বাংলাদেশে দুদিনের অবরোধে রেলের ওপর নজিরবিহীন হামলা

  • ২৭ নভেম্বর ২০১৩
bangladesh train attacks
Image caption বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় ট্রেনের ওপর হামলা বেড়েছে

বাংলাদেশে দুদিনের অবরোধ কর্মসূচির সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর অনেকগুলো আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।

রেললাইন উপড়ে ফেলা, আগুন ধরানো, ট্রেনে ইঁট-পাথর ও ককটেল নিক্ষেপসহ বিভিন্ন ঘটনায় অনেকেই আহত হয়েছেন।

শুধু এই অবরোধ কর্মসূচি নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে রেল-এর ওপর হামলার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।

এতে স্বাভাবিক রেল চলাচলে যেমন বিঘ্ন ঘটেছে, তেমনি যারা রেলে যাতায়াত করেন - তারাও আতংকিত হয়ে পড়ছেন।

রেল কর্তৃপক্ষ বলছে এমন 'অভূতপূর্ব' ঘটনায় তারা স্তম্ভিত।

রেল কর্তৃপক্ষ সারা দেশে ২২৭ টি ঝুকিঁপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানিয়েছে।

রাজনৈতিক বিক্ষোভের সময় রেলের ওপর এভাবে হামলা হচ্ছে কেন? আর কর্তৃপক্ষই বা কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গত দুদিন ধরেই রেল চলাচল বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে এই বলে যে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া কিংবা ঢাকামুখী বেশ অনেকগুলো ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন বিগত দুদিনের অবরোধ চলাকালে যে হামলার শিকার হয়েছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান তা এক কথায় অভূতপূর্ব। সংস্থাটির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের বলছেন অতীতে তিনি কখনওই রেলকে এভাবে ধ্বংস করার ঘটনা দেখেন নি।

‘‘একটা রাজনৈতিক দল প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে অবরোধের আর তারপরই কোথাও পাঁচশ' আবার কোথাও ছয় বা সাতশ' ফিট লাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে। মূলত দেলওয়ার হোসেইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর থেকেই রেলের ওপর নাশকতামূলক হামলা বেড়ে গেছে। সন্ত্রাসমূলক রাজনীতির কারণেই রেল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।’’

তিনি বলছেন প্রকাশ্য দিনের বেলায় শত শত লোক জড়ো হয়ে যদি লাইন তুলে ফেলে দেয় তাহলে কীভাবে আমরা সেবা অব্যাহত রাখবো?

যাত্রা এতো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও জরুরি কাজ থাকায় অসংখ্য মানুষ রেলের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কমলাপুর রেল স্টেশনে কয়েকজন যাত্রী বলছিলেন কেউ অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাচ্ছেন, আবার কারো যাওয়ার দরকার মেয়ের বিয়ে বলে।

নরসিংদী যাবেন বলে স্টেশনে বসে ছিলেন নুরুল ইসলাম নামের একজন চিকিৎসক। ভয় থাকা সত্ত্বেও বাড়ি যেতেই হবে তার।

‘‘দেশের ভাল যারা চায় না তারাই এমন নাশকতা ক'রে যাত্রীদের জীবন বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছে।’’ বলছিলেন তিনি।

ঢাকার শনির আখড়া থেকে ময়মনিসংহ যাবেন বলে স্টেশনে আসা নার্গিস বেগমের শ্বশুর গুরুতর অসুস্থ। তিনি বলছেন টিকেট না পেয়ে বসে আছেন তিনি, কেননা ট্রেন নেই। আদৌ যেতে পারবেন কীনা তা নিয়ে এখন দোদুল্যমান অবস্থায় আছেন তিনি।

নোয়াখালি যাবেন বলে স্টেশনে বসে থাকা লায়লা আর্জুমান্দ নামের একজন যাত্রীর বক্তব্য তিনি শেষ পর্যন্ত যেতে পারেন কীনা তা নিয়ে আতংকে আছেন।

‘‘পাটা-পুতা ঘষাঘষিতে মরিচের জান শেষ বলে কথায় আছে। আমরা জনগণের অবস্থা এখন তেমন। তাদের দরকার ক্ষমতা, ক্ষমতায় যেতে তারা আমাদের জীবন হুমকির মুখে ফেলছেন,’’ বলছিলেন লায়লা আর্জুমান্দ।

Image caption রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সারা দেশে ১৫টি জেলার ২২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে (ফাইল চিত্র)

সারা দেশে ২৯০০ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন স্থানে গত দুদিনে অনেকগুলো হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং কর্মকর্তারা বলছেন রেললাইন উৎপাটন, আগুন ধরিয়ে দেয়া, ট্রেনে ইঁট-পাথর ও ককটেল নিক্ষেপ সহ ইত্যাদি ঘটনায় অনেকেই আহত হয়েছে। বিনষ্ট হয়েছে বেশ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় প্রকৌশলী মো: আবিদুর রহমান গত দুদিনে নানাধরনের ক্ষতির বর্ণনা করে বলছিলেন তারা রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় নিজেদের টহল বাড়িয়ে দেন যাতে করে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন রেলের সেবা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রচুর মানুষ এখন রেল ভ্রমণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং সেই যোগাযোগে বাধা দিলে তার প্রভাব বেশি হয় বলে এখন রেলপথ সহিংসতার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

এদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সারা দেশে ১৫ টি জেলার ২২৭ টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে এবং রেলপুলিশ ও বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করে রেলপথ নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা নিয়েছেন।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের জানান ‘‘প্রায় এক হাজার আনসার সদস্য ইতিধ্যেই বিভিন্ন স্থানে প্রহরা শুরু করেছে। আশা করছি আর যদি নাশকতামূলক হামলা আসে আমরা প্রতিহত করতে পারবো।‌’’

কর্মকর্তারা আরো বলছেন দীর্ঘ রেলপথের পুরোটা পাহারা দেয়া কোন মতেই সম্ভব না এবং তাদের সীমিত লোকবল দিয়ে তা সম্ভবও নয়।

এই কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি না করার অনুরোধ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।