রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ কবে মিলবে?

  • ২২ অক্টোবর ২০১৩
131021155751_rana_plaza_worker_nazma_akter_lili_512x288_bbc_nocredit.jpg

গার্মেন্টস কর্মী নাজমা আকতার লিলি নিজে প্রাণে বেঁচে গেছেন রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায়।

ঐ ভবনেই আরেকটি গার্মেন্টস কারখানার কর্মী তাঁর স্বামী মোহাম্মদ জুয়েল বাঁচতে পারেননি।

এরই মাঝে তাঁর সংসারে আসছে নতুন অতিথি।

নাজমা আকতার লিলির কষ্ট যেনো আরও বেড়েছে।

কারণ তাঁর স্বামী তাদের প্রথম সন্তানকে দেখে যেতে পারলেন না।

Image caption নাজমা আকতার লিলির সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত

“ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি, এমনটা আমার মনে হয়।”

ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে অল্প দূরত্বে সাভারের ছায়াবীথি এলাকায় ১৮শ টাকা ভাড়ায় ছোট্ট একটি ঘরে নাজমা আকতার লিলির সংসার।

সেই ঘরে বসেই কথা হচ্ছিল তাঁর সাথে।

তিনি তাৎক্ষণিক কিছু সাহায্য পাওয়ার কথা জানান।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্বামীর মৃতদেহ নেওয়ার সময় দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন।

তিনি নিজে যে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতেন, সেখান থেকে তাঁকে বেতন হিসেবে ছয় হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল।

পেটে সন্তান থাকায় বিল্স থেকে তাঁকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন থেকে কিছু চাল-ডাল সাহায্য হিসেবে পেয়েছিলেন।

এগুলো দিয়েই কোনভাবে জীবন চালাচ্ছেন।

কিন্তু এই সাহায্য তাঁকে অনুদান নাকি ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে তাঁর কোন ধারণা নেই।

স্বামী হারানো নাজমা আকতার লিলি কতটা ক্ষতিপূরণ পাবেন অথবা পাবেন কিনা, এসব প্রশ্নে মালিক পক্ষ বা কোন দিক থেকেই তাঁকে কোন ধারণা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলছিলেন, “বিয়ের বছর দুয়েক পর অনেক আশা করে সন্তান নিয়েছিলাম। আমার স্বামী সেই সন্তান দেখে পরলেন না। এখন আমার পাশে কেউ নেই। কিভাবে জীবন চলবে জানি না।”

নাজমা আকতার লিলির মতো ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের কাছেই সাহায্য এবং ক্ষতিপূরণের মধ্যে পার্থক্য বা এ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই।

বিষয়টাতে এক ধরণের ধুম্রজাল তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন বিলসের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ক্ষতিপূরণের বিষয়টা এড়ানো যায় কিনা, সে ধরণের চিন্তা থেকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নানান কৌশল নিচ্ছে বলে তাঁর ধারণা।

Image caption 'বিলস' এর সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কথা বলছেন কাদির কল্লোল

তিনি বলছিলেন, “যে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে, সেটাকেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত মানদন্ড এবং আইন, কোন বিবেচনাতেই এটাকে ক্ষতিপূরণ বলা যায় না। ক্ষতিপূরণটা হবে একটা হিসাবের উপর ভিত্তি করে । যতদিনের আয়ের ক্ষতি হয়েছে এবং পুনর্বাসনের জন্য কি দরকার, এসব বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিপূরণের বিষয় আসবে।”

তিনি মনে করেন, দেশের মালিক পক্ষ এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সরকারের দিক থেকেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।

বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর চাপ তৈরির টার্গেট থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের একটি ফোরাম ইন্ডাস্ট্রি অল উদ্যোগ নিয়ে কিছুদিন আগে জেনেভায় একটি বৈঠক করেছে।

তাতে অল্প সংখ্যক বিদেশী ক্রেতা অংশ নিলেও আলোচনা সেভাবে এগোয়নি।

তবে এই বৈঠকে বাংলাদেশের শ্রমিকদের পক্ষে প্রতিনিধি ছিলেন কামরুল আনাম।

তিনি দাবি করেছেন, জেনেভা বৈঠকে তারা তাদের প্রস্তাব তুলে ধরতে পেরেছেন।

আর এর ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটা ফর্মূলা তৈরির দায়িত্ব আইএলও নিয়েছে।

তিনি বলছিলেন, “জেনেভা বৈঠকে দেওয়া প্রস্তাবে তাঁরা বলেছেন, বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিপূরণের ৪৫ শতাংশ দিতে হবে। বিজিএমইএ’র কাছে ১৮ শতাংশ দাবি করা হয়েছে। সরকারের কাছে নয় শতাংশ চাওয়া হয়েছে।”

তবে শ্রমিক নেতা কামরুল আনাম মনে করেন, আন্তর্জাতিক এই উদ্যোগের ফলাফল পেতে অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে।

ঢাকায় আইএলও অবশ্য বলেছে, তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে আলোচনা শুরু করেছে।

ঢাকায় হাইকোর্ট স্বত:প্রণোদিত হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করার পাশাপাশি একটি কমিটি গঠন করে দিয়ে, সেই কমিটিকে নিরাপত্তা ইস্যূতে এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যাপারে প্রস্তাব তৈরি করে, তা আদালতে পেশ করতে বলেছে।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতার সমন্বয়কারি ছিলেন সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হাসান সোহরাওয়ার্দ্দী।

তাঁকে ঐ কমিটির প্রধানের দায়িত্ব দেয় আদালত।

এই কমিটি আবার এর সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এম এম আকাশের নেতৃত্বে উপকমিটি গঠন করে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল।

মি: আকাশ বলছিলেন, হতাহত শ্রমিকরা আরও ২৫ বছর কাজ করতে পারতেন, এমন একটা গড় হিসাব ধরে প্রস্তাব তৈরি করেন।

তিনি বলছিলেন, “প্রারম্ভিক বেতন পাঁচ হাজার টাকা এবং মুদ্রাস্ফীতি সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সে অনুযায়ী মৃত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৯লাখ ৫১ হাজার তিনশ’ টাকা । পঙ্গু শ্রমিকদের জন্যও একই পরিমাণে ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব করা হয়েছে। ”

সাহায্য এবং ক্ষতিপূরণের পার্থক্য নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগ যেমন রয়েছে।

পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা নিয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো থেকে নানান ধরণের বক্তব্য আসছে।

Image caption বিজিএমইএ সহ সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম

যদিও প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম একজন উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বিষয়টাতে সরকারের দায়িত্বের কথা স্বীকার করেন।

একইসাথে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষতিপূরণ ইস্যূতে মুল দায়িত্ব বিজিএমইএ’র।

তিনি বলছিলেন, “আমি মনে করি, বিষয়টা মূলত বিজিএমইএরই দেখা দরকার। তবে সরকারেরও কিছুটা দায়িত্ব আছে। সেজন্য সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় মালিকদের সাথে দেন দরবার করছে। সাহায্যের টাকাটাও ফিক্সড ডিপোজিট করা সহ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে অর্থটা থাকে।”

রানা প্লাজা ধ্বসের পর ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ঢাকার হাতিরঝিল এলাকায় বিজিএমইএ কার্যালয় ঘেরাও করাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।

শেষ পর্যন্ত সরকারও বলছে, ক্ষতিপূরণ ইস্যূতে বিজিএমইএরই মুল দায়িত্ব।

এসব অনেক প্রশ্ন নিয়ে বিজিএমইএ’র কার্যালয়ে কথা বলি এর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিমের সাথে।

তাঁর কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল, ক্ষতিপূরণ ইস্যূতে অন্য সব পক্ষগুলো থেকে বিজিএমইএ’র দায়িত্বের বিষয়টিই উঠে আসছে।

তাঁরা কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন।

জবাবে কিন্তু তিনি সাহায্য বা অনুদানের বর্ণনাই তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

তিনি বলছিলেন, “প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে একশ বিশ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই তহবিল থেকে প্রধানমন্ত্রী এ পর্যন্ত ২৫ কোটি টাকার মতো দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে বাকিটা দেওয়া হবে। এটাকে অনুদান নয়, আমরা ক্ষতিপূরণ হিসেবেই দেখছি।”

কিন্তু ক্ষতিপূরণতো হিসাব নিকাশ করে ,তারপর দেওয়ার প্রশ্ন আসবে।

তাতে বিজিএমইএ’র এই নেতার বক্তব্য হচ্ছে, হাইকোর্ট এ ব্যাপারে স্বত:প্রণোদিত হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে।

সেই প্রক্রিয়ায় আদালত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যা ঠিক করে দেবে, সেটা তাঁরা মেনে নেবেন।

সেখানেও তাঁদের প্রশ্ন আছে, সেটা হচ্ছে. ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা এ পর্যন্ত যে সাহায্য বা অনুদান পেয়েছেন, সেই পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ থেকে বাদে দিয়ে বা কেটে রেখে বাকি অংশ দেওয়া হবে।

মালিকদের অবস্থানকে সমর্থন করছে না সরকার।

উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দেওয়া অর্থকে সরকার অনুদান হিসেবেই বিবেচনা করছে।

এরসাথে ক্ষতিপূরণের বিষয়কে মিলিয়ে ফেলতে সরকার রাজি নয়।

তিনি বলছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী তহবিলে মূলত বিভিন্ন ব্যাংক এবং ব্যক্তি বা বিভিন্ন সংস্থা থেকে অর্থ এসেছে। এটা ক্ষতিপূরণ হতে পারে না।”

ক্ষতিপূরণের অর্থ যোগাড়ের প্রশ্নেও সরকার এবং বিজিএমইএ সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে একে অপরের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা রয়েছে।

বিদেশি ক্রেতারাও এ ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছে না বলে বলা হচ্ছে।

ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পেতে কতটা সময় গুনতে হবে, সেটা বলা মুশকিল।

এই খবর নিয়ে আরো তথ্য