ধর্ষিতা কিশোরীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে : পুলিশ

পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ বলছে কলকাতার উপকন্ঠে যে পর পর গণধর্ষণের শিকার যে কিশোরী অগ্নিদগ্ধ হয়ে মঙ্গলবার মারা গেছেন, তিনি আত্মহত্যা করেন নি। দুষ্কৃতিরা তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে দিয়েছে।

শরীরের ৬৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়ার পরে আটদিন হাসপাতালে ছিলেন তিনি।

মৃতার পরিবার চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এনেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আর স্বাস্থ্য মন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে । আর ওই ঘটনায় কলকাতায় চলছে বিক্ষোভ প্রতিবাদ।

এতদিন ধরে এটাই জানা ছিল যে ওই মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে – পুলিশও সেটাই বলছিল।

কিন্তু বিমানবন্দর এলাকার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সন্তোষ নিম্বলকর বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন “হাসপাতালে থাকাকালীন যে জবানবন্দী দিয়েছিলেন ওই নির্যাতিতা, তাতে তিনি বলেছেন যে দুই ব্যক্তি তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয় – বাইরে থেকে দরজা আটকিয়ে দেওয়া হয়। ওই দুজনই গ্রেপ্তার হয়েছে – এবং তারা মূল গণ ধর্ষণ মামলার অভিযুক্তদের পরিচিত। ওই জবানবন্দীকে মৃত্যুকালীন জবানবন্দী হিসাবে ধরে নিয়ে আমরা ধৃতদের বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের মামলা রুজু করেছি।“

অন্যদিকে মৃতার পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে হুমকি ও চাপ সৃষ্টির লিখিত অভিযোগ করেছে।

তার পরিবার বলছে হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার পথে কাল রাতে পুলিশ জোর করে মৃতদেহ সৎকার করতে নিয়ে যায় বাড়ীর কোনও লোক ছাড়াই এবং তাড়াতাড়ি সৎকার করে ফেলতে মৃতার বাবাকে থানায় নিয়ে গিয়ে চাপ তৈরী করে। রাতভর শ্মশানে পুলিশী পাহারায় মৃতদেহটি পড়ে ছিল।

আজ সকালে দেহ ফেরত পায় পরিবার এবং বিকেলে তার অন্তিম সংস্কার হয়েছে।

এদিকে আজ সকাল থেকে বামপন্থীরা আর তৃণমূল কংগ্রেসপন্থী নন – এমন লেখক শিল্পী সাহিত্যিক মানবাধিকার কর্মীরা প্রতিবাদে নেমেছেন।

যে দাবীগুলো উঠছে, তার মধ্যে প্রথমটাই হচ্ছে যে এরকম একটা নৃশংস ঘটনা ঘটল কী করে – তিনদিনের মধ্যে দু দুবার গণধর্ষণ করা হল আর মেয়েটির পরিবারকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যেতে লাগল অভিযুক্তরা, তাঁকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলল। কেন পুলিশ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হল – এই প্রশ্নটাই সবথেকে সামনে উঠে আসছে।

মৃতদেহ রীতিমতো হাইজ্যাক করা ও তাড়াতাড়ি সৎকার করে ফেলার জন্য চাপ সৃষ্টির কারণেও পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরী হয়েছে।

জাতীয় মহিলা কমিশনও মমতা ব্যানার্জীর কাছে জানতে চেয়েছে যে কীভাবে পর পর দুবার গণধর্ষণের শিকার হল মেয়েটি। পুলিশের ভূমিকা যে সঠিক ছিল না, সেই মন্তব্যও করেছে মহিলা কমিশন।

মৃতা কিশোরীর বাবা স্থানীয় থানায় এফ আই আর দায়ের করেছেন যেখানে চিকিৎসা করা হচ্ছিল ওই মেয়েটির সেই আর জি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য দপ্তর আর স্বাস্থ্য মন্ত্রী – যেটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নিজেই – এঁদের বিরুদ্ধে।

মেয়েটির পরিবার বলছে ৬৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া রোগীকে হাসপাতালের এমারজেন্সী ওয়ার্ডের মেঝেতে রাখা হয়েছিল কয়েকদিন। গোড়ার দিকে চিকিৎসাই করা হয় নি।

ওই পরিবারটিকে চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য করছিল – এমন একটি এন জি ও-র প্রধান শান্তশ্রী চৌধুরী বিবিসি-কে বলছেন, “মেয়েটির শরীরের ৬৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল – এরকম কোনও রোগীকে বার্ণ ইউনিট নেই এমন হাসপাতালে চিকিৎসা করাই উচিত না।আর জি কর হাসপাতালে বার্ণ ইউনিট নেই । তাই বারবার চেষ্টা করা হয়েছিল বার্ণ ইউনিট আছে এরকম সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। কিন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেরা দায়িত্ব না নিয়ে পরিবারের ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।“

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সরকারের তরফে এই ঘটনা নিয়ে এখনও কিছুই বলা হয় নি। কিন্তু সরকারী দল তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সংসদ সদস্য মুকুল রায় বলেছেন, “বামপন্থী এবং আরও কিছু ব্যক্তি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে দেশের মানুষের সামনে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছেন। পুলিশ ঠিকই তাদের কর্তব্য করেছে – গণধর্ষণের মামলায় ৬জনকে গ্রেপ্তার করে তাদের চার্জশীটও দেওয়া হয়েছে আর মেয়েটির অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।“