আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৮৪টি কারখানা বন্ধ

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
পোশাক শ্রমিকরা বলছেন বেতন দিয়ে তারা খরচ পোষাতে পারছেন না।
ছবির ক্যাপশান,

পোশাক শ্রমিকরা বলছেন বেতন দিয়ে তারা খরচ পোষাতে পারছেন না। (ফাইল ছবি)

বাংলাদেশের ঢাকার কাছে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এ পর্যন্ত ৮৪টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সেখানে একটি কারখানার ১২১জন শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিশজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

এসব কারখানায় দুই লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করে। কারখানা বন্ধ রাখার কারণে, সহিংসতার আশংকায় আশুলিয়া এলাকায় পুলিশ ও র‍্যাবের পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ে সেখানকার শ্রমিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্ধ কারখানাগুলো মূল গেটেই কারখানা বন্ধ রাখার নোটিশ লাগানো হয়েছে। এসব কারখানার সামনে পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। শ্রমিকরা যেন বাড়ি থেকে বের না হন, তারা যেন জমায়েত না হন এবং কারখানায় না আসেন , এসব বক্তব্য মাইক দিয়ে পুলিশ বার বার ঘোষণা করছে গোটা ঐ এলাকায়।

এমন পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধ রাখার প্রথম দিনে অনেক শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রের ধারেকাছেই আসেননি। শ্রমিকদের অনেকের মধ্যেই পুলিশি হয়রানির ভয় তৈরি হয়েছে।

অনেকে সকালে কারখানায় এসে কারখানা বন্ধ দেখে ফেরত চলে গেছে।

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় উইন্ডি অ্যাপারেলস নামে যে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সপ্তাহখানেক আগে বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, কর্মবিরতির প্রথম থেকে শুরু করে এখনকার পরিস্থিতিতে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে ওই কারখানার কর্তৃপক্ষ ১২১জন শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং ২০জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

ছবির ক্যাপশান,

ন্যূনতম বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে আগেও।

কারখানাটির একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বেতন বাড়ানোর দাবির সঙ্গে তিনিও একমত। কিন্তু তাদের কারখানায় কর্মবিরতি শুরু হয়েছিল অনেকটা আকস্মিক ভাবে।

একের পর এক কারখানায় সেই আন্দোলন কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে, নেতৃত্বে কারা আছেন, এটা কোন সংঘবদ্ধ উদ্যোগ কিনা, এসব প্রশ্নে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের কাছে সঠিক কোন জবাব নেই।

তাদের অনেকে নিজেরা বুঝতেই পারেননি, কিভাবে কর্মবিরতিতে গেলেন।

অনেকে বলেছেন, কানাঘুষা থেকে এক কারখানা থেকে আরেক কারখানায় খবর ছড়িয়ে পড়েছে। সেভাবেই এমন পরিস্থিতি হয়েছে।

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পরিসংখ্যান

আরও পড়তে পারেন:

আন্দোলন নিয়ে যে প্রশ্নই তোলা হোক না কেন, বন্ধ করে দেয়া কারখানার বেশিরভাগ শ্রমিকই বেতন বাড়ানোর দাবিতে একমত পোষণ করেন। যদিও মালিকরা তিনবছর আগে মজুরি কমিশন ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী প্রতিবছর পাঁচশতাংশ হারে বেতন বাড়ানোর যুক্তি দেখাচ্ছেন। শ্রমিকরা তা মানতে রাজি নন।

কয়েকজন শ্রমিক বলছিলেন, "আমাদের দুই টাকা বেতন দিয়ে, পাঁচটাকার কাজ করে নেবে, এটা তো আর আমরা মেনে নেবো না। আমরা কথা বললেই আমাদের ছাঁটাই করা হয়। আমাদের বেতন বছরে দুইশ টাকা বাড়ায়, কিন্তু বাড়িভাড়া বেড়ে যায় তার চেয়েও বেশি, আর অন্য খরচ তো আছেই। সেজন্য আমরা আন্দোলন করছি।"

মালিকরা কারখানা বন্ধ করে দেয়ায় শ্রমিকদের অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু অনেকে আবার চিন্তিত নন। তারা মনে করেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কারখানা নির্মাণ করে, মালিকরা কতদিন কারখানা বন্ধ রাখবেন, সেটা তারা দেখতে চান। শ্রমিকরা তাদের বেতন বাড়ানার প্রশ্নে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধান চান।

ছবির ক্যাপশান,

বন্ধ করা কারখানার সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

কিন্তু মালিকরা শক্তভাবে এই আন্দোলন দমন করতে চাইছেন।

মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র একজন নেতা, ফারুক হাসান বলেছেন, "একসপ্তাহ ধরে মালিকরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছেন। সে কারণে মালিকপক্ষ এখন সমঝোতা বা আলোচনার কোন উদ্যোগ নেবে না।"

তিনি আরো জানিয়েছেন, যে কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে চাইবে, সেই কারখানা তখন চালু করে শ্রমিকদের বক্তব্য নিয়ে তারা আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু যে কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে চাইবে না, সেগুলো তারা সহসা চালুই করবেন না।

তারা আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার কথাও তুলে ধরছেন।