বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে কি ভাবছে তরুণ প্রজন্ম?

  • ২০ ডিসেম্বর ২০১৩
bbc
Image caption সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় দিবস উৎযাপন

১৬ই ডিসেম্বর ২০১৩। বিকেল ৪ টা ৩১ মিনিট। স্থান রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

বাংলাদেশের ৪৩তম বিজয় দিবসে লাখো মানুষ জড়ো হয়েছেন এখানে।

বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়ে, গাইছেন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। তাদের অনেকের গায়ে লাল-সবুজ রঙের পোশাক, মাথায় বাঁধা জাতীয় পতাকা।

সারা দেশের মত ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নানা সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত হচ্ছে বিজয় দিবসের উৎসব।

আর তাতে যোগ দিয়েছেন নানা বয়স, পেশা আর শ্রেণীর মানুষ।

তবে এবারের বিজয় দিবসের উৎসব এমন এক সময় পালিত হচ্ছে যখন নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান দুই দলের অনড় অবস্থানের কারণে দেশ এক চরম সংকটের মধ্যে পড়েছে।

একদিকে বিরোধী জোটের টানা অবরোধ আর হরতালের মত কর্মসূচি আসছে যা জনজীবনকে স্থবির করে তুলছে আর অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধমূলক নাশকতায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক মানুষ।

বিজয় উৎসবে যোগ দেওয়া নানা বয়সের মানুষের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় এদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ প্রজন্ম, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। বিজয় দিবসের উৎসব পালনে তাদের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস, আনন্দ - তেমনি বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা।

সোহরাওয়াদী উদ্যান থেকে কিছুটা এগিয়ে জাতীয় শহিদ মিনার এলাকায় কথা হচ্ছিল কয়েকজন তরুণের সঙ্গে।

নিজেদের মধ্যে তারা আলোচনা করছিলেন, আর তাদের আলোচনার বিষয় ছিল রাজনীতি।

Image caption জাতীয় পতাকা আঁকছেন একজন তরুণ

মোহাম্মদ ইব্রাহীম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।

ঢাকায় এসেছেন একটা চাকরির খোঁজে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে ইব্রাহীমের ভাষায় ঝরে পড়লো চরম হতাশা আর কিছুটা ক্ষোভ।

“সারা দেশের মানুষ দুই দলের কাছে জিম্মি হয়ে আছি।”

তিনি বললেন আমরা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে দেখি সরকারি দল কোন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিলে বিরোধী দল তাদের সমালোচনা করে বা সাহায্য করে কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টা ঘটে।

“আমার কাছে বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটাই প্রধান বাধা হিসেবে মনে হয়।”

মাদারীপুরের তাজুল ইসলাম, বছর চারেক ধরে কাজ করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে তার মনে হচ্ছে দেশ আরও সহিংস পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মি. ইসলাম বলছিলেন “কোরবানি ঈদের পর থেকেই দেশে অবরোধ, হরতাল শুরু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পড়ালেখা সব ক্ষেত্রই চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তিনি বলছেন এখন আওয়ামী লীগ অনেকগুলো আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার যে খবর তারা পত্র-পত্রিকায় পাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে বিএনপিও ছেড়ে কথা বলবে না।

“আমি নিশ্চিত দেশ আরও সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”

প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট চাইছে আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হোক।

অপর দিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ তাদের ভাষায় সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

ফলে একদিকে বিরোধী জোট থেকে একের পর এক অবরোধ আর হরতালের মত কর্মসূচি আসছে যা জনজীবনকে স্থবির করে তুলছে। প্রভাব পড়ছে ব্যবসা বাণিজ্য, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে।

তবে এসব কিছুর পরেও দেশের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী অনেক তরুণ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ফারহানা।

Image caption বিজয় দিবসে তরুণদের বিজয় মিছিল

তিনি বলছিলেন বাংলাদেশে যে সংকটময় অবস্থা তৈরি হয়েছে সেটা সাময়িক সময়ের জন্য। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে নিয়ে তাই আশাবাদই ব্যক্ত করলেন তিনি।

“এখন যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেটা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে দেশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা যারা তরুণ প্রজন্ম আছি, আমি মনে করি আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে ইতিবাচকভাবে নানা ক্ষেত্রে তুলে ধরছি এবং ভবিষ্যতেও তুলে ধরবো।”

তবে তিনি বলেন রাজনীতিবিদরা তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসবেন বলে তার আশা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র নাবিল আহমেদও দেশের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী।

তিনি মনে করেন স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও রাজনীতিতে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় দেশ যে আসতে পারেনি তার কারণ মূলত দেশের রাজনীতিবিদদের দূরদর্শিতার অভাব।

তবে একারণে কিন্তু উন্নয়ন থেমে নেই বলেই তার মত।

জিডিপি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশ উন্নতি হয়েছে আর সেটা হয়েছে সাধারণ মানুষের সচেতনতার কারণে, বলছিলেন মি: আহমেদ।

“আমরা এখনও যদি চিহ্নিত করতে পারি কারা আমাদেরকে পিছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাহলে আমরা আরও সচেতন হতে পারবো এবং দেশ এগিয়ে যাবে বলে আমার আশা।”

দেশটিতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম চলছে এখন।

এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সেসময় একটি আন্দোলন শুরু হয়েছিল দেশের তরুণ প্রজন্মের একাংশের অংশগ্রহণে।

তাদের দাবি ছিল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড।

অন্যদিকে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের মামলায় প্রতিটি রায়ের পর দেশের বিশেষ কিছু অঞ্চলে দেখা গেছে সহিংসতা।

ঢাকার একটি কওমি মাদ্রাসায় আমি গিয়েছিলাম সেখানকার ছাত্রদের সাথে কথা বলতে।

টানা অবরোধ আর হরতালে মাদ্রাসাটিতে এক অর্থে অঘোষিত ছুটি চলছে বলা যায়।

ছাত্রের সংখ্যা কম। সন্ধ্যার পর মাদ্রাসা চত্বরে কথা হচ্ছিল কয়েকজন ছাত্রের সাথে, যারা দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় হতাশ।

সবার চোখে মুখে দেখলাম হতাশা আর এই হতাশা থেকে উত্তরণের পথও তারা দিলেন নিজেদের মত করে।

মাদ্রাসার ছাত্র ওয়াসিফুর রহমান বললেন সংকট সমাধানে সরকারি দলকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং বিএনপির সাথে আলোচনা করে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

একই মাদ্রাসার ছাত্র শামিম আহমেদ বললেন, “এক্ষেত্রে প্রত্যেক দলের মধ্যে যদি দেশপ্রেম জাগ্রত হয় তাহলেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।”

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালের পর থেকে গণতন্ত্র চর্চা শুরু হয়েছে বলে বলা হয়।

Image caption সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ

এরপর থেকেই মূলত দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে।

প্রতিবার নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা মত আর রাজনৈতিক দলগুলোর মতের অমিলের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন সহিংসতা।

প্রাণ হারিয়েছে অনেক সাধারণ মানুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী শম্পা বলছিলেন দেশের এই পরিস্থিতিতে তিনি হতাশ।

“দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদল যে দুটি দলের মধ্যে হচ্ছে তাদের বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে নতুনদের হাতে দেশ পরিচালনা করার সুযোগ করে দিতে হবে।”

এবারের বিজয় দিবসের উৎসব নির্বাচনের ঠিক আগ মূহুর্তে - তাই নতুন প্রজন্মের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল রাজনীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ।

তারা তাদের ভাবনাগুলো শেয়ার করছে পরিচিত মহলে, গণমাধ্যমে আর সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে।

বর্তমান অচলাবস্থা নিয়ে তাদের মধ্যে যেমন হতাশা কাজ করছে একইভাবে এই সংকট কাটিয়ে দেশ সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে এমন আশা অনেক তরুণের চোখে।