জিএসপি বাতিলের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই লক্ষ্যে দেশের এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহল অনেক দিন ধরেই সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ তার যে কোন বাণিজ্য অংশীদারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত দুদেশের বিকাশমান বাণিজ্যের পথে নতুন বাধা সৃষ্টি করবে।”

যুক্তরাষ্ট্র গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের জন্য দেয়া বাণিজ্য সুবিধা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ সংক্রান্ত ঘোষণায় বলেন, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে বাংলাদেশকে দেয়া এই সুবিধা স্থগিত রাখাই যথাযথ, কারণ বাংলাদেশ তার শ্রমিকদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপই নিচ্ছে না।”

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে শ্রমিকদের অধিকার এবং কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে।

এতে বলা হয়, সরকার ২০০৬ সালের শ্রম আইন সংশোধন করেছে, আইএলওর নেতৃত্বে সরকার-শ্রমিক-মালিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং পোশাক কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে।

“কারখানার নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকার যখন অনেক বলিষ্ঠ এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কারখানা শ্রমিকদের ওপরও এক বড় আঘাত।”

যুক্তরাষ্ট্র শীঘ্রই বাংলাদেশের জন্য জিএসপি সুবিধা বহাল করবে বলে বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়।

আন্তর্জাতিক চাপ

কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে একটি বহুতল কারখানা ভবন ধসে প্রায় বারোশো মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকেই সরকার প্রচন্ড আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে শ্রমিকদের অধিকার এবং কারখানায় নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য।

সাভারের রানা প্লাজার ঐ ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনা।

এর আগেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে নিয়মিত বিরতিতে বহু দুর্ঘটনা হয়েছে।

গত বছরের নভেম্বরে তাজরিন ফ্যাশন্স নামের আরেকটি কারখানায় আগুনে মারা যান ১১২ জন শ্রমিক।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেট রিপ্রেজেন্টেটিভ মাইকেল ফ্রোমান সাংবাদিকদের বলেছেন, ওবামা প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত হেলাফেলা করে নেয়নি।

তিনি বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য শুধু এটা নয় যে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবার জন্য তাদের উপযুক্ততা প্রমাণ করবে। আমরা দেখতে চাই যে বাংলাদেশের শ্রমিকরা নিরাপদ এবং যথাযথ পরিবেশে কাজ করছে।”

গার্মেন্টস শিল্পে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কোন সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের রফতানিমুখি পোশাক শিল্পে পড়বে না, কারণ তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই বাণিজ্য সুবিধা পায় না।

কিন্তু বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই পদ্ক্ষেপ নিতে পারে।

জিএসপির অধীনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে যেসব পণ্য রফতানি করে, তার ফলে গত বছর বাংলাদেশ বিশ লক্ষ মার্কিন ডলারের মতো শুল্ক রেয়াত পেয়েছিল।

কিন্তু এর বিপরীতে বাংলাদেশ গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রায় পাঁচশো কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে, তার ওপর শুল্ক দিয়েছে ৭৩ কোটি বিশ লক্ষ ডলার।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি করেছে বারোশো কোটি ডলারের পণ্য। এর একটা বড় অংশই আবার জিএসপির অধীনে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা হবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এক মারাত্মক আঘাত।

সামনের মাসেই জেনেভায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে যেখানে বাংলাদেশের কারখানার নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা হবে।