মালালাকে নিয়ে পাকিস্তান এখনো দ্বিধাগ্রস্ত

  • ৭ অক্টোবর ২০১৩
Image caption লন্ডনের জাতীয় পোট্রেট গ্যালারিতে মালালার ছবি

পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় এক বছর আগে এক স্কুল বাস থামিয়ে তালেবান জঙ্গিরা গুলি চালিয়েছিল মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর। পাকিস্তানের মেয়ে শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে জঙ্গিদের টার্গেট হয়েছিল মালালা।

এ ঘটনায় শিউরে উঠে গোটা বিশ্ব, মাথায় গুলি লাগার পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মালালা হয়ে উঠে নারী শিক্ষার সংগ্রামের এক বিশ্বপ্রতীক।

এক বছর আগের সেই ঘটনার পর কতোটা বদলেছে পাকিস্তানের অবস্থা?

খোঁজ নিতে সোয়াত উপত্যকায় গিয়েছিলেন বিবিসির মিশাল হোসেন

উত্তর পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকা। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ভেতর দিয়ে একেঁবেঁকে যাওয়া রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে গাড়ী।

এক বছর আগে এখানেই স্কুল বাস থামিয়ে মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর গুলি চালিয়েছিল তালেবান জঙ্গিরা। সেই ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী একই স্কুলের ছাত্রী খইনাত রিয়াজ।

‘’যখন গোলাগুলি শুরু হলো, সব জায়গায় খালি রক্ত আর রক্ত। আমি মালালার রক্ত দেখেছি। এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে আমি আমার শিক্ষকের কোলের ওপর সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি,’’ বললেন রিয়াজ।

বাস ভর্তি স্কুল ছাত্রীদের ওপর জঙ্গিদের গুলি চালানোর এই ঘটনা পাকিস্তানকে যেন একটা বিরাট ঝাঁকুনি দিয়েছিল। ইসলামী জঙ্গিবাদ পাকিস্তানে বরাবরই এক বিরাট সমস্যা।

কিন্তু সোয়াত উপত্যকার মানুষ যেভাবে তাদের নিত্যদিনের জীবনে এই বিপদের মোকাবেলা করেছেন, সেরকম অভিজ্ঞতা বোধহয় পাকিস্তানের আর কোনও অঞ্চলের নেই।

চার বছর আগে ২০০৯ সালে পুরো সোয়াত দখল করে নিয়েছিল তালেবান। সোয়াতের মানুষকে এর মূল্য দিতে হয়েছে নানা ভাবে।

প্রথম আঘাতটা এসেছিল নারী শিক্ষার ওপর। তালেবানের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্কুল খোলা রাখতে তখন কত রকমের কৌশল নিতে হয়েছে, তার বর্ণনা আছে মালালার ব্লগে:

‘’সোমবার, ৫ই জানুয়ারি। আমাদের প্রিন্সিপ্যাল আমাদের স্কুল ইউনিফর্মের বদলে সাধারণ পোশাকে স্কুলে যেতে বলেছেন। তাই আমি আজকে আমার প্রিয় গোলাপী পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

‘’কিন্তু স্কুলে সকালের অ্যাসেম্বলিতে আবার আমাদের খুব রঙচঙে পোশাক পড়তেও নিষেধ করা হলো। কারণ তালেবান জঙ্গিরা নাকি এতেও আপত্তি জানাতে পারে।‘’

মালালার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল নারী শিক্ষার পক্ষে লেখা তার ব্লগের কল্যাণে। এগারো বছর বয়স থেকে মালালা নারী শিক্ষার পক্ষে কলম ধরে। কিন্তু এটার কারণেই তার জীবন হুমকির মুখে পড়েছিল।

যে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে তালেবান গুলি চালায়, সেখান থেকে মালালার স্কুল মাত্র শ খানেক গজ দূরে।

মালালার স্কুলের এক ক্লাসরুম। এখানেই একসময় মালালা তার সহপাঠীদের সঙ্গে একসাথে বসেছে।

তাদের জায়গায় এখন এসেছে একদল নতুন ছাত্রী। সবার পরনে নেভি-ব্লু সালওয়ার কামিজ। জীববিজ্ঞানের ক্লাস চলছে।

একজন পুরুষ শিক্ষক নারীর শরীরতত্ত্ব ব্যাখ্যা করছেন। রক্ষণশীল পাকিস্তানী সমাজে একে অভিনবই বলতে হবে।

ক্লাসের একেবারে সামনের সারিতে যে ডেস্কটিতে মালালা বসতো, সেখানে জ্বলজ্বল করে লেখা তার নাম। মালালাকে নিয়ে গর্বিত তার সহপাঠীরা।

‘’আমি মালালার সহপাঠী ছিলাম’’, বলছে একজন মেয়ে।

যেভাবে মালালা নারী শিক্ষার পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে, সেজন্যে তাকে নিয়ে গর্বিত তারা।

‘’মালালার ভয় ছিল না, যা বলা দরকার, তা জোর গলায় বলেছে সে,’’ বললো মেয়েটি।

পাকিস্তানের রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে মালালা যে আসলেই অনেক মেয়েকে অনুপ্রাণিত করেছে তা বোঝা যায় এই স্কুলের ছাত্রীদের কথায়।

এক মেয়ে বললো, বড় হয়ে সে সেনাবাহিনী প্রধান হতে চায়।

কিন্তু সোয়াতের এই স্কুল থেকে একটু দূরে গেলেই পাকিস্তানের এক ভিন্ন বাস্তবতাই চোখে পড়বে।

পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জঙ্গিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ বছরই অন্তত ৬০ টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

মালালা ইউসুফজাইকে নিয়ে কেন পশ্চিমা বিশ্ব এত হৈ-চৈ করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অনেকে। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ফরিদ পারাচার ধারণা, পুরোটাই একটা সাজানো নাটক।

মালালা ইউসুফজাইকে সমর্থন করেন কিনা, এ প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ফরিদ পারাচার বলছেন, পুরোপুরি নয়।

‘’এখানে পাকিস্তান বিরোধী একটা প্রচারণা চালানো হচ্ছে,’’ তিনি বলেন।

মালালাকে তিনি কোন রোল মডেল বা আদর্শ বলে মনে করেন না। পুরো ব্যাপারটাই মিথ্যের মোড়কে সাজানো হয়েছে বলে তার ধারনা।

ধর্মীয় রক্ষণশীলতাই শুধু নয়, এর পাশাপাশি দারিদ্রও এক বড় প্রতিবন্ধক পাকিস্তানে নারী শিক্ষার পথে।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মালালা ইউসুফজাই হয়তবা এখন নারী শিক্ষার প্রসারে এক বিশ্ব প্রতীক, কিন্তু পাকিস্তান যেন এখনো তার এই সংগ্রামে পুরোপুরি সামিল হতে দ্বিধাগ্রস্ত।