বাংলাদেশ নিয়ে আতঙ্কে পশ্চিমা পোশাক ব্র্যান্ড?

  • ২৭ অক্টোবর ২০১৩
Image caption বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে আন্দোলন (ফটো-আইএলআরএফ)

রানা প্লাজা যেদিন ভেঙ্গে পড়লো ঠিক সেদিনই অর্থাৎ ২৪শে এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী শ্রমিক ইউনিয়ন ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইটস্‌ ফোরাম একটি বিক্ষোভ করছিলো সানফ্রানসিসকোতে পোশাক ব্র্যান্ড গ্যাপের সদর দপ্তরের সামনে।

গ্যাপের জন্য কাপড় বানাতো বাংলাদেশের এমন একটি কারাখানায় অগ্নিকান্ডে আহত-নিহতদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে ছিল ঐ বিক্ষোভে।

লাউড স্পিকারে চলছিলো পরিচিত স্লোগান -- বাংলাদেশের সোয়েটশপ অর্থাৎ যে সব কারখানায় শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নেই, ন্যায্য মজুরি দেয়া হয়না সেখান থেকে পোশাক আমদানি চলবে না।

ঘটনাচক্রে সেই দিনেই ঘটে রানা প্লাজা ট্রাজেডি। শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ কারখানা দুর্ঘটনা।

পোশাক ব্রান্ডগুলোকে এক হাত নেওয়ার এরকম মোক্ষম অস্ত্র হয়ত আগে আর কখনো পায়নি আমেরিকার শ্রমিক ইউনিয়নগুলো।

মাস খানেক পর শীর্ষ মার্কিন দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসে বিশদ একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে বেশ কিছু মার্কিন ব্রান্ডের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে ভীতি তৈরি হয়েছে, এবং তারা বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে এবং পোশাক তৈরি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এরকম কয়টি দেশ ঘুরে রিপোর্টটি করেছিলেন কিথ ব্রাডশের। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হংকং ব্যুরো প্রধান।

বিকল্পের সন্ধানে ক্রেতারা?

মি ব্রাডশের বিবিসি বাংলাকে বলেন, এমনিতেই ইমেজ সচেতন কিছু ব্রান্ডের মধ্যে সবসময়ই বাংলাদেশ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। রানা প্লাজার ঘটনার পর সেই দ্বিধা আরও বেড়েছে।

"এদের বেশ কয়েকজন আমাকে বলেছেন, তারা বিকল্প খুঁজছেন।"

কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন তারা? এ প্রশ্নে কিথ ব্রাডশের তিনটি দেশের কথা বললেন -- ক্যাম্বোডিয়া ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়া।

"এরাও মোটামুটি বিশাল সংখ্যায় পোশাক তৈরি করছে। এই তিনটি দেশই এখন চেষ্টা করছে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা বাগাতে"।

অবশ্য এ দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য অবশ্য চীন। কারণ চীনে মজুরি ভীষণভাবে বাড়ছে। চীনের উপকূলীয় এলাকাগুলোর পোশাক কারখানাগুলোর মজুরি গত দশ বছরে মাসিক একশ ডলার থেকে পাঁচশ ডলারে পৌঁছেছে।

তবে মি ব্র্যাডশের একইসাথে বললেন হঠাৎ করে রাতারাতি বাংলাদেশের বিকল্প বের করা খুব সহজ হবে না।

"বাংলাদেশের এখনও বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন, বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি যেসব দেশে তার একটি বাংলাদেশ। তাছাড়া বিশাল পরিমাণ পোশাকের অর্ডার নিয়ে তা সময়মত সরবরাহ করার দক্ষতা তারা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা করা অনেকে দেশের চেয়ে সুবিধাজনক, এমনকি ভারতের চেয়েও।"

Image caption টার্গেট ওয়ালমার্ট (ফটো - আইএলআরএফ)

ব্র্যান্ড ইমেজ নিয়ে আশঙ্কা

যদি সত্যিই বাংলাদেশের এসব সুবিধা থাকে তাহলে ক্রেতারা বিকল্প ভাবছে মূলত কোন কারণে? মি ব্রাডশেরের উত্তর ছিল বাংলাদেশে আরেকটি বড় ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তাদেরকে যে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে সেটা ভেবে অনেক ক্রেতা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে।

"সারা বিশ্বের চোখ এখন বাংলাদেশের কারখানার নিরাপত্তা এবং শ্রমিক অধিকারের ওপর। আমেরিকান কোন খুচরা পোশাক বিক্রেতা বা ব্রান্ড কোনভাবেই চাইছে না বাংলাদেশে আরেকটি বড় দুর্ঘটনা হোক, তারপর এনজিও এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলো তাদের নৈতিকতা নিয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন তুলুক। কেউ এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাইছে না।"

ফলে কোনো কোনো ব্র্যান্ড এখন অল্প কিছু বেশি দাম দিয়ে হলেও অন্য জায়গা থেকে পোশাক আনতে উৎসাহী হচ্ছে যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ঝুঁকি এবং বিড়ম্বনা কম।

পশ্চিমা ট্রেড ইউনিয়নগুলো যথেষ্ট প্রভাবশালী। সংবাদ মাধ্যম এবং রাজনীতিকদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে জনমত তৈরিতে তারা পারদর্শী। সস্তায় কাপড় আমদানি করে দেশের পোশাক শিল্প ধ্বংস করার জন্য বড় বড় ব্রান্ডগুলোর ওপর তাদের ক্ষোভ বহুদিনের। বাংলাদেশের পোশাক খাতে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তারা মানুষকে সহজে বোঝাতে পারছে এত সস্তায় কাপড় কিভাবে আসছে।

ফলে ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অস্বস্তি যে বাড়ছে সেটা বোধগম্য। রানা প্লাজার ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার নিরাপত্তা এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক যে চুক্তি সম্প্রতি হয়েছে তার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল পশ্চিমা কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের। মূলত তাদের চাপেই পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো এই চুক্তিতে সই করেছে।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের লোকজনের মধ্যেও একটা শঙ্কা কাজ করে পশ্চিমা ট্রেড ইউনিয়নগুলোর প্রচার প্রচারণাই পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে।

তবে এক কথায় এ ধরণের অভিযোগ উড়িয়ে দিলেন আমেরিকা এবং ইউরোপের শীর্ষ দুই ট্রেড ইউনিয়নের দুজন মুখপাত্র।

বাংলাদেশ ক্রেতা হারাক তা চাইনা: ইন্ড্রস্ট্রিঅল

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল লেবার রাইটস ফোরামের মুখপাত্র লিয়ানা ফক্সভোগ বিবিসিকে বলেন পশ্চিমা ব্রান্ডগুলোর মধ্যে যদি বাংলাদেশে সম্পর্কে ভীতি জন্মায় তাহলে তার দায় তাজরিন ফ্যাশনস এবং রানা প্লাজার মত একের পর পর ঘটনা।

"আমরা বরঞ্চ মনে করি এত বছর ধরে পশ্চিমা এই সমস্ত ব্রান্ড এবং লোগো বাংলাদেশে তৈরি পোশাক বেচে এত মুনাফা করেছে যে তাদের এখন নৈতিক দায়িত্ব বাংলাদেশের নিরাপত্তার ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করা।"

আর জেনেভা-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, ইন্ডাস্ট্রি অলের জেনারেল সেক্রেটারি ইরকি রাইনা বলছেন বাংলাদেশ ক্রেতা হারাক কখনই তারা সেটা চাননা।

"বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নিরাপত্তায় যে চুক্তি হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই পোশাক শিল্প সেদেশে যেন টিঁকে থাকতে পারে। আমরা চাই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প টিকে থাকুক, বিকশিত হোক, লাখ লাখ কর্মসংস্থান হোক। কিন্তু এখন যেভাবে চলছে সেটা টেকসই কোন শিল্প নয়, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়া হচ্ছে এ দিয়ে তাদের দারিদ্র দূর হবে না।"

তাছাড়া বাংলাদেশ ছেড়ে কোন ক্রেতা চলে যাচ্ছে সেটাও বিশ্বাস করে না এই দুটো ট্রেড ইউনিয়ন।

ইরকি রায়না জানালেন ডিজনি ছাড়া তেমন কোন উল্লেখযোগ্য কোম্পানি বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে বা করতে চলেছে সে রকম ইঙ্গিত অন্তত তাদের কাছে নেই। তার কথা, বরঞ্চ যে ৯০টি কোম্পানি এই চুক্তিতে সই করেছে তারা কার্যত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশে তারা থাকবে, সেখান থেকে পোশাক কিনবে।

"ইতিহাসে এই প্রথম আমরা দেখছি বিভিন্ন গ্লোবাল ব্রান্ড এবং বিক্রেতারা একসাথে কিছু করতে চাইছে। এবং আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এ সব কোম্পানি বিষয়টিকে সত্যিই গুরুত্ব দিচ্ছে।"

পোশাক খাতের রপ্তানির ওপর নিয়মিত নজর রাখেন ঢাকার গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী প্রধান ড মুস্তাফিজুর রহমান। তিনিও বললেন, ক্রেতারা সহসা বাংলাদেশে ছাড়ার পরিকল্পনা করছে এরকম কোন লক্ষণ তিনি এখনো দেখছেন না।

"তারা চাইছে বাংলাদেশকে সক্ষম করে বাংলাদেশের সাথেই ব্যবসা করতে। কারণ তারা জানে এত কম দামে এখন কেউই তাদের পোশাক দিতে পারবে না।"

তাজরিন বা রানা প্লাজার মত ঘটনায় ব্রান্ড ইমেজ নিয়ে তারা ভীত হয়ে পড়েছেন কিনা? বাংলাদেশের বদলে অন্য কোন দেশের কথা তারা ভাবছেন কিনা – এ সব প্রশ্নের উত্তরের জন্য ওয়ালমার্ট, মার্কস স্পেনসার, টেসকো এবং প্রাইমার্কের কাছে সাক্ষাৎকারের জন্য বারবার অনুরোধ করেও রাজী করানো যায়নি।

বাংলাদেশে নিয়ে টেসকো, মার্কস-স্পেনসার

Image caption লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীট

মার্কস এন্ড স্পেনসার ছোট্ট একটি লিখিত বক্তব্য ছিল এরকম -- বাংলাদেশের সাথে ব্যবসায় আমাদের রেকর্ড সবসময় স্বচ্ছ। আমরা কিনি এমন কোন কারখানায় কোন দুর্ঘটনা হয়নি। বাংলাদেশে থেকে আমদানি বন্ধ করার কোন পরিকল্পনা আমাদের নেই। কিন্তু আমরা মনে করি বাংলাদেশে কারখানা নিরাপত্তার উন্নতি প্রয়োজন।

আর টেসকো তাদের কেম্পানি সাইটে কমার্শিয়াল ডিরেক্টর কেভিন গ্রেসের লেখা একটি নোট ইমেল করে পাঠিয়ে দিয়েছে। মি গ্রেস লিখছেন, “অনেক মানুষ বলে সস্তার কারণে টেসকো বাংলাদেশ থেকে কাপড় আনছে এবং সেদেশে শ্রমিক শোষণে পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে। তারা আমাদের বলছেন বাংলাদেশ থেকে সরে আসতে। যখন পরিস্থিতি ভালো হবে তখন আবার ফিরে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমরা সেভাবে ভাবছি না। তাতে কোন লাভ হবে না, ক্ষতি হবে। পোশাক তৈরি সেদেশে অব্যাহত থাকবে, কিন্তু টেসকোর মত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যে নজরদারি, দক্ষতা সেখানে নিয়ে গেছে সেগুলোও চলে যাবে। ট্রেড ইউনিয়নগুলোও সেটা চায়না। তারা চায় আমাদের সরবরাহ লাইনে যারা পণ্য যোগাচ্ছে তাদের প্রতি যেন আমাদের দায়িত্ববোধ থাকে।“

তবে এই চারটি কোম্পানিরই লিখিত বক্তব্য ছিল বাংলাদেশের কারখানা নিরাপত্তায় ট্রেড ইউনিয়ন, বাংলাদেশ সরকার এবং কারাখানা মালিকদের সাথে যে চুক্তিতে তারা সই করেছেন তারা আশা করছেন তা কাজ করবে।

চুক্তি কিন্তু কতটা কাজ করবে?

ইন্ডাস্ট্রি অলের ইরকি রাইনা স্বীকার করবেন বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে সিটি। দুহাজারের মত কারখানা পরিদর্শন করতে হবে। শ্রমিক-কর্মচারী এবং ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কঠিন কাজ।

একই প্রশ্নে নিউ ইয়র্ক টাইমসের কিথ ব্রাডশের সরাসরি কোন উত্তর দিলেন না। তবে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের একটা তুলনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি।

Image caption ইন্দোনেশিয়ার একটি পোশাক কারখানা

"আমি গত ক' বছরে ইন্দোনেশিয়াতে অনেক গার্মেন্ট কারখানায় গিয়ে মুগ্ধ হয়েছি।"

বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার পোশাক কারখানাগুলো বড়জোর দোতলা। কিভাবে এটা হয়েছে তার একটা ইতিহাস রয়েছে। নব্বই এর দশকে ইন্দোনেশিয়া পোশাক নির্মাতাদের সমিতির প্রধান হয়েছিলেন সাবেক একজন মন্ত্রী যিনি ভবন নিরাপত্তাকে খুব গুরুত্ব দিতেন। ফলে তার তিন বছরে তিনি কড়া নিয়ম করে দেন কোন পোশাক কারখানা দোতলার বেশি হতে পারবে না। তখন ইন্দোনেশিয়ার পোশাক শিল্প অত বড় ছিলনা। কিন্তু তারপর থেকে যত নতুন কারখানা সেখানে হয়েছে তা সেই নিয়মেই হয়েছে। যে সব কারখানার দ্বিতীয় তলা রয়েছে সেগুলোর সাথে একটি বড় খোলা চত্বর থাকে এবং সাথে অনেক সিঁড়ি। ফলে কোন দুর্ঘটনা হলে দ্রুত শ্রমিকদের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

"ইন্দোনেশিয়াতে পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু আপনি বাংলাদেশের মত সেখানে সাত-আট তলা কংক্রিটের ভবনে কারখানা দেখবেন না। ফলে বড় কোন দুর্ঘটনার কথা শোনাই যায়না।"

তবে বলা বাহুল্য বাংলাদেশের তুলনায় সেখান পোশাক তৈরির খরচ বেশ কিছুটা বেশি।

ইন্দোনেশিয়ার পোশাক খাতে এখন গড় মাসিক মজুরি দেড়শ থেকে ২০০ ডলার, যেখানে বাংলাদেশে এখনও সেটা ৪০ থেকে ১০০ ডলার। "কিন্তু অনেক ব্রান্ড এখন বাড়তি দামটা দিতে চাইছে।"

যেভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খাড়া বহুতল ভবনে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার বিশাল একটি অংশ গড়ে উঠেছে তাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আসলে কতটা এড়ানো যাবে তা নিয়ে অনেক পর্যবেক্ষক সন্দিহান। যে কোন সময় আরেকটি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটবে না সে নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।

ন্যায্যমূল্য এবং শ্রমিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে এত কড়া নজরদারিতে মজুরি বৃদ্ধি সহ বিভিন্ন শর্ত পালন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কমবে। এজন্যে পশ্চিমা ব্রান্ড এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সাথে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বৈঠকে বার বার তারা ন্যায্য মূল্য অর্থাৎ আমদানি মূল্য বাড়ানোর কথা বলেছেন।

কিন্তু পশ্চিমা ক্রেতারা বাড়তি পয়সা দিতে কতটা প্রস্তুত? লন্ডনের সবচেয়ে বড় শপিংই স্ট্রিট অক্সফোর্ড স্ট্রিটে এক দুপুরে খুচরা কজন ক্রেতার সাথে কথা বলে মিশ্র বক্তব্য পাওয়া গেল। কেউ কেউ বলছেন, তারা যদি জানেন বাড়তি পয়সা শ্রমিকদের কাছেই যাচ্ছে, তাহলে তারা কিছু বেশি দাম দিতে প্রস্তুত।

আবার অনেকে বললেন, অধিকাংশ মানুষ সস্তা যেখানে পাবে সেখানেই দৌড়ুবে।

পোশাক বিক্রেতারাও হয়ত বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত। বেশি দাম দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই তারা কোন প্রতিশ্রুতি দিতে চায়না।

পশ্চিমা ট্রেড ইউনিয়নগুলোর বক্তব্য ন্যায্য মূল্যের দাবি তারা সমর্থন করে তবে অল্প দামই যে বাংলাদেশের পোশাক খাতের নিরাপত্তার পথে অন্যতম অন্তরায় সেটা শিকার করতে তারা নারাজ।

এ বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রি অলের ইরকি রাইনা বলেন একটি সমীক্ষায় তারা দেখেছেন বাংলাদেশের কারখানার কাজের পরিবেশ নিরাপদ করতে যদি খরচ করতে হয়, শ্রমিকদের মজুরি ৩৮ ডলার থেকে একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়, তাহলেও একটি টি শার্টের দাম বড় জোড় ১০ সেন্ট বাড়াতে হবে।

"এটা তেমন কিছুই না। বড় বড় ব্রান্ডগুলোকে আমরা যখন একথা বলেছি, তারা বলেছে এইটুক বেশি দিতে তাদের কোন আপত্তি নেই।"

নিউ ইয়র্ক টাইমসের কিথ ব্রাডশের বলছেন দশ-বিশ সেন্ট বাড়ানোর চেয়ে ব্রান্ড ইমেজ আমেরিকার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপেও তাই।

"যদি আর দু-একটি বড় ধরণের কারখানা দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশ থেকে অনেক ক্রেতাকে সরে যেতে দেখব।"

কিন্তু সেটা হলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কি তালা ঝুলবে?

মি ব্রাডশের বলছেন সেটা নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ তৈরি পোশাকের একমাত্র বাজার নয়। এই দুটো জায়গার ক্রেতা এবং খুচরো বিক্রেতারা কারখানা নিরাপত্তা, শ্রমিকের মজুরি নিয়ে ভাবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য বা চীন এখনও এসব নিয়ে অতটা উদ্বিগ্ন নয়।

ফলে হয়ত ইউরোপ-আমেরিকার বাজার নষ্ট হবে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য, ভারত বা চীনের বাজার সেই ক্ষতি হয়ত পুষিয়ে দেবে।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য সেটা কি আশ্বাসের বানী? হয়ত। কিন্তু শ্রমিকের নিরাপত্তা, অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে এবং বাইরে যারা তৎপর, তারা হয়ত সে সম্ভাবনায় উৎফুল্ল হবে না।