BBC navigation

এবার কোন পথে যাবে শাহবাগের তারুণ্য

সর্বশেষ আপডেট শুক্রবার, 15 ফেব্রুয়ারি, 2013 13:24 GMT 19:24 বাংলাদেশ সময়

শাহবাগ আন্দোলনের দশম দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর ফেসবুকে অনেকেই তাদের স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “দুনিয়া কাঁপানো দশদিন।”

এই আন্দোলন কতোটা ব্যাপক, কতটা উত্তাল, এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী- তার গুরুত্ব তুলে ধরতে তারা ধার করেছেন রুশ বিপ্লব নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক জন রীডের লেখা বইয়ের নাম।

বাংলাদেশের শাহবাগের তরুণদের আন্দোলন বিশ্বকে কতোটা নাড়া দিয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো এবং সংস্কৃতির ভিত্তি যে এটি নড়িয়ে দিয়েছে, সে ব্যাপারে বিশ্লেষকদের মধ্যে কোন সন্দেহ নেই।

"এই আন্দোলনের কোন ভরকেন্দ্র নেই। শাহবাগে গেলেই সেটা বোঝা যায়। পুরো সমাবেশটি বহু বৃত্তে বিভক্ত। প্রত্যেকটি বৃত্তের নিজস্ব জীবন আছে। সেখানে যে কেউ গিয়ে একটি নতুন বৃত্ত তৈরি করতে পারে"

বিনায়ক সেন, অর্থনীতিবিদ

“সাধারণত আমরা যে ধরণের আন্দোলন দেখি, তার একটা কেন্দ্র থাকে, তার একটা রাজনৈতিক ভাবাদর্শ থাকে। তার একটা নেতৃত্ব দানকারী জোট বা শক্তি থাকে। কিন্তু শাহবাগের তরুণদের আন্দোলন প্রচলিত এই ছকের একেবারে বাইরে, বিবিসিকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন।

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪২ বছর পর তরুণদের এই স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনের চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করছেন বিনায়ক সেন।

“প্রথমত, এই আন্দোলনের কোন কেন্দ্র নেই, এর কোন ভরকেন্দ্র নেই। শাহবাগে গেলেই সেটা বোঝা যায়। পুরো সমাবেশটি বহু বৃত্তে বিভক্ত। প্রত্যেকটি বৃত্তের নিজস্ব জীবন আছে। সেখানে যে কেউ গিয়ে একটি নতুন বৃত্ত তৈরি করতে পারে।”

“দ্বিতীয়ত, এই প্রথম বাংলাদেশে একটি ব্যাপক গণআন্দোলন চলছে, যা কোন রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক জোটের মঞ্চ থেকে পরিচালিত হচ্ছে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটি অরাজনৈতিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের চরিত্র পুরোপুরি রাজনৈতিক।”

যেভাবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে সেটিও এর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন বিনায়ক সেন।

তার মতে এর চতুর্থ বৈশিষ্ট্য, এই প্রথম বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কোন দলীয় নেতা-নেত্রীর পোষ্টার বা ছবি নেই।

“এই সামান্য কয়েকটি বিষয় দেখলে বোঝা যায়, এটি একেবারেই ভিন্ন ধারার আন্দোলন।”

প্রজন্ম চত্ত্বর

১১ দিন আগে প্রথম যে তরুণরা ঢাকার শাহবাগ মোড়ে গিয়ে জড়ো হয়েছিলেন, তারা জানতেন না, কিসের সূচনা করতে যাচ্ছেন তারা।

"আমার মনে হয় এই আন্দোলন স্বাধীনতার চেতনার রিভাইভাল বা পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে, এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য"

সোনিয়া, স্কুল শিক্ষিকা

প্রথম দিন থেকেই তাদের আন্দোলনের স্রোত যে ঘুর্ণাবর্ত তৈরি করেছে, তার তীব্র টানে অবিরাম জনস্রোত এসে মিশেছে এখানে।

স্কুল শিক্ষিকা সোনিয়া বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর প্রজন্মের প্রতিনিধি। কোনদিন কোন রাজনৈতিক আন্দোলনে সামিল হওয়ার তাগিদ অনুভব করেন নি। কিন্তু আজ কিসের আকর্ষণে ১১ এবং ১৩ বছর বয়সী দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি ছুটে এসেছেন এখানে?

“আমরা জানতে চাচ্ছি আসলে ১৯৭১ সালে কি হয়েছিল। আমার বাচ্চারা এখন মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চায়। আমার মনে হয় এই আন্দোলন স্বাধীনতার চেতনার রিভাইভাল বা পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে, এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।”

গত এগারো দিনে শাহবাগ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নতুন যুগসন্ধিক্ষণ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে একটানা এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি চত্ত্বরে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে এমন আন্দোলনের নজির আর নেই।

কিন্তু ১১ দিনে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী ?

তরুণরা মনে করেন এখনো পর্যন্ত তাদের একটা দাবিও পুরণ হয়নি। তবে দাবি পূরণের পথে কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

আন্দোলনের পথিকৃৎদের একজন তরুণ ব্লগার মাহমুদুল হক মুন্সী। মানুষ যে তাদের ওপর এভাবে আস্থা রাখবে, তাদের বিশ্বাস করবে, সেটাই তাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে।

“সারা বাংলাদেশের মানুষ যে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে, এটা আমরা বিগত বছরগুলোতে দেখি নি। মানুষ যে আমাদের ওপর আস্থা রাখছে, মানুষ যে আমাদের কথা শুনছে, সারাদেশকে আমরা যে একটা প্ল্যাটফর্মে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছি, এটাই তো একটা বিরাট অর্জন।”।

আন্দোলনের ভবিষ্যৎ

প্রতিবাদী তরুণদের কোন সংগঠন নেই, তাদের এরকম আন্দোলনের কোন অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু তারপরও প্রতিদিন অভিনব সব কর্মসূচীর মাধ্যমে যেভাবে তারা এই আন্দোলনের গতি ধরে রেখেছে সেটাও অবাক করেছে বিশ্লেষকদের।

"মানুষ যে আমাদের ওপর আস্থা রাখছে, মানুষ যে আমাদের কথা শুনছে, সারাদেশকে আমরা যে একটা প্ল্যাটফর্মে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছি, এটাই তো একটা বিরাট অর্জন।"

মাহমুদুল হক মুন্সী, ব্লগার

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এর পর কি? কোন পথে যাবে এই আন্দোলন?

বিনায়ক সেন মনে করেন, এর ভবিষ্যত গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে এখনি কিছু বলা মুশকিল।

“আমার মনে হয়েছে, তারা এই আন্দোলনকে খোলা একটা বইয়ের মতো পাঠ করতে চান। যদি জনতা মনে করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখা দরকার, তারা সেটাই করবে।”

এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন জোট সরকার এই আন্দোলনকে তাদের জন্য এক ধরণের আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছে।

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি শুরু থেকেই এই আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে। দলটি না পারছে খোলাখুলি এই আন্দোলনে শরিক হতে, না পারছে তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের পক্ষ নিয়ে সরাসরি মাঠে নামতে।

বিনায়ক সেন মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাবান শ্রেনীর উদ্বিগ্ন হওয়ার অনেক উপাদান রয়েছে এই আন্দোলনের ভেতরে।

“এরকম ভিন্ন ধারার আন্দোলন, যাকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না, সেটা সরকার এবং বিরোধী দল, উভয় পক্ষের জন্যই খুব অস্বস্তিকর। বাংলাদেশে ক্ষমতার সুবিধাভোগী শ্রেনীর জন্যও অস্বস্তিকর। কারণ তারা ভয় পেতে পারে তাজরিন গার্মেন্টসের ইস্যু যদি এখানে যুক্ত হয়ে যায়। সরকার ভয় পেতে পারে তাদের নানা কেলেংকারির বিষয় যদি এখানে যুক্ত হয়ে যায়।”

বিনায়ক সেনের আশংকা, জামায়াত-শিবিরের সহিংস আন্দোলন প্রতিহত করতে গেলে এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও একসময় সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

BBC © 2014 বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়

কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻