাণ্য ধারাবাহিক, ফৌজি বাণিজ্য প্রচারিত হচ্ছে প্রতি শুক্রবার আমাদের সন্ধ্যে ও রাতের অধিবেশনে৻]

সর্বশেষ সংবাদ

অডিও খবর

ছবিতে সংবাদ

বিশেষ আয়োজন

BBC navigation

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻