সোনিয়া গান্ধীর নির্বাচনী প্রচার নিয়ে বিতর্ক

ছবির কপিরাইট AP
Image caption 'ভারতীয়ত্ব' প্রশ্নে সোনিয়া গান্ধীর মন্তব্য নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে

ভারতের নির্বাচনে খোদ ভারতীয়ত্বর আদর্শই কি বিপন্ন? অন্তত সেরকমটাই দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী।

নির্বাচনের মাঝপথে এসে ব্যতিক্রমী ও বিরল এক টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে তিনি প্রতিপক্ষ বিজেপি-র নাম না করেও বলেছেন, ভারতীয়ত্ব বলতে সবাই যা বোঝে - ঘৃণা-বিদ্বেষ আর বিভেদের রাজনীতির মাধ্যমে তা ধ্বংস করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে।

এই ভাষণের জবাবে বিজেপি বলেছে – ভারতীয়ত্ব কী, সেটা আগে সোনিয়া গান্ধীকে শিখতে হবে এবং দেশে চিরকাল বিভেদের রাজনীতি যারা করে এসেছে, সেই দলের নাম কংগ্রেস!

ভারতের চলতি নির্বাচনে আগাগোড়াই কংগ্রেসের প্রচারে প্রধান মুখ ছিলেন রাহুল গান্ধী।

কিন্তু সোমবার রাতে দেশের প্রায় সবগুলো প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ এক বিজ্ঞাপনী বার্তায় আচমকাই শোনা গেল দলের সভানেত্রী ও ইউপিএ চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধীর কন্ঠস্বর – যেখানে তিনি বলছেন ভারতীয়ত্ব বা হিন্দুস্তানিয়ত বলতে এ দেশের মানুষ কী বোঝে।

সোনিয়া সেই বার্তায় বললেন, ভারতীয় হিসেবে তিনি গর্ববোধ করেন কারণ ভারতীয়ত্ব মানে হল সেই চিরন্তন মূল্যবোধ বা আদর্শ যা বিভিন্ন মত ও ধর্মের লোকজনকে একসঙ্গে থাকতে শেখায়।

‘সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, শান্তি আর অহিংসার বন্ধনে বেঁধে রাখে সবাইকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই হিন্দুস্তানিয়ত-ই হুমকির মুখে – কারণ আমাদের লড়তে হচ্ছে এই আদর্শকে বাঁচাতে। আমাদের ভাগ করার চেষ্টা হচ্ছে।’

‘কেউ কেউ বলছে শুধু আমার ওপর ভরসা রাখ – কিন্তু আমরা বলছি, না, ভরসা রাখ শুধু ভারতীয়ত্বর মহান চেতনায়।’

মিনিট তিনেকের এই গোটা বক্তৃতায় সোনিয়া গান্ধী একবারের জন্যও বিজেপি বা তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নাম উচ্চারণ করেননি – কিন্তু তিনি কাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন সেটাও ছিল স্পষ্ট।

মি মোদীর সমালোচকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল তিনি একজন ডিভাইসিভ ফিগার - বরাবর বিভেদের রাজনীতি করে এসেছেন আর তিনি ক্ষমতায় এলে ভারতে সেই বিভেদই প্রশ্রয় পাবে।

আর ঠিক সেটাকেই এখন প্রচারে হাতিয়ার করার চেষ্টা করলেন সোনিয়া গান্ধী – যার দল সব জনমত জরিপেই অনেক পিছিয়ে আছে।

সোনিয়া গান্ধীর এই ভাষণের জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে বিজেপি-তে আজ দিনভর আলোচনা আর তৎপরতা চলেছে।

বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের মত ছিল, জন্মসূত্রে ইটালিয়ান একজন ভদ্রমহিলা, যিনি এদেশে বিয়ে করে আসার অনেক বছর পরেও ভারতীয় পাসপোর্ট নেননি, তিনি ভারতীয়দের কাছে ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করছেন – এটার কোনও জবাব দেওয়ারই দরকার নেই, মানুষই ঠিক যা বোঝার বুঝে নেবেন।

তবে সোনিয়া গান্ধীর বিদেশিনী পরিচয়কে প্রচারে আর ইস্যু করা হবে না, বিজেপি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আগেই – তাই বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং আজ সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় শুধু বলেন, ভারতীয়ত্ব কী সেটা আগে সোনিয়া গান্ধীকে শিখতে হবে।

পরে বিকেলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিজেপি নেতা প্রকাশ জাভরেকর বিভেদমূলক রাজনীতির প্রসঙ্গে বলেন, ‘কংগ্রেসই এদেশে চিরকাল বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি করে এসেছে – আর এখন দেখা যাচ্ছে উল্টে চোরই দারোগার ওপর চোটপাট করছে।’

মি জাভরেকর আরও বলেন, ‘যারা ধর্মের নামে ভোট না-ভাগ করার আহ্বান জানায়, শিখদের ওপর গণহত্যা চালায়, আসাম থেকে ভাগলপুর দাঙ্গা বাঁধায়, অন্ধ্রপ্রদেশ ভাগ করতে গিয়ে রাজ্যের মানুষকে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয় – বিজ্ঞাপনের ছলে জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাদের এই ভাষণ লোকে বিশ্বাস করবে না।’

নরেন্দ্র মোদী নিজে এখনও সোনিয়া গান্ধীর তোলা অভিযোগের সরাসরি কোনও জবাব দেননি। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের ধারণা, চলতি নির্বাচনের পলিটিক্যাল ডিসকোর্স বা রাজনৈতিক চর্চায় সোনিয়া গান্ধীর তোলা ভারতীয়ত্বর ইস্যু অবশ্যই একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে – কিন্তু ভোটে সেটা কংগ্রেসকে ফায়দা দেবে, না কি তাদের জন্য হিতে বিপরীত হবে সেটা বলা খুব মুশকিল।