কোরবানির চামড়া পাচারের আশংকা ব্যবসায়ীদের

  • ১৬ অক্টোবর ২০১৩
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ীরা বাজারে

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ পালিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা, মুসলমানদের একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব৻

ত্যাগের নিদর্শন স্থাপনের উদ্দেশ্যে বহু মানুষ পশু কোরবানি দেন। তবে কোরবানির একটি বড় ব্যবসায়িক দিকও রয়েছে, যার একটি হলো পশুর চামড়া নিয়ে বিশাল অংকের অর্থের ব্যবসা।

এ বছর ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো কোরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু কোথাও কোথাও বেশি দামে চামড়া কেনাবেচার অভিযোগ শোনা গেছে।

এছাড়া চামড়ার পাচার ঠেকাতেও সংগঠনগুলো সতর্কতার জন্য সরকারের উদ্যোগ চেয়েছে। পুলিশ প্রশাসন বলছে, ঢাকার বাইরে যাতে চামড়া নিয়ে কোনও যানবাহন যেতে না পারে সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশে এবারের ঈদ উল আজহায় পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার চামড়া কেনাবেচা চলবে বলে ধারণা করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। গতবছর এই লেনদেন ছিল দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে।

এছাড়া এ বছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়াতে কেনা-বেচায় সুবিধা হচ্ছে বলেও মনে করেন ট্যানারি মালিকরা। এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ট্যানারি মালিকদের একটি সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি শাহীন আহমেদ।

“গতবছর দাম নির্ধারণ করে না দেওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করেছে। কিন্তু যারা মাঠ পর্যায়ে বিক্রেতা ছিল তারা সঠিক দাম পায়নি। এই মৌসুমি ব্যবসায়ী কিংবা মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোই এবছর দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য।”

নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৮৫-৯০ টাকায়, ঢাকার বাইরে ৭৫-৮০ টাকায় কিনবেন ব্যবসায়ীরা। প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম ৫০-৫৫ টাকা, বকরির চামড়া ৪০-৪৫ টাকা এবং মহিষের চামড়ার দাম ৪০-৪৫ টাকা ঠিক করা হয়েছে।

যদিও বিশ্বমন্দার কারণে গত কয়েক বছর কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়নি চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত সংগঠনগুলো।

তবে এবছর সরকারি চাপের কারণে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় তারা। অনেক ব্যবসায়ীই মনে করেন, নির্ধারণ করে দেওয়া দামে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে না।

চট্টগ্রামের একজন পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ী মো. আলী সওদাগর বলেন, “বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন ফড়িয়ারা বেশি দামে কিনেছে ফলে আমাদেরও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। প্রতি বর্গফুট নব্বই টাকার বেশি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। নতুন ফড়িয়ারা তো চামড়া চেনে না বা আসল দাম জানে না। ফলে তারা বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে।”

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এবছর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের প্রচারের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত কোরবানি হওয়ার কারণে চামড়া কিছু বেশি সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

গতবছর যেখানে ৬০ লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয়, এবছর তা ৭০ লাখ ছাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কিছু ব্যবসায়ী চামড়া ভারতে পাচারের আশংকা করছেন

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবছর ভারতে রুপির মানের অবমূল্যায়নের কারণে এবং প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় গরু আসায় সে দেশে অধিকহারে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছেন তারা ।

সেজন্য সরকারের কাছে তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পাচারকারীরা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে চামড়া নিয়ে যাচ্ছে ঢাকার বাইরে।

ঢাকার একজন আড়তদার হাজি সমির উদাহরণ দিচ্ছিলেন, “গত বছরগুলোতে সাভারের আমিনবাজার এলাকার ব্রিজের ওপারে চামড়া যেতে পারেনি। কিন্তু এবছর আমিনবাজার খুলে দিয়েছে সরকার। খোঁজ নিলে দেখবেন, সেখানে পাচারকারীরা সক্রিয়। সেখানে ট্যানারি মালিক আছেন দুই-একজন, কিন্তু তাদের আড়ালে রয়েছেন ভারতীয় পাচারকারী চক্রের লোকজন।”

তবে ঢাকায় পুলিশের একজন মুখপাত্র ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুনিরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা থেকে যাতে চামড়া নিয়ে কোনও যানবাহন বেরুতে না পারে সেজন্য তাদের টহল আজ থেকে সক্রিয় থাকবে।

“ঈদের আগেই চামড়া ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তিনদিন অর্থাৎ আজ থেকে ঈদের পরবর্তী দুইদিন ঢাকার আশেপাশের এক্সিট পয়েন্ট গুলোতে টহল থাকবে যাতে ঢাকার বাইরে থেকে চামড়াবাহী ট্রাক ঢুকতে পারবে কিন্তু বাইরে যেতে পারবে না। আজ দুপুর থেকেই এই চেকপোস্ট গুলো কাজ করছে।”

এছাড়া পাচার ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্ত সংল্গ্ন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় বিজিবির মাধ্যমে টহল জোরদার রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানি হচ্ছে। তবে কোরবানীর সময়, চামড়া ছাড়ানোতে অদক্ষতা ও সংরক্ষণের অভাবে প্রায় প্রতিবছর কয়েকশো কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়ে যায় বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।