প্রসঙ্গ: গণতন্ত্র

প্যানেল সদস্যরা (বাঁ থেকে): মতিয়া চৌধুরী, গোলাম কাদের, উপস্থাপক মিথিলা ফারজানা, মাকসুদুল হক এবং খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

গণতন্ত্র নিয়ে বাংলাদেশ সংলাপের এবারের বিশেষ আয়োজন ছিলো ঢাকায় গত ২৬শে ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে। মিথিলা ফারজানার সঞ্চালনায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত এবারের সংলাপে প্যানেল সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গোলাম কাদের এবং সংগীতশিল্পী মাকসুদুল হক। আমন্ত্রিত দর্শকরা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের সময় যে লিখিত প্রশ্নগুলো জমা দেন প্রতিবারের মতো তা থেকেই বাছাই করে নেয়া হয় এবারের বাংলাদেশ সংলাপের প্রশ্ন সমূহ। প্যানেল সদস্যরা উত্থাপিত প্রশ্নের উপর তাৎক্ষনিকভাবে তাদের বক্তব্য কিংবা মতামত দেন। সেই সাথে উপস্থিত অন্য দর্শকরাও সেইসব প্রশ্নের উপর বিভিন্ন মতামত প্রদানের এবং সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পান।

অনুষ্ঠানের প্রথম প্রশ্ন করেন রুমা সরকার। তিনি জানতে চান: বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এখনও পর্যন্ত একিটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্ভব হয়নি কেন?

বিষয়টি নিয়ে প্রথমেই বলেন মাকসুদুল হক। তিনি মতে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা ভালো নয়। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের জনগন সবসময় সঠিক দলকে নির্বাচিত করলেও ক্ষমতায় আসার পর দলগুলি তাদের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায়।

গোলাম কাদের বিষয়টি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক থাকবেই। তিনি মতে, গত ২০ বছরে আশানুরূপ না হলেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অনেক গুণগত উত্তরণ ঘটেছে।

এ সময় একজন দর্শক অভিযোগ করেন, জনগণ একটি কার্যকর সংসদের প্রত্যাশা করলেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং সরকারের দায়িত্বশীলতার অভাবে জনগনের সে আশা পূরণ হচ্ছে না।

দর্শকদের মধ্যে আরেকজন তাঁর মতামতে বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বর্তমান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্রের উত্তরণ নিয়ে আশাবাদী হওয়া সম্ভব নয়।

আরেকজন দর্শক প্রশ্ন করেন: বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া সম্ভব হবে?

আরেকজন দর্শক বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলির উচিত জনগনের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ করা।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, এদেশে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিই গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি মতে রাজনৈতিক দলগুলি সাংঘর্ষিক রাজনীতি পরিহার না করলে দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তিনি দাবী করেন, দেশে এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হলেও তাঁরা গণতন্ত্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

মতিয়া চৌধুরী এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবারতন্ত্র চললেও সবাই বাংলাদেশের পরিবারতন্ত্র নিয়ে সমালোচনা করে। তিনি বলেন, দলের কাউন্সিলে মনোনিত হয়ে কেউ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে সেখানে পরিবারতন্ত্রের বিষয় থাকে না। তিনি আরও বলেন, জনগনের অধিকারবোধ এবং সচেতনতা যত বেশী তীব্র এবং সুসংগঠিত হবে, দেশের গণতন্ত্রও তত বেশী সুসংহত হবে। তিনি মতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যতই সমস্যা থাকুক না কেন, গণতন্ত্রের মাধ্যমেই এর প্রতিকার করতে হবে।

মো. মোশাররফ হোসেন ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তিনি জানতে চান: প্রধান বিরোধী দল টানা সংসদ অধিবেশন বর্জন করে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলছে কিনা?

এর উত্তরে মি কাদের বলেন, প্রধান বিরোধী দল সংসদ বর্জন করলে গণতন্ত্রের বিকাশ ব্যহত হয়। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের কোন অভিযোগ থাকলে সেটি সংসদে এসে বলা উচিত যাতে সাধরণ জনগনও তাদের অভিযোগগুলি শুনতে পায়।

এ বিষয়ে মি হক বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক বিরোধের প্রধান কারণ বা বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের প্রধান কারণ হচ্ছে পরিবারতন্ত্র। তিনি মনে করেন পরিবারতন্ত্রের কারণেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আজ এ বেহাল দশা।

এ সময় একজন দর্শক জানতে চান: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কবে পরিবর্তন আসবে?

দর্শকদের আরেকজন বলেন, বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের কারণ হিসেবে বিরোধী দলকে ঢালাওভাবে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তিনি মনে করেন বিরোধী দলকে সংসদে আনতে সরকারের অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত।

দর্শকদের মধ্যে একজন মতামত দেন, বিরোধী দলের সংসদ বর্জন নীতি বাংলাদেশর গণতন্ত্রের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবে না।

মি হোসেন এ বিষয়ে বলতে গিয়ে জানান, দেশে গণতন্ত্র পুর্নপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে বিএনপি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো। তিনি জানান, বিরোধী দল কর্তৃক সংসদ বর্জন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং এ ব্যাপারে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ নিবে।

মতিয়া চৌধুরীও এ প্রসংগে বলেন, প্রধান বিরোধী দল সংসদ বর্জন করলে গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময়ে অনেক বেশী বৈষম্যের শিকার হয়েছিলো। তিনি জানান, সরকার বিরোধী দলকে সংসদে আনতে চায় এবং এ লক্ষ্যে তাঁরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করবেন। তিনি জানান, বিরোধী দলকে পাশে নিয়ে কাজ করার জন্য বর্তমান সরকার, বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সাংসদকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে সভাপতি নিযুক্ত করা হয়েছে।

মি হোসেন বলেন, সাংঘর্ষিক রাজনীতি পরিহার করে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে।

মতিয়া চৌধুরীও মি হোসেনের কথার রেশ ধরে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সাথে ব্যবধান কমিয়ে আনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রশ্নকর্তা মো মোশাররফ হোসেনের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সরকার এবং বিরোধীদল দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করলে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

মোহতাসিম বিল্লাহ পারভেজ ছিলেন পরবর্তী প্রশ্নকর্তা। তাঁর মতে বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ নং অনুচ্ছেদের পাশাপাশি আরও কিছু অনুচ্ছেদ আছে যেগুলি সংবিধানের পরিপন্থী। তিনি জানতে চান: সংবিধানের এইসব অনুচ্ছেদে সরকার কোন সংশোধনী আনবে কি?

(সংবিধানের ৭০ এর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন জনপ্রতিনিধি তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোন মতামত দিতে পারেন না।)

মতিয়া চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানান, কোন জনপ্রতিনিধি স্বীয় দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মতামত প্রদান করে দলকে প্রভাবিত করে দলের মাধ্যমে তার মতামত প্রদান করতে পারেন। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন প্রভাবের যে খেলা হয় তাতে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ৭০ এর অনুচ্ছেদের প্রয়োজন আছে।

মি হোসেনও এ বিষয়ে মতিয়া চৌধুরীর সাথে একমত পোষণ করেন। তিনিও মনে করেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদটি বহাল রাখা উচিত।

এ সময় একজন দর্শক বলেন, সংবিধানে ফ্লোর ক্রসিং আইনে সংশোধন এনে সাংসদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেয়া উচিত।

দর্শকদের মধ্যে আরেকজন বলেন, সংবিধানের ৭০ এর অনুচ্ছেদ বহাল থাকার ফলে দেশের গণতন্ত্র চর্চা ব্যহত হবে।

মি কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে ৭০ এর অনুচ্ছেদের পরিবর্তন করা প্রয়োজন। একইসাথে তিনি আরও বলেন, সরকারদল এবং বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি করে দেশের সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা প্রয়োজন।

মতিয়া চৌধুরী এই বক্তব্যের বিরোধীতা করে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্লজ্জভাবে বিক্রি হয়ে যাওয়া ঠেকানোর জন্যেই ৭০ এর অনুচ্ছেদ বহাল রাখা প্রয়োজন।

মি হোসেন এ প্রসংগে আরও যোগ করতে গিয়ে বলেন, ৭০ এর অনুচ্ছেদটি পরিবর্তনের জন্যে সময়ের প্রয়োজন।

এবারের বাংলাদেশ সংলাপের সর্বশেষ প্রশ্নকারী ছিলেন আরিফ আহমদ। তিনি জানতে চান: ভবিষ্যতে কোন সামরিক সরকার যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে এজন্য কোন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন আছে কি?

এ প্রশ্নের উত্তরে মি হক প্রথমেই পাল্টা প্রশ্ন করেন যে আইন প্রণয়ন করে দেশে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা বন্ধ করা যাবে কিনা৻ তিনি বলেন, আইন প্রণয়ন করে সামরিক শাসনের পথ বন্ধ করা যাবে কিনা এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

মি কাদেরও বলছেন, আইন প্রণয়ন করে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা বন্ধ করা যাবে না।

এ সময় একজন দর্শক মতামত দেন যে, জনসচেতনতার মাধ্যমে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা বন্ধ করা সম্ভব।

আরেকজন দর্শক মতে, আইন করে সামরিক শাসনের সম্ভাবনা বন্ধ করা যাবে না।

দর্শকদের আরেকজন বলেন, দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্যের মাধ্যমেই সামরিক শাসনের পথ রুদ্ধ করা সম্ভব।

এ সময় প্রশ্নকর্তা আরিফ আহমদ অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ দেশের গণতন্ত্রকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁর মতে, আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়া উচিত।

মি হোসেন এ বিষয়ে বলেন, শুধুমাত্র আইন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, দেশের রাজনীতি সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হলে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে।

মতিয়া চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বলেন, সংবিধান এবং গণতন্ত্র একসাথে চলতে পারে না। রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হলে জনসচেতনতার বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ২৭শে ডিসেম্বর, ২০০৯ প্রবাহ অধিবেশনে

বাংলাদেশ সংলাপ প্রযোজনা করেছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ