আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

  • ১২ ডিসেম্বর ২০১৩

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

বহু নাটকীয়তা শেষে বৃহস্পতিবার রাত দশটার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দেশটির স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো।

এর আগে এই ট্রাইব্যুনালে আরো অনেকেরই সাজা হয়েছে।

কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার শাহবাগে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা আনন্দ প্রকাশ করতে শুরু করে।

মি. মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তারা বিক্ষোভ করে আসছিলো।

আর ফাঁসির প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী আগামী রোববার ১৫ই ডিসেম্বর সারাদেশে হরতাল ডেকেছে।

রাত ১০টা ১ মিনিট

Image caption কাদের মোল্লার মৃতদেহ জেল থেকে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

কারাগারের একজন কর্মকর্তা জানান যে, রাত দশটা এক মিনিটে মি. মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

সেসময় জেলগেটের বাইরে সাংবাদিকদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে দুটো অ্যাম্বুলেন্সকে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়।

কারাগারের সামনে থেকে বিবিসির সংবাদদাতা কাদির কল্লোল বলছেন, জেলের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার কাদের মোল্লার রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেওয়ার পর দু'জন ম্যাজিস্ট্রেট কাদের মোল্লার সাথে দেখা করে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে চান কী না তা জানতে চান।

কিন্তু এ বিষয়ে মি. মোল্লা তাদের কি বলেছেন জানতে চাইলে কারা কর্তৃপক্ষ কিছু বলতে রাজি হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর কাদের মোল্লার পরিবারের সদস্যরা আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় আবারও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তার সাথে দ্বিতীয়বারের মতো দেখা করেছেন।

মি. মোল্লার একজন মেয়ে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তারা নিজের উদ্যোগে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে তার পিতার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।

তিনি জানান, মি. মোল্লা প্রাণভিক্ষার বিষয়ে তার আইনজীবীদের সাথে কথা বলতে চেয়েছেন।

জামায়াতের প্রতিবাদ

জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর দলটির পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদে আগামী রোববার সারাদেশে হরতালের ডাক দেওয়া হয়।

Image caption বৃহস্পতিবার রাতে জেলগেটের সামনে নিরাপত্তা

দলটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের আহ্বান অগ্রাহ্য করে সরকার সুপরিকল্পিতভাবে আব্দুল কাদের মোল্লাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’

দলটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, 'এর সাথে যারা জড়িত তাদের করুণ পরিণতি দেশবাসী অতি শীঘ্রই প্রত্যক্ষ করবে।'

পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনসহ পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।

বাংলাদেশের এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এই আদেশের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আইনগত আর কোন বাধা থাকল না, এখন যে কোন সময় এটি কার্যকর করা যেতে পারে। আইসিটি আইন অনুযায়ী এই সাজা বাস্তবায়নে জেলকোড প্রযোজ্য হবে না বলেও তিনি জানান।

তবে মি. মোল্লার আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার আগে সাজাটি কার্যকর করা হবে না বলেই তারা আশা করেন। কারণ সেখানে আদালতের পর্যবেক্ষণ থাকবে বলে আশা করছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ মি.মোল্লা নাকচ করেননি বলেই তিনি দাবি করেন।

মঙ্গলবারের স্থগিতাদেশ

এরও আগে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার মধ্যরাত বারোটার পর কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সব প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিল কারা কর্তৃপক্ষ।

Image caption মি. মোল্লার পরিবারের সদস্যরা আজ আবারও কারাগারে গিয়ে তার সাথে দেখা করেছেন

আবদুল কাদের মোল্লার পরিবারের সদস্যরা জেলে মঙ্গলবার রাতে তার সাথে দেখাও করেন।

কিন্তু পরে মি. মোল্লার আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বিবিসি বাংলাকে জানান, তারা চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সাথে দেখা করে রায় পুনর্বিবেচনা অর্থাৎ রিভিউ-এর আবেদন জমা দেবার পর বিচারপতি হোসেন বুধবার সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর করা স্থগিত করেন।

সেই সাথে আবেদনটি গ্রহণ করা হবে কিনা, সেটি শুনানির জন্যে বুধবার সকালে সময় নির্ধারণ করা হয়।

বুধবার দুই দফায় শুনানির পর বৃহস্পতিবার সকালে শুনানির জন্যে সময় নির্ধারণ করেন প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ।

অপরাধ

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আবদুল কাদের মোল্লাকে ১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা এবং ধর্ষণের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে গড়ে উঠা আন্দোলনের চাপে পরবর্তীতে সরকার আইন সংশোধনের মাধ্যমে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পরে আবদুল কাদের মোল্লাকে একই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন।