প্রসঙ্গ: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তি

The panelists

প্যানেল সদস্যরা (বাঁ থেকে): ইন্তেখাব মাহমুদ, মুনমুন আহমেদ, উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা, শাফিন আহমেদ এবং শরিফুল ইসলাম।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

এবারের বাংলাদেশ সংলাপের বিশেষ আয়োজন ছিলো কক্সবাজারে গত ১৯শে ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে। মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অনুষ্ঠিত এবারের সংলাপের বিষয়বস্তু ছিলো ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তি’। বিশেষ এই সংলাপে প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রযুক্তি খাতের তরুণ উদ্যোক্তা ইন্তেখাব মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক শরিফুল ইসলাম, নৃত্যশিল্পী এবং কোরিওগ্রাফার মুনমুন আহমেদ, মাইলস্ ব্যান্ডের গায়ক শাফিন আহমেদ। আমন্ত্রিত দর্শকরা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের সময় যে লিখিত প্রশ্নগুলো জমা দেন প্রতিবারের মতো তা থেকেই বাছাই করে নেয়া হয় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্রশ্ন সমূহ। প্যানেল সদস্যরা উত্থাপিত প্রশ্নের উপর তাৎক্ষনিকভাবে তাদের বক্তব্য কিংবা মতামত দেন। সেই সাথে উপস্থিত অন্য দর্শকরাও সেইসব প্রশ্নের উপর বিভিন্ন মতামত প্রদানের এবং সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পান।

অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্ন করেন সাইফুল আজিম। তিনি জানতে চান: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে এক্সক্লুসিভ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হবে কি?

বিষয়টি নিয়ে প্রথমেই বলেন ইন্তেখাব মাহমুদ। বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা আছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অবকাঠেমোগত উন্নয়ন করে এটিকে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে আরও বেশী আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারের উদ্যোগী হওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ, সরকার দেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্বের কাছে তুলে ধরে৻

মুনমুন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ও সংস্কৃতির একটি আলাদা কদর আছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা সম্ভব।

এ সময় একজন অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের পর্যটন শ্ল্পিকে বিকশিত করতে কোন সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি।

দর্শকদের মধ্যে আরেকজন বলেন, পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করতে হবে।

আরেকজন দর্শক অভিযোগ করেন, কক্সবাজারে আগত বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যা খুব বেশী নয়। তিনি প্যানেল সদস্যদের কাছে প্রশ্ন করেন: কক্সবাজারে বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কি ব্যব্স্থা নেয়া উচিত?

আরেকজন দর্শক বলেন, দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে স্থানীয় লোক-সংস্কৃতির বিভ্ন্নি স্মারক বিক্রির প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন করে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা সম্ভব।

এ বিষয়ে শাফিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে পারে এবং পর্যটন শিল্পে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা যোগ করার মাধ্যমে এটিকে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে আরও বেশী আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। তিনি জানান, বিশ্বের যে দেশগুলি পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তারা প্রকৃতির পাশাপাশি পর্যটকদের প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তিনি মনে করেন, কক্সবাজারকে পরিকল্পিভাবে নগরায়ন না করা গেলে এর অপার সৌন্দয্য ম্লান হয়ে যাবে।

শরিফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের পর্যটন শিল্পের আকর্ষণীয় জায়গার পাশাপাশি এর আশেপাশের এলাকাগুলির উন্নয়ন সাধন করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, কক্সবাজারে বাংলাদেশী পণ্য থাকার কথা থাকলেও এই এলাকা বার্মিজ পণ্যে সয়লাব হয়ে গেছে।

মো আবরার হোসেন ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তিনি জানতে চান: বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বিশ্বে বাংলাদেশের স্বকীয়তা প্রকাশে কোন বাঁধা সৃষ্টি করছে কি?

প্রথমেই এ প্রশ্নের জবাব দেন মুনমুন আহমেদ। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের স্বকীয় সংস্কৃতি চর্চা ও ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব।

এ বিষয়ে মি আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য ধারার প্রভাব বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে কোন প্রভাব ফেলছে না। তিনি মনে করেন, শিল্পীকে ভৌগলিক কোন গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে দেয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশগুলির মধ্যে সংস্কৃতির পারস্পারিক আদান-প্রদান সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হবে।

মুনমুন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধুমাত্র ব্যবসায়িক লাভের কথা চিন্তা না করে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে একটি দেশের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হবে।

এ সময় একজন দর্শক জানতে চান: ইংরেজি মাধ্যমে স্কুল এবং হিন্দি সিরিয়ালের দৌরাত্ম্যের কারণে বাংলাদেশের সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়ছে কি?

আরেকজন দর্শক অভিযোগ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের আদিবাসীদের সংস্কৃতি তুলে ধরলেও বাংলাদেশের আদিবাসীদের সংস্কৃতি সেভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয় না। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ আদিবাসী সংস্কৃতি দেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তিতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে।

দর্শকদের আরেকজন বলেন, শিশুকাল থেকেই প্রত্যেককে আপন সংস্কৃতির পাঠ না দিতে পারলে শিশুরা নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে।

দর্শকদের মধ্যে একজন অভিযোগ করেন, অনেক ব্যান্ড শিল্পী বাংলা শব্দকে ইংরেজির মতো করে উচ্চারণ করে থাকেন। তিনি জানতে চান, এর ফলে বাংলা ভাষার ব্যাকরণগত দিক মার খাচ্ছে কিনা৻

দর্শকদের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মি আহমেদ বলেন, দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে সরকার। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার এখন পর্যন্ত কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিগুলিই বিশ্বের কাছে পরিচিত করাতে পারেনি।

মি মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বাইরের সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলি আয়ত্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতির উন্নয়ন করা সম্ভব।

মি ইসলাম এ বিষয়ে বলতে গিয়ে জানান, তিনি মনে করেন, নিজেদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং সরকারী পর্যায়ের উদ্যোগ এবং গবেষণার প্রয়োজন আছে। তিনি মনে করেন, একজন ব্যক্তি যে মাধ্যমেই তার প্রতিভা বিকশিত করুক না কেন, তার মধ্যে দেশপ্রেম থাকলে আপন সংস্কৃতি বিকশিত হবে।

মাহফুজুল করিম ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তার জিজ্ঞাসা ছিলো: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বিভক্তি কি এদেশের অগ্রগতির পথে অন্তরায় নয়?

মি ইসলাম এর উত্তরে বলেন, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, দেশের এই রাজনৈতিক বিভক্তি দেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তির পথে একটি বাঁধা।

মি মাহমুদও এ বিষয়ে মি ইসলামের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গঠনমূলক সমালোচনার চর্চা নেই। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলি দেশের নেতিবাচক সংবাদগুলি যেভাবে প্রকাশ করে তাতে বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

এ সময় একজন দর্শক বলেন, দেশের রাজনৈতিক বিভক্তি নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের একযোগে কাজ করা উচিত।

আরেকজন দর্শক বলেন, বাঙালিরা জাতিগতভাবে কখনই বিভক্ত নয়। তিনি মনে করেন, জনগনের তুলনায় রাজনৈতিক দলগুলিকে বেশী প্রাধান্য দেয়ার ফলে এই কথিত রাজনৈতিক বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মনে করেন, সংসদে বসে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আলোচনার মাধ্যমে দেশের কথিত রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করা সম্ভব।

মুনমুন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে রাজনৈতিক বিভক্তি আছে। তিনি মনে করেন, সরকারদল ও বিরোধী দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে দেশের রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করা সম্ভব।

বিষয়টি নিয়ে মি আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভক্তি দেশের ভাবমূর্তির পথে একটি বিরাট অন্তরায়। এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের ক্ষতির কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

এবারের বাংলাদেশ সংলাপের সর্বশেষ প্রশ্নকারী ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার জিজ্ঞাসা ছিলো, বিভিন্ন দেশ বিশ্বের কাছে নিজেদের যেভাবে ব্র্যান্ডিং করছে তেমনি করে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে ব্র্যান্ডিং করা যায় কিনা৻

মি মাহমুদ এ প্রসংগে বলতে গিয়ে জানান, পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে, বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ ঠিকানা, ধর্মীয় বিষয়ে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব। তিনি বলেন, রুপময়ী বাংলাদেশ বলে শুধু বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করলেই হবে না, বাংলাদেশকেও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

মি আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, বাজারজাতকরণের এ যুগে বাংলাদেশকেও বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে হবে। তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসগুলিকে আরও বেশী কর্ম তৎপর হতে হবে। বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের এদেশে নিয়ে আসতে হবে।

এ সময় একজন দর্শক বলেন, প্রবাসী বাঙালিরা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে উপস্থাপনের জন্য যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে।

আরেকজন দর্শক বলেন, বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে তথ্য-প্রযুক্তি ও যোগাযোগের মাধ্যমে তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নিজস্ব কোন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা নেই।

মুনমুন আহমেদ মনে করেন, সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা যায়।

মি মাহমুদ এ বিষয়ে আরও যোগ করতে গিয়ে বলেন, আউটসোর্সিং খাতে বাংলাদেশের একটি ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল নেই বলে এই শিল্প তেমনভাবে বিকশিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ আদর্শ জায়গা এই ব্যবসার জন্য। তিনি মনে করেন, সরকার আউট সোর্সিং ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামগত উন্নয়ন করে দিলে এটি দেশের শীর্ষ রপ্তানি আয়ের খাত হতে পারে।

মি ইসলাম বলেন, দেশের ব্র্যান্ডিং এর মধ্যে একটি দেশের সামগ্রিক বিষয়গুলি চলে আসে। সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হলে দেশের প্রধান খাতগুলিতে সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন করতে হবে।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ২০শে ডিসেম্বর, ২০০৯ প্রবাহ অধিবেশনে

বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করেছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ