তামিলনাডুতে পরিস্থিতি কেন অগ্নিগর্ভ?

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ছবির ক্যাপশান,

হাসপাতালে আহত বিক্ষোভকারীদের একাংশ।

দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাডুতে মঙ্গলবার পুলিশের গুলিতে অন্তত ১১জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর গোটা রাজ্য জুড়ে তুমুল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

রাজ্যের বিরোধী দলগুলি প্রায় এক সুরে বলছে, এটা ঠাণ্ডা মাথায় ঘটানো একটা হত্যাকাণ্ড - আর কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী একে তুলনা করেছেন 'রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাসে'র সঙ্গে।

ওই বিক্ষোভকারীরা যখন তুতিকোরিনের কাছে স্টারলাইট শিল্পগোষ্ঠীর একটি বিতর্কিত তামা কারখানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, তখনই তাদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়।

বুধবারও গুলিবিদ্ধদের মধ্যে একজন মারা গেছেন, আর আদালত নির্দেশ দিয়েছে নিহতদের প্রত্যেকের দেহ তদন্তের স্বার্থে সংরক্ষিত রাখতে হবে।

তামিলনাডুতে তুতিকোরিনের কাছে স্টারলাইটের কপার স্মেল্টিং কারখানা - অর্থাৎ যেখানে আকরিক থেকে তামা নিষ্কাশনের কাজ হয় - সেটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন গত প্রায় ২৫ বছর ধরে।

এই কারখানা আশেপাশের এলাকায় দূষণ ছড়াচ্ছে, মানুষজন জটিল রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন - এই সব অভিযোগে তাদের শেষ দফার আন্দোলন গতকালই ১০০ দিনে পা দিয়েছিল, আর সে দিনই পুলিশের গুলিতে মারা যান কমপক্ষে ১১ জন বিক্ষোভকারী।

বিরোধী দল ডিএমকে-র নেতা এ সর্বানন বলছেন, "তামিলনাডুর পুলিশ যে এভাবে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে পারে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। আর বিক্ষোভকারীদের হিংসা রুখতে নয়, রীতিমতো পরিকল্পনা করে বেছে বেছে আন্দোলনের নেতাদেরই গুলি করা হয়েছিল।"

ছবির ক্যাপশান,

বিক্ষোভকারীকে পুলিশের বেধড়ক পিটুনি।

আরো দেখুন:

পিএমকে নেতা আম্বুমোনি রামোদাস বলছেন, "এই পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে হত্যা মামলা দায়ের করতে হবে - সাসপেন্ড করতে হবে জেলার পুলিশ সুপার ও প্রশাসককে। আর সরকার যে বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, সেটা মোটেই যথেষ্ট নয় - ইস্তফা দিতে হবে মুখ্যমন্ত্রী পালানিস্বামীকে।"

এদিকে পুলিশের গুলিতে নিহতদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য তুতিকোরিনে রাজনৈতিক নেতাদের ভিড় শুরু হয়ে গেছে সকাল থেকেই।

দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন সদ্য রাজনীতিতে পা-রাখা অভিনেতা কমল হাসন।

সাতসকালে গিয়ে তাদের সমবেদনা জানিয়ে এসেছেন এমডিএমকে নেতা ভাইকোও, তিনি দোষী পুলিশকর্মীদের ও তাদের যারা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।

ডিএমকে-র কার্যকরী সভাপতি স্টালিনও বিকেলে ছুটে গেছেন তুতিকোরিনে, বিবৃতি দিতে পিছিয়ে থাকেননি তামিল সুপারস্টার রজনীকান্তও।

ছবির ক্যাপশান,

এখনও বিক্ষোভ-উত্তেজনা চলছে কারফিউ অগ্রাহ্য করেই।

রজনীকান্ত যেমন এই প্রাণহানির জন্য তামিলনাডু সরকারকে দায়ী করেছেন, তেমনি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তামিল ভাষায় টুইট করেছেন, "তামিলরা আরএসএসের আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই তাদের ওপর এভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে।"

এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে বিজেপির তামিল নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী অবশ্য বলছেন, "অতীতেও দেখা গেছে তামিলনাডুতে বিভিন্ন আন্দোলনে জিহাদি, নকশাল, এলটিটিই বা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঢুকে পড়েছে। জাল্লিকাট্টুর পক্ষে আন্দোলনে তো জিহাদিরা ঢুকে পড়ে মেরিনা বিচে বিফ রান্না করেও খেয়েছে।"

"কাজেই রাহুল গান্ধী বললেই তো হল না, তুতিকোরিনে কোনও আরএসএসের অস্তিত্বই নেই", পাল্টা বক্তব্য মি. স্বামীর।

তামিলনাড়ুর ক্যাবিনেট মন্ত্রী ডি জয়াকুমারও বলছেন, "২০১৩ থেকেই সরকারের অবস্থান হল রাজ্যে স্টারলাইটের কারখানা থাকা চলবে না, আর সেই মামলা এখন সুপ্রিম কোর্টে। কাজেই এই প্রশ্নে সরকার মানুষের পাশেই আছে, তারপরও কেন আন্দোলনের নামে হিংসা হল - আমাদেরও প্রশ্ন সেটাই।"

আন্দোলনে বাইরের লোকজন ঢুকে হিংসায় মদত দিয়েছে ও সে কারণেই পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে - কোণঠাসা রাজ্য সরকার স্পষ্টতই এখন এমন একটা তত্ত্ব খাড়া করতে চাইছে।

কিন্তু ১১ জনের মৃত্যুর পর তুতিকোরিন সে কথা মানতে প্রস্তুত নয়, এলাকায় এখনও বিক্ষোভ-উত্তেজনা চলছে কারফিউ অগ্রাহ্য করেই।