উত্তর ভারতে জাতপাতের রাজনীতি কী চেহারায়?

  • ৬ মে ২০১৪
টেলিভিশনে ভোটের খবর
Image caption টেলিভিশনে ভোটের খবর

ভারতে, প্রধানত উত্তর ভারতের রাজনীতিতে একটি প্রধান অনুষঙ্গ হল জাতপাত।

ভারতের হিন্দু সমাজে বর্ণাশ্রম বা জাতিভেদের পরিণতিতে যে নানা জাতের আবির্ভাব – সেই প্রতিটি জাতই আজ বলা যেতে পারে কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলে পরিচিত।

কিন্তু এই ২০১৪ সালের নির্বাচনে এসে জাতপাতের রাজনীতি কী চেহারা নিয়েছে? জাতপাতের অঙ্ককে কোন দলই বা কীভাবে কাজে লাগাতে চাইছে?

সমস্যাটা দেশের যে সব রাজ্যে সবচেয়ে প্রকট, তারই অন্যতম উত্তরপ্রদেশে গিয়েছিলাম এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে।

Image copyright bbc
Image caption উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচার

জাতভিত্তিক ভাগাভাগি

উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলিতে মহাধূমধামে চলছে ভোটের প্রচার। সোনিয়া গান্ধী এই কেন্দ্রের সাংসদ – হাইপ্রোফাইল এই আসনটিতে দেশবিদেশের মিডিয়ারও তীক্ষ্ণ নজর, কিন্তু তারপরেও রাজ্যের বাকি আর সব আসনের মতোই জাতপাতের সমীকরণ থেকে মুক্ত নয় এই রায়বেরিলিও।

কংগ্রেস নেতা ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সত্যদেও ত্রিপাঠী প্রবল আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ''কী করা যাবে, গত ৩৫ বছর উত্তরপ্রদেশ আর বিহার এই দুটো রাজ্যই যে জাতপাতের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে আছে।''

''সব দলই কোনও না কোনও একটা বিশেষ জাতকে তুষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই কারণেই কংগ্রেস এ রাজ্যে দুর্বল, কারণ কোনও একটা জাতের মধ্যে তারা জনভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।'' স্বীকার করে নেন মি ত্রিপাঠী।

অথচ এককালে সব জাতের মধ্যেই কংগ্রেসের সমর্থন ছিল। কিন্তু গত তিন দশকে তা খানখান হয়ে গেছে।

ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণীয়রা বিজেপি-র হিন্দুত্ব এজেন্ডার টানে তাদের দিকে ঝুঁকেছেন, যাদব ও অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণী বা ওবিসি-রা গিয়ে ভিড় করেছেন মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টিতে।

Image copyright PTI
Image caption বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী

আর প্রথমে কাঁসিরাম আর পরে মায়াবতীর নেতৃত্বে দলিতরা যেভাবে বহুজন সমাজ পার্টির নীল পতাকার নিচে জড়ো হয়েছেন, তা তো এখন ইতিহাস!

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

রায়বেরিলির কাছে দোস্তপুর গ্রামের এক বাসিন্দা খুব সহজে বুঝিয়ে দেন জাতপাতের রাজনীতির এই অঙ্কটা, ''দেখুন, দলের প্রধান নেতা যে জাতের - তিনি তো তার জাতের লোকজনকে অকৃষ্ট করবেনই। জনতাও চাইবে তার জাতের নেতা জিতুন। সে তিনি মায়াবতীই হোন, বা মুলায়ম।''

সেই সঙ্গেই তিনি বলেন, ''কিন্তু বিশ্বাস করুন, ছোটবেলায় এসব কিছু বুঝতামই না – আমাদের নেতারাই এই জাতের অঙ্ক আমাদের বুঝিয়েছেন, সেই অনুযায়ী তৈরি হয়ে গেছে জাতপাতের সমীকরণ।''

ভোটে ফায়দা লুটতে উত্তরপ্রদেশে রাজনীতিকরা জাতপাতের যে জটিল অঙ্ক কষে থাকেন – তার একটা গালভারী নামও আছে, ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।

রাজ্যের কোথায় কোন কোন জাতকে কাছাকাছি আনতে পারলে বাজিমাত করা যাবে, এই বিদ্যা সেটাই শেখায়। প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শীতলানারায়ণ সিং মনে করেন, এই বিদ্যায় গত দুই দশকে যিনি সবচেয়ে নিপুণতা দেখিয়েছেন তার নাম মায়াবতী।

মি. সিং বলছিলেন, ''২০০৭-র আগে মায়াবতীর শ্লোগান ছিল তিলক, তরাজু আর তলোয়ার – মারো এদের জুতো চার! অর্থাৎ কিনা, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য আর ক্ষত্রিয়কে জুতোপেটা করে তিনি খালি শূদ্র বা দলিতদের উত্থানের কথা বলতেন।''

''কিন্তু পরে ভোটে আর সুবিধে হচ্ছে না দেখে তিনি বারে বারে তার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফর্মুলা বদলেছেন। এখন যেমন তার শ্লোগান বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়, অর্থাৎ সব জাতকে নিয়ে চলতে হবে। এতে অবশ্য ইঞ্জিনিয়ারিং কম, অঙ্কই বেশি।''

‘সংখ্যা গুনব, না ঘিলু!’

আসলে উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে - যেখানে সমাজ এখনও মূলত কৃষিভিত্তিক ও সামন্ততান্ত্রিক, শিল্পের রমরমা কম - সেখানে জাতপাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা আজও খুব কঠিন।

গত প্রায় ৫০ বছর ধরে লখনোউ-তে শিক্ষকতা করেছেন অধ্যাপক গোপাল চক্রবর্তী, তার অভিজ্ঞতা আবার বলছে ইদানীংকালেই জাতপাতের দাপট বেড়েছে বেশি।

তিনি বলছিলেন, ''যখন আমি পড়াতাম বা ছাত্র ছিলাম তখন এই সব কে যাদব, কে কোন জাত আদৌ বুঝতাম না। এই জাতপাতের ব্যাপারটা শুরু হয়েছে গত ২৫ বা ৩০ বছরে।''

''কিন্তু যেহেতু নিম্নবর্ণীয়দের সংখ্যা আমাদের উচ্চবর্ণীয়দের চেয়ে বেশি, তারা এখন দিব্বি বুঝে গেছে সংখ্যার জোরেই দিব্বি তারা শাসন করতে পারে, আমাদের রুল করতে পারে।''

''মুশকিল হল গণতন্ত্রে শুধু মাথা গোনা হয় – মাথার ভেতর কী আছে সেটা গোনা হয় না! আমার দিকে এই এক-দুই-তিন-চারজন আছেন, তাই আমিই জিতব, না-ই বা থাকল তাদের মাথায় ঘিলু!''

প্রবীণ অধ্যাপকের সঙ্গে অনেকেই হয়তো একমত হবেন না – কিন্তু রাজ্যে জাতপাতের শেকড় আসলে কতটা গভীরে ও কতটা জটিল, তা এই মন্তব্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না।

Image copyright bbc
Image caption বিজেপি নেতা যশবন্ত সিনহা

জাতপাত নয়, উন্নয়ন

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবারের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে জাতপাতের এই হিসেবটা সবচেয়ে ভাল কষেছে বিজেপি। ব্রাহ্মণ বা ঠাকুরদের মতো উচ্চবর্ণীয়দের সঙ্গে লোধ, গোন্ড, কুর্মি ইত্যাদি নিম্নবর্ণীয়দের কাছাকাছি এনে তারাই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।

আর হয়তো সে কারণেই বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতা যশবন্ত সিনহা প্রবল আস্থার সঙ্গে বলছেন, জাতপাত এবারে কোনও ব্যাপারই নয়।

লখনোউতে দলের সদর দফতরে বসে দেশের প্রাক্তন এই অর্থমন্ত্রী আমাকে বলছিলেন, ''জাতের সমীকরণ এই নির্বাচনে কোনও ফ্যাক্টরই নয় – কারণ মানুষ উন্নয়নের জন্য মুখিয়ে আছে।''

''দেখবেন, উত্তরপ্রদেশের বিচক্ষণ জনতাও প্রার্থীর জাত দেখে ভোট দেবেন না – যারা দেশের উন্নয়ন করবে সেই দলকেই ভোট দেবে।''

উত্তরপ্রদেশকে যারা এতটুকুও চেনেন, তারা সবাই কিন্তু বলবেন ২০১৪ সালে অন্তত এ কথাটায় এতটুকুও সত্যি নেই, ৫০ বছর পরে কী হবে তা অন্য কথা।

অগত্যা এই নির্বাচনেও প্রতিটি কেন্দ্রেই চলছে যাদব-ঠাকুর-কুর্মি বা দলিত ভোটের আলাদা আলাদা হিসেবনিকেষ – যার শেষ কবে, উত্তরপ্রদেশের কাছে আপাতত তার কোনও উত্তর নেই।