নিরাপত্তা এখনও চুক্তি ও স্মারক স্বাক্ষরেই সীমিত

  • ২৩ অক্টোবর ২০১৩
bbc
Image caption একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা

রাজধানী ঢাকার খিলখেতের একটি পোশাক কারখানায় প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছেন পোশাক শ্রমিক - শিল্পী।

সকাল আটটা থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে যায় এই পোশাক কারখানায় যার চতুর্থ তলায় সুইং ফ্লোরে ছেলেদের শার্ট তৈরির কাজ হয়।

শিল্পীর কাজ এই ফ্লোরে।

রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানায় কাজ করার ব্যাপারে বেশ আতংক তৈরি হয়েছে শিল্পীর মনে।

একই তলায় কাজ করেন আরেকজন পোশাক শ্রমিক খুরশিদা।

খুরশিদা বলছেন এই ঘটনায় তিনি এতটাই আতংকিত যে এর পরে যদি কোন কারখানায় কাজ করতে যান তাহলে বেতনের সাথে সাথে ভবন ঠিক আছে কীনা, ফাটল আছে কীনা এসব তিনি দেখে নেবেন।

“ রানা প্লাজা ধসের পর খুব ভয় লাগে। আগুন লাগা, ভূমিকম্প, বিল্ডিং ভেঙে পড়বে কিনা এইসব নিয়ে সবসময় খুব ভয় লাগে।”

১০ তলা ফাউন্ডেশনের এই পাঁচ তলা ভবনের পুরোটাতেই চলে পোশাক তৈরির কাজ।

পুরো ভবনটি ঘুরে দেখা গেল সেখানে পুরুষ ও নারীদের জন্য বিভিন্ন তলায় ওঠার আলাদা আলাদা সিঁড়ি রয়েছে।

আর জরুরি নির্গমনের জন্য রয়েছে আলাদা রাস্তা।

Image caption কারখানায় অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও ভয় কাটে নি শ্রমিকদের

লিফট এখনো চালু হয়নি।

প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা।

আমার সাথে ভবনটি ঘুরে দেখাছিলেন কারখানাটির কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ, যিনি বলছিলেন রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর কারখানার নিরাপত্তার জন্য তারা কি ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন ?

মি. বিল্লাহ বলছিলেন নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে তারা আগে থেকেই সচেতন ছিলেন।

রানা প্লাজার পর তারা এবং কর্তৃপক্ষ আরো পদক্ষেপ নিচ্ছে।

“ফায়ারের যেসব যন্ত্র রয়েছে সেগুলো বাড়াচ্ছি, ফায়ারের মহড়া করছি নিয়মিত।”

কারখানার চতুর্থ তলার আয়তন বারো হাজার স্কোয়ার ফিট, আর এখানে কাজ করছেন ৭০০ জন শ্রমিক।

ভবনটি ঘুরে কারখানা নিরাপত্তার বেশ কিছু ব্যবস্থা চোখে পড়লেও ১২ হাজার স্কোয়ার ফিটের একটি তলায় ৭০০ জন শ্রমিকের কাজ করাটা কতটা নিরাপদ সে ব্যাপারে অবশ্য তিনি পরিস্কার উত্তর দিতে পারেননি।

এই প্রতিবেদনটি তৈরি করার জন্য একাধিক কারখানায় ধর্না দিয়েও কারখানার ভিতরে ঢুকে শ্রমিকদের সাথে কথা বলা বা কাজের পরিবেশ সরেজমিনে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয় যায় নি।

বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের কোন কাঁচামাল না থাকা স্বত্বেও এটাই একমাত্র শিল্প যেটা বর্তমানে অন্যতম হারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

১৯৮০ দশকের শুরু হওয়া এই শিল্পের মাধ্যমে বছর বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও এই শিল্পের দেখভালের জন্য একক কোন মন্ত্রণালয় গড়ে ওঠেনি।

Image caption সকাল আটটা থেকে কাজ শুরু করেছেন শিল্পী

এ বছরের ২৪শে এপ্রিল ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধস ও তারও আগে গত বছরে তাজরিন ফ্যাশনসে আগুন লাগলে নিহত হন বহু মানুষ। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন পোশাক শ্রমিক।

এসব দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করে ।

সারা দেশে কারখানাগুলো খতিয়ে দেখতে পর্যবেক্ষকদের দল গঠন করা হয়।

এছাড়া আইএলওর সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার একটি 'ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরি করে।

কিন্তু বাস্তবে কাজ কতখানি হয়েছে?

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার বলছিলেন আইএলওর সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার যে প্রকল্প নিয়েছে সেটার এখনো উদ্বোধন হয়নি।

“২২ শে অক্টোবর উদ্বোধন হবে। তবে এটা ঠিক অ্যাকোর্ড', অ্যালায়েন্স' বা বাংলাদেশ সরকার কেউই মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করতে পারেনি।”

সেসময় বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্পে ভবন ও শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টিতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে কম মূল্যে পোশাক কিনছে কিন্তু শ্রমিকদের কোনও নিরাপত্তা নেই বলে প্রশ্ন ওঠে।

এই শিল্প বাঁচাতে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূমিকা রাখতে অনেকেই চাপ প্রয়োগ করে।

বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন ও উন্নয়নের জন্য ইউরোপের পোশাক ব্র্যান্ডগুলো একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

এটি 'বাংলাদেশ ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি অ্যাকোর্ড' বা সংক্ষেপে 'অ্যাকোর্ড' নামে পরিচিত।

অ্যাকোর্ডের সাথে বাংলাদেশে কাজ করছে ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিল নামে একটি সংস্থা।

তার মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র বলছিলেন পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো চুক্তি সাক্ষর করেছে কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এখনো কোন কাজ শুরু হয়নি।

এছাড়া একই লক্ষ্য নিয়ে উত্তর আমেরিকার পোশাক ব্র্যান্ডগুলোও 'নর্থ আমেরিকান অ্যালায়েন্স' নামে একটি জোটে একত্রিত হয়।

তবে এই প্রতিবেদনের জন্য খবর নিয়ে জানা যায় বাংলাদেশে অ্যালায়েন্সের প্রাথমিক কোন কাজ এখনো শুরু হয়নি।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ থেকেও নিজস্ব উদ্যোগে ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তামূলক বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

Image caption কাপড় কাটার কাজ চলছে

আগের উল্লেখ করা কর্ম-পরিকল্পনাগুলোতেও তাদের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছিল।

বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদ বিন রিয়াজ বলছিলেন বড় পরিসরে তাদের কাজ শুরু না হলেও বিজিএমইএর যারা সদস্য রয়েছেন তাদের কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

মি. রিয়াজ অবশ্য এই ছয়মাসকে খুব কম সময় বলে উল্লেখ করছেন।

তার মতে এত বড় দুর্ঘটনার পর রাতারাতি সব কিছু বদল দেওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু সেই আশির দশক থেকে তৈরি হওয়া বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে ভবন বা অগ্নি নির্বাপণের পর্যাপ্ত কোন ব্যবস্থা কেন থাকবে না সে নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

তাজরিন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দিকে লক্ষ্য রেখেছে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান বিলস্‌।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সুলতানউদ্দিন আহমেদ অবশ্য বলছিলেন এই ছয় মাসেই ভবন নিরাপত্তার কাজ শুরু করা যেত যদি সেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিছুটা কম থাকতো।

তিনি বলছিলেন যতটা বলা হয়েছে তার কিছুই করা হয়নি।

“একটা অ্যার্কোড হয়েছে, নর্থ আমেরিকান অ্যালায়েন্স একটা বড় অ্যামাউন্ট ঘোষণা করেছে, কিন্তু সব গুলোই ঘোষণার মধ্যে রয়েছে।”

তিনি বলছেন, ত্রিপক্ষীয় একটা অ্যাকশন প্ল্যান যেটা নেওয়া হয়েছে সেটার চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে ২৫শে জুলাই, কিন্তু সেটার কোন কাজ শুরু হয়নি।

“সুতরাং এক কথায় বলবো যে ভয়াবহ দুর্দশার প্রেক্ষিতে এই আলোচনাগুলো হয়েছে বা হচ্ছে সে তুলনায় কারখানা পর্যায়ে কাজ হয়েছে খুব সামান্য, যে বড় দুটি বিপর্যয় বিশ্বকে শোকগ্রস্ত করেছে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা যতটা আলোচনা করেছি, যতটা পরিকল্পনা করেছি, কারখানা পর্যায়ে মানুষের জীবন নিশ্চিত করার জন্য ততটা পরিবর্তনের সূচনাও করতে পারা যায়নি,” মন্তব্য করেছেন বিলসের প্রধান সুলতানউদ্দিন আহমেদ।

রানা প্লাজা ধসের পর শ্রমিকদের মনে বেড়েছে আতঙ্ক।

সাথে তারা এও বলছেন কোন কারখানায় কাজ করতে গেলে বেতনের সাথে এখন থেকে তারা কারাখানার নিরাপত্তার বিষয়টিও জানতে চাইবে কর্তৃপক্ষের কাছে।

কিন্তু তারা বলছেন রানা প্লাজার শ্রমিকদের মত ভুল তথ্য যে তারা পাবে না সে নিশ্চয়তা তাদের কে দেবে?

অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সরকার ও পোশাক মালিকরা, ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়টিতে ছয় মাস পরেও এখনো বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের মধ্যেই আটকে রয়েছেন।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য