ভারতে বাংলাদেশী অভিবাসীরা ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার?

  • ৩১ জুলাই ২০১৪
ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption আসামে বাঙ্গালী মুসলিমদের প্রায়ই আক্রমণের মুখে পড়তে হয়, গৃহহীন হতে হয়।

ভারতের মধ্যপ্রদেশ সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছে যে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত তারা অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার বাংলাদেশীকে তাদের রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ ও নাগরিকত্বর ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

এদের প্রায় সকলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে জানা গিয়েছে।

অন্য দিকে ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্য জানিয়েছে, তারা গত পাঁচ বছরে প্রায় আট হাজারের মতো কথিত বাংলাদেশী ‘অনুপ্রবেশকারী’-কে ফেরত পাঠিয়েছে, যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশই মুসলিম।

সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে এই সব তথ্য সামনে এসেছে, তবে এই মামলায় এখনও দেশের বেশির ভাগ রাজ্যই তাদের পরিস্থিতি জানায়নি।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা হিন্দু ও মুসলিমদের ক্ষেত্রে তাদের নীতি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে, ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি সে কথা কখনওই গোপন করেনি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মাস কয়েক আগেই বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় বারে বারে বলেছেন, ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসবেন সেই হিন্দুদের জন্য ভারতের দ্বার অবারিত থাকবে।

কিন্তু অন্যরা অনুপ্রবেশকারী বলে গণ্য হবেন, এবং তাদের ফেরত পাঠাতে তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর থাকবে।

ছবির কপিরাইট Getty
Image caption ভারতের মুসলিম নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

এমন কী, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের চাপ যে শুধু আসামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যকেই সামলাতে হবে না, বরং সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে, ফেব্রুয়ারি মাসে শিলচরে এক জনসভায় সে কথাও স্পষ্ট জানিয়ে দেন মি মোদী।

তিনি সেদিন বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুদের খেদিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের বোঝা শুধু যদি আসামকে ওঠাতে হয় তাহলে সেটা অন্যায় হবে।

“সারা ভারতে তাদের রুটিরুজি, বাচ্চাদের পড়াশুনো আর জীবনধারণের ব্যবস্থা করা গেলে আসামের সমস্যার যেমন সমাধান হবে, তেমনি বাংলাদেশে দুর্দশার শিকার হচ্ছেন যারা তারাও সুরাহা পাবেন,” বলেন মি: মোদী।

মি মোদীর সেই বক্তৃতার পাঁচ মাসের মাথায় এসে জানা যাচ্ছে, মধ্যপ্রদেশের মতো কোনও কোনও বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলাদেশী হিন্দুদের পুনর্বাসনের সেই প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে।

স্বজন ও বিমলাংশু রায় ফাউন্ডেশন নামে দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দায়ের করা এক জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে মধ্যপ্রদেশ সরকার সুপ্রিম কোর্টে যে হলফনামা জমা দিয়েছে, তা থেকে জানা যাচ্ছে রাজ্যের পাঁচটি জেলায় এরই মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো বাংলাদেশীকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই জেলাগুলো হল মান্দসওর, বেতুল, দেওয়াস, মোরেনা ও খান্ডওয়া। হলফনামায় তাদের ধর্ম নিয়ে কিছু বলা হয়নি, তবে রাজ্য সরকারের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে এদের মধ্যে একজনও মুসলিম নেই।

মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী শুভদীপ রায় বিবিসি বাংলাকে বলেন, তাদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রদেশ সরকার জানিয়েছে সে রাজ্যের পাঁচটি জেলায় সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো বাংলাদেশীকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।

“এরা কৃষিজমি পেয়েছেন, তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা তাদের ভারতীয় নাগরিকত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছে,” তিনি বলেন।

“দুয়েকটি জেলায় রেশন কার্ড দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে,” মি: রায় বলেন।

সোজা কথায়, বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশে বাংলাদেশী হিন্দুরা পুরাদস্তুর একটা পুনর্বাসন প্যাকেজ পেয়েছেন।

অথচ একই মামলায় বামপন্থী-শাসিত ত্রিপুরার হলফনামা বলছে, গত পাঁচ বছরে তারা ৭,৭৩৫ জন কথিত অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৫,০২২জনই মুসলিম।

উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্য আবার বলেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ২৮জন বাংলাদেশী তাদের রাজ্যে স্থায়ীভাবে বাস করছেন।

উত্তরাখন্ড দাবি করছে তাদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা শূন্য।

ওই মামলায় দেশের মোট ১৮টি রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে পক্ষ করা হলেও এযাবৎ মোটে চারটি রাজ্যই বাংলাদেশীদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান জানিয়েছে।

কিন্তু আগামী জানুয়ারি মাসে চূড়ান্ত শুনানির সময় সব রাজ্যকেই তাদের পরিস্থিতি জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।

ভারতে বাংলাদেশী হিন্দুরা ঠিক কতটা আতিথেয়তা পাচ্ছেন এবং মুসলিমদের ক্ষেত্রে কতটা বৈষম্য করা হচ্ছে, সেই পূর্ণাঙ্গ ছবিটা সম্ভবত তখনই স্পষ্ট হবে।