বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথে এত দুর্ঘটনার দায় কার

dhaka_sadarghat
Image caption ঢাকার সদরঘাট নদীবন্দর দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী লঞ্চে যাতায়াত করে।

সরকারি হিসেবেই বাংলাদেশের মানুষের ৩৫ ভাগ যাতায়াতই সম্পন্ন হয় নৌপথে। আর এই নৌপথেই লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর মারা যায় শত-শত মানুষ।

এধরণের দুর্ঘটনা খুব নিয়মিতভাবে হলেও, এবিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে খুব সামান্যই।

এখনো প্রচুর লঞ্চ রয়েছে ফিটনেসবিহীন, জীবন রক্ষাকারী যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই অধিকাংশ লঞ্চে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও এসব লঞ্চে যাত্রী পরিবহণ করা হয়।

ঢাকার সদরঘাটের ব্যস্ত নদীবন্দর দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন হাজার-হাজার যাত্রী।

তবে তাদের সেই যাত্রা সবসময় নিরাপদে সম্পন্ন হয় না। জীবনের ঝুঁকির কথা জেনেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়ও যাতায়াত করেন লঞ্চের যাত্রীরা।

ঢাকা থেকে চাঁদপুর এবং মতলবের রুটটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলির একটি।

"এখানে লাইফ জ্যাকেট বা বয়া কিছুই নাই। তারা কিছুই সংরক্ষণ করে রাখে নাই। কোন দুর্ঘটনায় পড়লে আমরা কি করবো কিছুই জানি না।"

চাঁদপুরগামী একটি লঞ্চ ছাড়ার আগমুহূর্তে একজন যাত্রী বলছিলেন একথা।

যাত্রীদের ভাষ্যমতে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলে তারা কি করবেন, লঞ্চটিতে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট এবং বয়া আছে কিনা কিংবা থাকলেও সেটি কোথায় পাওয়া যাবে সেসম্পর্কে কোন ধারণাই তাদের নেই।

লঞ্চটির মাস্টার খায়রুল ইসলাম অবশ্য দাবী করছেন, প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই তার লঞ্চে আছে। কিন্তু সেটি যাত্রীরা কিভাবে পাবে?

"এই রুটে তো অতবেশি দুর্ঘটনা হয় না। আর আগে আমরা তাদেরকে লাইফ জ্যাকেট কোথায় আছে দেখিয়ে দিই।" বলেন মি. ইসলাম।

বেসরকারি সংস্থা কোস্টের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশে ৪০০ টিরও বেশী নৌ দুর্ঘটনায় মারা গেছে পাঁচ হাজারেরও বেশী মানুষ। যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার কারণগুলো একই ধরণের।

"দুর্ঘটনার মূল কারণ অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা। গত তিনটি দুর্ঘটনাতেই লঞ্চের নকশা ছিল অবৈধ। তিনটি লঞ্চেই যাত্রী ধারণ করেছিল ধারণক্ষমতার বেশি। তাহলে এই লঞ্চগুলোর চলাচলের তদারকি যারা করতো, তাদের ভূমিকা কি ছিল? এখানেই মূল ঘটনাটি ভেসে আসে। এছাড়াও ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী ১০০ টি লঞ্চের মধ্যে লাইসেন্সধারী চালক আছে মাত্র ১৩ জন। এখানেও আমাদের বড় ঘাটতি রয়েছে।"

Image caption যাত্রীদের হাতের কাছে এধরণের বয়া খুব কমই দেখা যায়।

বলছিলেন কোস্টের গবেষক মুজিবুল হক মুনির। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে সরকারী সংস্থাগুলোর গাফিলতি থেকে শুরু করে নানা কারণ দায়ী।তারপরও এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০ হাজারেরও বেশী নৌযান রয়েছে, যার মধ্যে ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে মাত্র ৯ হাজারের।

এসব ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়ার দায়িত্ব সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের। কিন্তু এই কাজের জন্য তাদের জরিপকারী রয়েছেন মাত্র ৪ জন।

অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন ধরণের পরিদর্শন ছাড়াই শুধুমাত্র মালিকের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এনিয়ে ব্যাপক দুর্নীতিরও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ খোদ নৌপরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খানও অস্বীকার করছেন না।

"ফিটনেস ছাড়া লঞ্চ চলবে না এটা আইন। কিন্তু দেখা যায়, সমস্ত লঞ্চই ফিটনেস করে ফেলে। যারা মালিক তারা কোন না কোনভাবে ফিটনেস সনদ বা একটা টোকেন নিয়ে নেয়।" বলেন নৌমন্ত্রী মি. খান।

সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান জরিপকারী মির্জা সাইফুর রহমানও বললেন তাদের লোকবল সংকটের কথা। তিনি বলছিলেন, জরিপকারীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য একটি নতুন সাংগঠনিক কাঠামো এখন তৈরি হচ্ছে। তবে ৪ জন জরিপকারী নিয়ে সরেজমিনে কিভাবে ফিটনেস সনদ দেয়া সম্ভব? জানতে চাইলে মি. রহমান দাবী করেন, তারা সরজমিনে দেখেই ফিটনেস সনদ দেন।

"সরেজমিনে না দেখে আমরা নরম্যালি ফিটনেস সনদ দেই না। যাত্রীবাহী নৌযানের ক্ষেত্রে এর ব্যাত্যয় হয় না। যাত্রীবাহী নৌযান আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখি। ", বলেন মি. রহমান।

বাংলাদেশে চলাচলকারী লঞ্চগুলোতে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার অনেক সরঞ্জামই এখনো পর্যন্ত নেই।

Image caption লঞ্চের চালকের কক্ষ। জিপিএস থাকলেও রাডার নেই।

যেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া লঞ্চডুবির একটি মূল কারণ, সেই আবহাওয়ার খবরাখবরের জন্য নির্ভর করতে হয় রেডিও সংবাদের ওপরে কিংবা আবহাওয়া অফিসে টেলিফোন করে। সার্বক্ষণিক ওয়ারল্যাস যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা লঞ্চগুলোতে নেই।

কিছু কিছু লঞ্চে এখন জিপিএস ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হলেও, দুয়েকটি বড় লঞ্চ ছাড়া অন্য কোন লঞ্চেই রাডারের ব্যবস্থা নেই।

হাতিয়াগামী একটি লঞ্চের ডেকে বসে কথা হলো ইনচার্জ মাস্টার জালাল আহমেদের সাথে। তিনি বলছিলেন অন্যান্য লঞ্চের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে রাডার কিংবা চরে আটকে যাওয়া ঠেকাতে নদীর গভীরতা মাপার যন্ত্র লঞ্চগুলোতে সংযোজন করা প্রয়োজন।

"এগুলো সংযোজন হলে সবগুলো জাহাজের জন্যই নিরাপদ হয়।" বলেন মি. আহমেদ।

লঞ্চ দুর্ঘটনার পর দোষী সাব্যস্ত হলে মালিক, চালক কিংবা জরিপকারীর বিরুদ্ধে কিছু আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। যদিও, এধরণের আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নজির খুবই কম।

১৯৭৬ সালের আইন অনুযায়ী, লঞ্চ দুর্ঘটনায় দোষী মালিকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল, ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।

তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুধু জরিমানার টাকা দিয়েই পার পেয়ে যান মালিকেরা।

কোস্টের গবেষক মুজিবুল হক মুনির বলছিলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর সরকার থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই তদন্ত প্রতিবেদনের খোজ পাওয়া যায় না এবং যেসব প্রতিবেদনে বিভিন্ন সুপারিশ এসেছে সেগুলোও আমলে নেয়া হয়নি।

"৫০০ টির বেশি তদন্ত কমিটি হয়েছে এবং তিনটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বাকিগুলো কি হয়েছে আমরা জানি না। আর সরকারী কর্মকর্তারাই এই তদন্ত করেন এবং গাফিলতি নিয়ে অভিযুক্তরাও সরকারী কর্মকর্তা। যেকারণে এসব ধামাচাপা দেয়ার একটি বিষয় চলে আসে। "

লঞ্চ চলাচলে অনিয়মের জন্য লঞ্চ মালিকদের যে একটি প্রভাব রয়েছে সেটি সংশ্লিষ্ট অনেকেই অভিযোগ করছেন। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানও বিষয়টি স্বীকার করছেন।

Image caption সদরঘাটে সেতু পার হয়ে পল্টুনে যাচ্ছেন যাত্রীরা।

তবে তিনি বলছেন, তাদের সময়ে লঞ্চ দুর্ঘটনা আগের চেয়ে কমেছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে যাত্রীদেরও সতর্ক হতে বলছেন মি. খান।

"আমরা বারবার সতর্ক করেছি ঈদের আগে। যাত্রী ভাইদের অনুরোধ করেছি যে আপনারা অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে ভ্রমণ করবেন না। এই বিষয়ে কিন্তু সতর্ক তাদেরকেও থাকতে হবে।" বলেন মি. খান।

নৌমন্ত্রী দাবী করছেন, তাদের সময়ে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তবে প্রতিবছরই লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত মানুষ।

আর এরপরও নদীগুলোতে চলছে ফিটনেসবিহীন এবং জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামবিহীন শত-শত নৌযান।

যাত্রীরা যেমনটা বলছিলেন, নিরুপায় হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের চলাচল করতে হচ্ছে এবং কবে তারা নৌযাত্রায় নিরাপদবোধ করতে পারবেন কিংবা আদৌ কখনো পারবেন কিনা সেসম্পর্কেও তাদের কোন ধারণা নেই।