দিল্লির আপত্তি সত্ত্বেও কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের বৈঠক

  • ১৯ অগাস্ট ২০১৪
ছবির কপিরাইট BBC World Service
Image caption হুরিয়ন নেতা মিরওয়াজ ওমর ফারুক

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে দিল্লিতে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের বৈঠককে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরও কাশ্মীরী নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানের ওই বৈঠক হচ্ছে।

হুরিয়ত কনফারেন্স নেতা মিরওয়াজ ওমর ফারুক আজ দিল্লিতে পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিতের সঙ্গে দেখাও করছেন। তবে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই এই বৈঠকের রেওয়াজ চালু থাকার পরও কেন ভারত এই যুক্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাই পুরোপুরি বাতিল করে দিল, তা পর্যবেক্ষকদেরও ধন্দে ফেলেছে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আগে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ প্রায় নিয়ম করেই ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে দেখা করে থাকেন – আর গত কয়েক বছরে তা প্রায় রুটিনে পরিণত হয়েছে।

২০০১ সালে আগ্রা শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে এসে তখনকার পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফও একই কাজ করেছিলেন – এবং তখন ক্ষমতায় থাকা অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকার তাতে আপত্তি জানায়নি, সম্মেলনও বাতিল হয়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন বলেছেন, ভারত যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করার জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানি হাইকমিশনারের তথাকথিত হুরিয়ত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা পাকিস্তানের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। এবং মনে করছি এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবের আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদ গিয়ে কোনও লাভ হবে না।

কিন্তু এতদিন ভারত যে বৈঠকের ব্যাপারে একরকম চোখ বুজে থেকেছে বা উপেক্ষা করেছে – হঠাৎ সেটাকে কেন তারা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে?

ইতিহাসবিদ ও কাশ্মীর-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কিংশুক চ্যাটার্জি মনে করেন এর পেছনে কূটনৈতিক কারণ কম, রাজনৈতিক কারণই বেশি।

‘এটা সম্ভবত যত না পাকিস্তানের জন্য, তার চেয়েও বেশি দেশের ভেতরে বিজেপি-র সমর্থকদের জন্য। কারণ হুরিয়তের সঙ্গে কথা বললে আমাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না – ভারতের এই যুক্তিটাই খুব অদ্ভুত আর জটিল।’

ড: চ্যাটার্জি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পাকিস্তান চিরকালই বলে থাকে কাশ্মীর সমস্যা আসলে ত্রিপাক্ষিক – আর ভারতের মতে এর নিষ্পত্তির ভার শুধুমাত্র ভারত-পাকিস্তানের। এই অবস্থানের ভিন্নতার জন্যই কিন্তু এতকাল এর সমাধানের পথে কোনও অগ্রগতি হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে হুরিয়ত নেতারাও বলছেন, এতদিন ধরে চলে-আসা একটা রীতি আচমকা বন্ধ করার চেষ্টা ভারতের ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছু নয়।

হুরিয়ত কনফারেন্সের প্রবীণ নেতা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির যুক্তি হল, ‘এমনটা করার কোনও কারণই থাকতে পারে না – কারণ বহু বছর ধরে আমরা পাকিস্তান দূতাবাসে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে, প্রয়োজন হলেই আমরা ওখানে যাই এবং কেউ কোনও দিন এর ওপর নিষেধাজ্ঞাও চাপায়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার যে সিদ্ধান্ত নিল তা সম্পূর্ণ অন্যায়, অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক।’

তবে নরেন্দ্র মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতাও দায়ী বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। যেভাবে পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তুঙ্গে উঠছে, তাতে এই মুহুর্তে সেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না-হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

পাশাপাশি বিজেপি সরকারেরও একটা চেষ্টা ছিল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা থেকে পিছু হঠার – মনে করছেন কিংশুক চ্যাটার্জি। তার বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদী সরকার তড়িঘড়ি পাকিস্তানের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর হঠাৎ যেন আবিষ্কার করেছে আলোচনা করার মতো তেমন কিছুই নেই!

সে ক্ষেত্রে হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বৈঠককেই আলোচনা বাতিল করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তাঁর ধারণা। আসল কারণটা যাই হোক, এরপর ভারত-পাকিস্তান শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা যে আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল এবং কাশ্মীরের হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে ভারত সরকারের দূরত্ব আরও বাড়ল – তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই!