BBC navigation

মণিপুরের বক্সার মেরি কম

সর্বশেষ আপডেট বৃহষ্পতিবার, 5 জুলাই, 2012 11:43 GMT 17:43 বাংলাদেশ সময়
mary kom indian boxer

লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে খেলাধুলোর সরঞ্জামের একটা দোকান – কিন্তু অনেক ঘেঁটেও একটা ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট কিছুতেই পছন্দ হচ্ছিল না মেরি কমের।

ছোটখাটো চেহারা, টেনেটুনে পাঁচ ফিট লম্বা মেরি কম অগত্যা বিরক্ত হয়ে দোকানের ফিটিং রুমের সামনের আয়নাতেই এক প্রস্ত শ্যাডো বক্সিং সেরে ফেললেন!

ভারতের প্রত্যন্ত রাজ্য মণিপুরের এই প্রতিভাবান মুষ্টিযোদ্ধা এসেছিলেন লন্ডন অলিম্পিকেরই একটা টেস্ট ইভেন্টে যোগ দিতে – আর সেই ফাঁকে শহরটাকে দুচোখ ভরে দেখে নেওয়ার সুযোগটাও যথারীতি ছাড়তে চাননি।

লন্ডনের চিরপরিচিত লালরঙা টেলিফোন বক্স থেকে মেরি কম বেরিয়ে আসছেন – স্বামী ওনলারকে দিয়ে এমন একটা ছবিও তোলালেন।

ট্যুরিস্ট কিয়স্ক থেকে একগাদা বিগ বেন-ওলা চাবির রিংও কিনলেন, মণিপুরে ফিরে বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিলি করবেন বলে!

"ডেভিড যদি ছোট্ট একটা ছেলে হয়ে গোলিয়াথের মতো বিরাট শক্তিশালী পুরুষকে হারাতে পারে, তাহলে আমরাই বা পারব না কেন?"

মেরি কম, ভারতের মণিপুর রাজ্যের বক্সার

দিনটা ছিল তার ৩০তম জন্মদিন, আর শীতের নরম রোদে যখন রাস্তার পাশে একটা ক্যাফেতে কুকি আর গরম কফি সহযোগে কমলা রঙের লোভনীয় চকোলেট টেবিলে সার্ভ করা হল মেরি কম বলেই ফেললেন, ‘অর্থনৈতিক অবরোধের জন্য মণিপুরে আমরা এ জিনিস পাই না!’

মণিপুরের সমস্যা

আসলে মেরি কমের নিজের রাজ্য মণিপুর ভারতের উপদ্রুত একটি প্রদেশ, যেখানে অন্তত তিরিশটি জঙ্গী গোষ্ঠী লড়াই চালাচ্ছে।

সদর হিলস এলাকায় এমনই এক বিরোধের জেরে মণিপুরে দুটি জাতীয় মহাসড়ক প্রায় চার মাস ধরে বন্ধ ছিল, প্রয়োজনীয় রসদ, খাবারদাবার, ওষুধ বা জ্বালানি - মণিপুরে কিছুই আসছিল না।

গত সেপ্টেম্বরে যখন মেরি লন্ডন গেমসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর পরিবারের প্রধান চিন্তা ছিল বাড়িঘর কীভাবে গরম রাখা হবে বা কী দিয়ে রান্না করা হবে!

মেরির চার বছর বয়সী দুই যমজ সন্তান, রেং পা আর নাই নাই তো পছন্দের আইসক্রিম না-পেয়ে ভীষণ মন খারাপ করে বসে ছিল!

লন্ডনের মতো একটা ব্যস্ত শহরে এত মানুষজন – অথচ বন্দুকধারী সেনা বা পুলিশ গিজগিজ করছে না, এই ব্যাপারটাই ভীষণ অবাক করছিল মেরি কম আর তাঁর স্বামী ওনলারকে।

আসলে মণিপুর থেকে এসে ব্যাপারটা অবাক করবেই – কারণ মণিপুরে বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ বা হত্যাকান্ড নিত্যদিনের ঘটনা, মাত্র বছরতিনেক আগে ওনলারের বাবাই খুন হয়েছিলেন বিদ্রোহী বন্দুকধারীদের হাতে।

মণিপুরের এই অস্থিরতা মেরি কমের জন্য প্রতিনিয়ত একটা দুশ্চিন্তার বিষয়, বক্সিং ম্যাচের জন্য তাঁর প্রস্তুতিও যে কারণে ব্যাহত হয় প্রায়শই।

তাঁর নিজের কথায়, ‘প্রতিবার যখন কোনও প্রতিযোগিতায় আমি বাইরে বা বিদেশে যাই, সব সময় ভাবি আমার পরিবার ঠিক আছে তো? বাচ্চাদের কিছু হল না তো?’

আসলে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে মণিপুর ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আঁচ খুব একটা পায়নি, আর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে।

mary kom indian boxer

মেরি কম

আরও একটা সমস্যা আছে – লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রীটে একটা ট্যাক্সি ধরার সময় যেটা নিয়ে মেরি ঠাট্টা করতেও ছাড়লেন না।

মেরি বলছিলেন, ‘আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিল ভারতীয় ; তাকে যখন বললাম আমরাও ভারত থেকে এসেছি – সে আয়নায় আমাদের দিকে একঝলক তাকিয়েই বলল, না তো – তোমরা তো চীনা!’

আসলে ভারতের প্রত্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মণিপুর একেবারে বর্মার সীমান্ত ঘেঁষে – আর সেখানকার বাসিন্দাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যও গড়পরতা ভারতীয়দের চেয়ে চীনা বা থাইদের সঙ্গেই বেশি মেলে!

মেরির আশা, অলিম্পিকে একটা পদক জিতলে গোটা ভারতের দৃষ্টি সে তার উপদ্রুত রাজ্যটির দিকে ফেরাতে পারবে – হয়তো বা সহিংসতার অবসানে তা নতুন সদিচ্ছার জন্ম দিতে পারবে।

দারিদ্রের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই

রাতে টেমসের ধারে যখন একদল মেয়ে লম্বা বিলাসবহুল লিমুজিন ভাড়া করে হইহই করতে করতে যাচ্ছে, মেরি আর ওনলার তো বলেই ফেলল ‘নিশ্চয় অনেক পয়সা ওদের!’

মেরি নিজে আসলে এসেছে খুবই গরিব একটা পরিবার থেকে। মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের এক জিমে তাঁর প্রথম কোচ বলছিলেন, ‘মনে আছে ও আসত একটা ছেঁড়া ট্র্যাকসুট পরে – কিন্তু ওই বয়সেই ছোট্ট মেয়েটার ইচ্ছাশক্তি ছিল সাঙ্ঘাতিক।’

মেরি সব সময়ই বিশ্বাস করে এসেছে খেলাধুলোই হল দারিদ্র থেকে মুক্তির পথ, আর রাজ্যের তরুণদের কাছে এই বার্তাটাই তিনি সব সময় পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।

বক্সিং ম্যাচে লড়ে নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে মেরি কম আগামী দিনের বক্সারদের জন্য গড়ে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব অ্যাকাডেমি।

১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরা সেই অ্যাকাডেমিতে মেরির কাছে প্রশিক্ষণ নেয় – তারা নিখরচায় থাকতে পারে মেরির নিজের বাড়িতেই।

অ্যাকাডেমির দৈনন্দিন রুটিনটা অবশ্য খুব কঠিন – প্রতিটা বাচ্চাকে ভোর সাড়ে চারটেয় উঠে পড়তে হয়, রোজ স্কুলে যাওয়ার আগে করতে হয় বেশ কয়েক ঘন্টার প্র্যাকটিস।

এই কঠোর পরিশ্রমের পরও বাচ্চাগুলো বলে, ‘এটা ক্লান্তিকর ঠিকই – কিন্তু একটা বিরাট সুযোগও তো বটে!’

আশ্চর্যজনকভাবে মণিপুর থেকে যত সংখ্যায় ভারতের সেরা অ্যাথলিটরা উঠে এসেছেন তা ভাবাই যায় না, অন্য যে কোনও রাজ্যের তুলনায় সংখ্যাটা অনেক বেশি।

"মণিপুর যদি একটা ধনী, সমৃদ্ধ রাজ্য হত তাহলে কিন্তু এখানকার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলোয় এত ভাল করতে পারত না।"

মেরি কম

মেরি কম মণিপুরের যে গ্রামে বেড়ে উঠেছেন, সেখানে মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য এখনও যা কষ্ট করেন তা ভাবাই যায় না।

চাষের ক্ষেতে বা নদীতে তাদের প্রাণান্তকর পরিশ্রম করতে হয়, রাস্তা নির্মাণ সংস্থাগুলোর জন্য পাথর ভাঙার কাজ করে দিনে এক ডলারেরও কম রোজগার করেন তারা!

মেরি কম কিন্তু বলেন, ‘মণিপুর যদি একটা ধনী, সমৃদ্ধ রাজ্য হত তাহলে কিন্তু এখানকার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলোয় এত ভাল করতে পারত না।’

তার কথায়, ‘এখানকার মানুষরা কঠোর পরিশ্রম করে অভ্যস্ত – এই কঠোর পরিশ্রমটা তাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ!’

ডেভিড আর গোলাইয়াথ

লন্ডন থেকে এবারের মতো বিদায় নেওয়ার আগে মেরি কম শহরের আরও কয়েকটা স্মরণীয় ছবি তুলে নিলেন চটপট – পরের বার যখন গেমসে অংশ নিতে আসবেন তখন হয়তো বেড়ানোর কোনও সময়ই পাওয়া যাবে না!

সামনের কয়েকটা দিনে অলিম্পিকের জন্য চলবে মেরির কঠোর প্রস্তুতি – খুব সাদামাটা, আধুনিক সরঞ্জামবিহীন একটা জিমে, জঙ্গী সহিংসতার আতঙ্কের আবহেই তিনি পদক জেতার প্রস্তুতি নেবেন।

মেরি কম বলছিলেন, ‘আমি সব সময় ডেভিড আর গোলিয়াথের গল্পটা মনে রাখি – একটা ছোট্ট ছেলে হয়েও ডেভিড তো গোলিয়াথের মতো বিশাল মানুষকে হারিয়ে দিয়েছিল, তাই না?’

কঠোর সঙ্কল্প আর প্রখর ইচ্ছাশক্তির দীপ্তি ঝিলিক দিয়ে ওঠে মেরি কমের চোখেমুখে!

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻