প্রসঙ্গ: জলবায়ু পরিবর্তন

প্যানেল সদস্যরা (বাঁ থেকে): উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা, তালুকদার আব্দুল খালেক, ফরিদা আক্তার, নুরুল আখতার এবং ফাহমিদা খাতুন।

বাংলাদেশ সংলাপের এবারের আয়োজন ছিলো মংলায় গত ১২ই ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে। মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আয়োজিত বিশেষ এই সংলাপে প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং সাবেক ত্রাণ ও পুর্নবাসন প্রতিমন্ত্রী তালুকদার আব্দুল খালেক, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন, অভিযোজন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে এমন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উবিনিগ-এর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আক্তার এবং পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি বিপণনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এনার্জি প্যাক ইলেকট্রনিক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আখতার। আমন্ত্রিত দর্শকরা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের সময় যে লিখিত প্রশ্নগুলো জমা দেন প্রতিবারের মতো তা থেকেই বাছাই করে নেয়া হয় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্রশ্ন সমূহ। প্যানেল সদস্যরা উত্থাপিত প্রশ্নের উপর তাৎক্ষনিকভাবে তাদের বক্তব্য কিংবা মতামত দেন। সেই সাথে উপস্থিত অন্য দর্শকরাও সেইসব প্রশ্নের উপর বিভিন্ন মতামত প্রদানের এবং সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পান।

অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্ন করেন সাহারা বেগম। তিনি জানতে চান: জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ২০২০ সাল নাগাদ দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের উপযোগী থাকবে কিনা?

ফাহমিদা খাতুন এ প্রসঙ্গে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে একটি নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃ সরকারী প্যানেল (আইপিসিসি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের জনগনের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আনতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

ফরিদা আক্তার বিষয়টি নিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি চিংড়ি চাষও দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি মনে করেন, পরিবেশ রক্ষায় রাসায়নিক সার নির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব রোধে তিনি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে রক্ষা করার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন।

এ সময় একজন দর্শক জানতে চান: আগামী কত বছরের মধ্যে মংলা অঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশংকা রয়েছে?

আরেকজন দর্শক দেশের উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানান।

দর্শকদের মধ্যে আরেকজন জানতে চান: জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকার কি পদক্ষেপ গ্রহন করেছে?

আরেকজন দর্শক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব রোধে মংলাকে আধুনিকায়ন করতে হবে।

নুরুল আখতার বিষয়টি নিয়ে বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, অভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে থ্রি আর (রিডাকশন, রিইউজ এবং রিসাইকেল) পদ্ধতি চালু করে এর মাধ্যমে শক্তির অপচয় রোধ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে একটি শক্ত অবস্থানে থাকা সম্ভব হবে।

তালুকদার আব্দুল খালেক এ প্রসঙ্গে বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চল চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সরকার এবং বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কোপেনহেগেনের বিশ্ব-জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের উপর বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।

স্বদেশ মন্ডল ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তিনি জানতে চান: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিকল্প জীবিকায়ন ও পরিবেশ উদ্বাস্তুদের জন্য কি করা প্রয়োজন?

প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাব দেন ফরিদা আক্তার। তিনি বিকল্প জীবিকায়নের বিপক্ষে মত দেন। তিনি মনে করেন, প্রচলিত জীবিকাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করার পাশাপশি সেটিকে শক্তিশালী করা উচিত।

মি আখতার এ বিষয়ে বলেন, সচেতনতা শক্তির অপচয় রোধ করার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আছে। তিনি সরকারের কাছে আবেদন করেন, সুনির্দিষ্টভাবে একটি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত পদেক্ষপ নেয়া উচিত।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় সকল দর্শকই ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

এদের মধ্যে থেকে একজন দর্শক জানান, সিডর আঘাত হানার পর এতদিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও তিনি আজও এর ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেন নি।

আরেকজন দর্শক বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি বাঁচাতে হলে উপকূলগুলিতে বেড়ী বাঁধ দেয়ার পাশাপাশি অধিক লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে।

দর্শকদের আরেকজন জানান, সিডরের পর থেকেই আক্রান্ত এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

ফাহমিদা খাতুন এ প্রসঙ্গে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য বিকল্প জীবিকার প্রয়োজন। এর জন্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে। এর জন্য তিনি মংলা বন্দরকে আধুনিকায়নের দাবী জানান৻

এ বিষয়ে মি খালেক জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমি যথেষ্ট উর্বর। তিনি জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস ছিলো কৃষি। তিনি মনে করেন, অপরিকল্পিত বেড়ীবাঁধ দেয়ার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বেড়েছে। এর পাশাপাশি চিংড়ি চাষের প্রবণতা জবির উর্বরতা হ্রাস করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, বিকল্প জীবিকায়নের সৃষ্টি করার পাশাপাশি পরিত্যাক্ত জমি উর্বর করার প্রক্রিয়া এবং এর সদ্ব্যাবহার নিশ্চিত করতে সরকারকে ভূমিকা পালন করতে হবে।

ফরিদা আক্তার এ বিষয়ে আরও যোগ করতে গিয়ে মি খালেকের সাথে একমত যোষণ করেন। তিনি মনে করেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জমির লবণাক্ততা বৃদ্ধির পেছনের কারণ মূল্যায়ন করে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এর পাশাপাশি তিনি ম্যানগ্রোভ রিজেনারেশনের দিকেও গুরুত্ব দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

মি আখতার এ বিষয়ে আরও যোগ করতে গিয়ে বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চল সৌর-বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় কেন্দ্র হতে পারে। তিনি মনে করেন, এই সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে দক্ষিণাঞ্চলে স্থানীয়ভাবে ছোট এবং মাঝারি আকারের শ্ল্পি কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে।

তুষার কুমার গাইন ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তার জিজ্ঞাসা ছিলো: বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জলবায়ুতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সেটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোপেনগেনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন থেকে কোন অর্থ সাহায্য পাওয়া যাবে কি?

প্রথমেই ফাহমিদা খাতুন এ প্রসঙ্গে বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলির কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাবে। একইসাথে তিনি জানান, বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের মোট জাতীয় আয়ের ১.৫ শতাংশের সমপরিমান অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করলেও উন্নত দেশগুলি এখনও এব্যাপারে একমত হতে পারে নি।

এ প্রসঙ্গে ফরিদা আক্তার বলেন, উন্নত দেশের বিলাসী জীবন যাপন এবং অতিমাত্রায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ফলে বৈশ্বিক জলবায়ুতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি মনে করেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের হার কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলির উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কোপেনহেগেন সম্মেলন থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ আদৌ কোন অর্থ পাওয়া যাবে কিনা আর গেলেও সেটি পর্যাপ্ত কিনা এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।

মো গোলাম সারোয়ার ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তিনি জানতে চান: কোপেনগেনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন থেকে কোন ক্ষতিপূরণ না পাওয়া গেলে বৈশ্বিক জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকবেলায় বাংলাদেশে কি ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হবে?

প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাব দেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকবেলায় যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন বাংলাদেশের পক্ষে তা জোগাড় করা সহজ নয়। তিনি আরও বলেন, নীতিগত অবস্থান থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলির উপর প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

এ সময় একজন দর্শক বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচতে বিকল্প জীবিকায়নের ব্যবস্থা করতে না পারলে স্থানান্তরিত হতে হবে।

আরেকজন দর্শক জানতে চান: জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল তলিয়ে গেলে শুধু অর্থ দিয়ে সে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা যাবে কি?

এ সময় সিডরে আক্রান্ত কিছু দর্শক জানান, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সাহায্য না পেলে যথেষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

এ বিষয়ে মি খালেক জানান, সিডর এবং আইলার পর এ অঞ্চলের মানুষকে সাধ্যমত সাহায্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে উন্নত বিশ্বের সাহায্য না পাওয়া গেলে দেশের নিজস্ব সম্পদের মাধ্যমে সেটি মোকাবেলা করতে হবে।

এবারের বাংলাদেশ সংলাপের সর্বশেষ প্রশ্নকারী ছিলেন ঝিনুক আকতার। তিনি জানতে চান: দেশের অভ্যন্তরে বৃক্ষদস্যুদের দৌরাত্ম বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন?

প্রথমেই ফরিদা আক্তার বলেন, বৃক্ষদস্যুদের কারণে প্রচুর মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রন্ত হচ্ছে। তিনি মনে করেন বৃক্ষদস্যুদের ঠেকানোর জন্য সরকারের বিশাল একটি ভূমিকা আছে।

মি আখতার এ প্রসঙ্গে বলেন, বৃক্ষদস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্যে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা উচিত। এর পাশাপাশি কঠোর পরিবেশ আইনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

এ সময় একজন দর্শক অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে সুন্দরবন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। তিনি জানতে চান এর কোন প্রতিকার হবে কিনা৻

আরেকজন দর্শক মনে করেন, উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষার জন্য সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে।

দর্শকদের একজন বৃক্ষদস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্য মি খালেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ফাহমিদা খাতুন এই প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইন আছে কিন্তু অভাব এটি প্রয়োগের। তিনি মনে করেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভূমিদস্যু, বৃক্ষদস্যু, পরিবেশ দস্যুদের দমন করা সম্ভব হবে।

মি খালেক এ বিষয়ে বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। তিনি মনে করেন, সুন্দরবনকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোন আপস করা যাবে না। এর পাশাপাশি তিনি পরিবেশ রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন।

সবশেষে ফরিদা আক্তার বলেন, সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ করা প্রয়োজন। একই সাথে তিনি এও বলেন, সুন্দরবনকে বৈধভাবে ব্যবহার করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা উচিত নয়।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ১৩ই ডিসেম্বর, ২০০৯ প্রবাহ অধিবেশনে

‘বাংলাদেশ সংলাপ’ প্রযোজনা করেছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ।